রাচিন রবীন্দ্রকে ডাউন দ্য গ্রাউন্ডে এসে ছক্কা মারতেই তাঁর নাম লেখা হয়ে গেল ডন ব্র্যাডম্যানের রেকর্ডের পাশে। গলে আজ ওই ছক্কায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি হয়ে গেল কামিন্দু মেন্ডিসের, তাঁর অষ্টম টেস্টে গড়ানো ক্যারিয়ারের পঞ্চম সেঞ্চুরি! তাতেই মাইলফলক, যেখানে তাঁর সঙ্গী ব্র্যাডম্যান।
কী মাইলফলক? গতকাল টেস্টের প্রথম দিনে ফিফটি করেই টেস্টের ১৪৭ বছরের ইতিহাসে অনন্য হয়ে গেছেন ক্যারিয়ারের প্রথম আট টেস্টের প্রতিটিতেই অন্তত এক ইনিংসে ফিফটি পাওয়া প্রথম ব্যাটসম্যান বনে গিয়ে। ফিফটিকে আজ পরিণত করেছেন সেঞ্চুরিতে।
ক্যারিয়ারের পঞ্চম সেঞ্চুরিটা কামিন্দু মেন্ডিস পেলেন টেস্টে মাত্র ১৩তম ইনিংসটি খেলতে নেমে। ডন ব্র্যাডম্যানও তো তা-ই করেছিলেন, টেস্টে কিংবদন্তি অস্ট্রেলিয়ানের প্রথম পাঁচ সেঞ্চুরিও যে এসেছিল তাঁর প্রথম ১৩ ইনিংসেই!
শুধু কী এই কীর্তি? আরেকটা কীর্তিতেও তো ‘ডনে’র পাশে বসে গেছেন কামিন্দু। গলে আজ টেস্টের দ্বিতীয় দিনে শেষ পর্যন্ত ৫ উইকেটে ৬০২ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করেছে শ্রীলঙ্কা, কামিন্দু অপরাজিত থেকে গেলেন ১৮২ রানে। ওই ইনিংসেই টেস্টে যৌথভাবে তৃতীয় দ্রুততম হাজার রানের কীর্তি গড়ার ক্ষেত্রেও ব্র্যাডম্যানের পাশে বসেছেন মেন্ডিস। হাজার রানের ক্লাবে ঢুকতে ব্র্যাডম্যানেরও ১৩ ইনিংস লেগেছিল।
মেন্ডিস ও ব্র্যাডম্যানের আগে কম ইনিংস খেলে টেস্টে ১ হাজার রানের রেকর্ড শুধু দুজনের - ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্যার এভারটন উইকস ও ইংল্যান্ডের হার্বার্ট সাটক্লিফ, দুজনেরই লেগেছিল ১২ ইনিংস। সব মিলিয়ে ইতিহাসে দ্বিতীয় হলেও শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে কামিন্দুই প্রথম, এবং সেটা বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে। লঙ্কানদের টেস্ট ইতিহাসে দ্রুততম হাজার রানের কীর্তিটা এতদিন ছিল রয় দাসের, তাঁর লেগেছিল ২৩ ইনিংস!
সেঞ্চুরিটা ছক্কা মেরে করেছেন, গলে আজ শেষ বিকেলে হাজার রানের মাইলফলকও কামিন্দু ছুঁয়েছেন ছক্কা মেরেই - রাচিন রবীন্দ্রর বলে উইকেট থেকে বেরিয়ে এসে দারুণ ছক্কায়। ওদিকে তিনি ঢুকলেন হাজারি ক্লাবে, ওই ছক্কায় শ্রীলঙ্কার ইনিংসেও ৬০০ পেরিয়ে গেল… ব্যস, ইনিংস ঘোষণা করতে আর দেরি করেনি শ্রীলঙ্কা।
তাতে একটু আক্ষেপ কি থেকে গেল? আর ১৮টা রান করার সুযোগ পেলে যে ছোট্ট ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটাকে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিতেও পরিণত করা হয়ে যেত কামিন্দুর! তা হয়নি, তবে এই ১৩ ইনিংসেই যা করে ফেলেছেন, তাতে কামিন্দুকে নিয়ে লঙ্কানদের গর্ব না হয়ে পারে না! স্বপ্নের সলতেটাও আরও জ্বলজ্বলে হলো নিশ্চিত।
কী করেছেন কামিন্দু? আগে সংখ্যাগুলো দেখে নিন, ওগুলোই যথেষ্ট মনে হতে পারে – ১৩ ইনিংসে হাজার রানের পথে ৯টি ইনিংসে ৫০-এর বেশি রান করেছেন কামিন্দু, ওই ৯ ইনিংসের ৫টিকেই আবার রূপ দিয়েছেন সেঞ্চুরিতে। ওই পাঁচ সেঞ্চুরির মধ্যে দুটি আবার ‘ড্যাডি হানড্রেড।’ ১৫০-এর বেশি স্কোর আজকের আগে করেছিলেন গত মার্চে সিলেটে বাংলাদেশের বিপক্ষে (১৬৪)।
শুধু রান-সেঞ্চুরি নয়, কামিন্দুর ক্যারিয়ারের গতিপথটাও মুগ্ধতা ছড়ায়। গড় ৯১.২৭ – এটা না হয় ‘মাত্রই তো ক্যারিয়ারের শুরু, আরও অন্তত বছর দেড়-দুয়েক দেখা যাক’ বলে আপাতত দৃষ্টিগোচর করা যায়, কামিন্দু রান তুলছেনও ৬৫.০২ স্ট্রাইক রেটে। এতটুকুতেও যদি কামিন্দুর অবিশ্বাস্য শুরু নিয়ে মুগ্ধতা কম মনে হয়ে যায়, তবে জেনে নিন – কামিন্দুর এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারে ১০০৪ রানের ৬৩৪-ই এসেছে ব্যাটিং অর্ডারের ৭ বা এর পরে নেমে। অত নিচে নেমেও ব্যাট হাতে আলো ছড়াচ্ছেন দেখেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই সিরিজে কামিন্দুকে ‘প্রমোশন’ দিয়ে ৫ নম্বরে তুলে এনেছে শ্রীলঙ্কা।
ওহ, মুগ্ধতার রেশের পারদ চড়তে চড়তে আরেকটি তথ্য জানিয়ে দেওয়া যাক – লঙ্কান ক্রিকেটে কামিন্দু প্রথম আলোচনায় এসেছিলেন দুই হাতেই বোলিংয়ের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা দেখিয়ে। বোলিংটা অবশ্য সেভাবে এগোয়নি, এখন পর্যন্ত টেস্টে ৩ উইকেট আর ওয়ানডেতে ৯ ম্যাচে ২ উইকেট তা-ই বলবে। তবে কামিন্দুর ব্যাটিং দেখে লঙ্কানদের মনে হয় না তাঁর বোলিং নিয়ে বাড়তি কোনো চাহিদা আপাতত আছে!
কামিন্দুতে মুগ্ধতা ছড়ানোর দিনে শ্রীলঙ্কার পাহাড়সম স্কোরের বিপরীতে নিউজিল্যান্ড ব্যাটিংয়ে নেমেই পড়েছে বিপদে। দিন শেষ করেছে ১৪ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে ২২ রান নিয়ে। দুই ওপেনার টম ল্যাথাম (২) আর ডেভন কনওয়ে (৯) এরই মধ্যে এই ইনিংসের জন্য প্যাভিলিয়নের বাসিন্দা, দিন শেষে ক্রিজে টিকে ছিলেন কেইন উইলিয়ামসন (৬*) ও নাইটওয়াচম্যান এজাজ প্যাটেল (০*)।



