গাজায় ইসরায়েলের হামলার এক বছর পূর্ণ হলেও যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং অঞ্চলটিতে আরও বড় পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে। লেবাননে এরই মধ্যে তীব্র বিমান হামলার পাশাপাশি সীমিত পরিসরে স্থল অভিযানও পরিচালনা করেছে ইসরায়েল। সিরিয়া ও ইয়েমেনের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতেও থেমে থেমে আঘাত হানছে ইসরায়েল। আর ইরানের সঙ্গেও চলতি বছর দুই দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এক বছরের যুদ্ধে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। নিহতদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। অবরুদ্ধ উপত্যকাটির প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়িঘর এরই মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।
জগবি নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুদ্ধে গাজার অর্ধেক মানুষ অন্তত একজন আত্মীয়-স্বজন হারিয়েছেন। উপত্যকাটির প্রায় ২২ লাখ মানুষের তিন-চতুর্থাংশ চলতি যুদ্ধে অন্তত তিনবার স্থানচ্যুত হয়েছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকনোমিস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, গাজা যুদ্ধের মাধ্যমে ৭০ লাখ ফিলিস্তিনির ওপর, তথা পুরো ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে আবার ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গত বছরের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমেও ইসরায়েলি সেনা এবং জোরপূর্বক বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, সহিংসতা বেড়েছে। চলাফেরায় কড়াকড়ি বেড়েছে। ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এই দুই অঞ্চলেও নতুন ধরনের অবরোধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত এক বছরে সেখানেও কয়েক শ’ ফিলিস্তিনি হতাহত ও বন্দী হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে যেসব আরব জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন, তাদের সার্বিক অবস্থাও গত এক বছরে খারাপ হয়েছে। তাদের প্রতি ইহুদিদের মনোভাব বৈরী হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ ইসরায়েলের বেরশেভা এলাকার একটি হিব্রু ভাষাভাষী স্কুলের ১২ বছরের এক ছাত্রীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কারণ, সে সহপাঠীদের কাছে গাজার শিশুদের অনাহারে মৃত্যু নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। জবাবে সহপাঠীরা তার গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।
শুরুর দিকে ধারণা করা হয়েছিল, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে না। পূর্ববর্তী অন্যান্য সংঘাতের মতো এটিও দ্রুত শেষ হবে। ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্ররা দেশটিকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করবে। গাজার বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি নতুন করে তৈরি করা হবে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পতন হবে। দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের মাধ্যমে সংঘাতের শেষ হবে। কিন্তু এক বছরেও এই সবের কিছু না হওয়ায় দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের আশা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।
গাজায় যে বিপুলভাবে বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে, সেখানে যে ব্যাপক হারে বোমা হামলা চালানো হয়েছে ও বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে উপত্যকাটিকে দ্বিতীয় পশ্চিম তীরে রূপান্তরিত করা হচ্ছে–এমন একটি ধারণা অনেক ফিলিস্তিনির মনে বদ্ধমূল হয়েছে। এই অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করেন জেরুজালেমে বসবাসকারী ফিলিস্তিন-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক ওমর দাজানি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্রের বাসনা আরও তীব্র হয়েছে। কারণ, তারা একটি নিরাপদ বাসস্থান চায়, যেখানে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে হুমকি থাকবে না। সেপ্টেম্বর মাসে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ মানুষ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে। তারা ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন দেশ চায়। অন্যদিকে ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের সমানাধিকারের ভিত্তিতে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন মাত্র ১০ শতাংশ।
‘আ ল্যান্ড ফর অল’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি ওমর। তারা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পরিবর্তে ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের একটি অভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা বলতেন। কিন্তু এক বছরের বিভীষিকাময় যুদ্ধের পর এ প্রস্তাব নিয়ে কথা বলতে তিনি ভয় পান বলে জানান।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বাধীন রাষ্ট্র কীভাবে অর্জন করা যায়, তা নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বড় ধরনের বিভক্তি রয়েছে। একটি অংশ শান্তিপূর্ণ উপায়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে। আরেকটি অংশের মধ্যে সশস্ত্র উপায়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আবেদন বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে দুই দশক আগে একটি আইন-অমান্য আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাকারী এক ফিলিস্তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল কিছু বুঝতে চায় না।’
ইসরায়েল মনে করেছিল, বলপ্রয়োগ করে ফিলিস্তিনিদের পরাজিত করা যাবে। কিন্তু উল্টো ফল হচ্ছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, গাজা যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের মনোভাব বেড়েছে। পশ্চিম তীরে জেরুজালেম মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন সেন্টার পরিচালিত এক জরিপ বলছে, গত মে মাসে ‘সশস্ত্র প্রতিরোধের’ পক্ষে ছিল ৪০ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ‘শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগের’ পক্ষে সমর্থন ৪৪ শতাংশ থেকে কমে ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আরেকটি জরিপেও একই ধরনের মনোভাব দেখা গেছে। এতে দেখা গেছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে পশ্চিম তীরে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে ছিল ৩৫ শতাংশ মানুষ। সেপ্টেম্বর মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে যারা মত দিচ্ছেন, তাদের বড় অংশই তরুণ। এসব তরুণদের বেশির ভাগের ২০০০ থেকে ২০০৫ সালে চলা দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় গণবিক্ষোভের কথা স্মৃতিতে নেই। তাই ওই গণবিক্ষোভ ও সাম্প্রতিক অন্যান্য সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতির হিসেব তাদের মাথায় নেই। তাই তাঁরা সশস্ত্র সংগ্রামের কথা ভাবছেন।
পশ্চিম তীরে প্যালেস্টাইন সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চ নামের একটি সংস্থা গত দুই দশকে জনসাধারণের মধ্যে মনোভাবের পরিবর্তন কীভাবে ঘটেছে সে বিষয়ে তথ্য‑উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ওপর চালানো হয়েছে এই গবেষণা। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন ফিলিস্তিনি অথোরিটির (পিএ) প্রতি এই প্রজন্মের সমর্থন স্পষ্টভাবে কমছে। একইসঙ্গে ৩০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি সমর্থন খুব বেশি। এদের ৫৬ শতাংশই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইন্তিফাদা বা অভ্যূত্থানের পক্ষে।
সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে মত বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর পক্ষে সমর্থন বেড়ে যাওয়া। আর পিএ’র সমর্থন হ্রাস পাওয়া। কিন্তু যারা এখন সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলছেন, তাদের অনেকে হামাসের ফিরে আসা নিয়েও উদ্বিগ্ন। তাই সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলা কতটা মুখের কথা আর কতটা বাস্তব, তা চলমান উত্তেজনার মধ্যে বোঝা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
বৈশ্বিক সন্ত্রাসের ঝুঁকি
দ্য কায়রো রিভিউ অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, হামাস ও ইসলামিক জিহাদের বর্তমান যোদ্ধার একটা বড় অংশের মা-বাবা বা পরিবারের সদস্যরা ২০১৪ সালে ইসরায়েলের গাজায় হামলার সময় নিহত হন। বর্তমান এই যোদ্ধারা তখন ছিল শিশু। এসব এতিম শিশুদের দিয়েই নিজেদের বাহিনী ভারী করে সশস্ত্র গোষ্ঠী দুটি। এবারও এমনটি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে গাজা যুদ্ধের কারণে এবার শুধু ফিলিস্তিন নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বিভিন্ন দেশেও চরমপন্থা বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে কায়রো রিভিউয়ের বিশ্লেষণটিতে। কারণ, কোনো স্থানে বিশেষ কোনো আদর্শ চরম আকার ধারণ করলে, এর প্রতিক্রিয়ায় বিপরীত আদর্শও চরম আকার ধারণ করে। এখন ইসরায়েলের চরমপন্থার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও চরমপন্থার জন্ম দিতে পারে।
আরেকটি বিশ্লেষণে বলা হয়, হামাসসহ গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। পশ্চিমাদের সহায়তায় ইসরায়েলের সন্ত্রাসবাদ দমনের ফলে কিন্তু সন্ত্রাসবাদ বেড়েছে। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও জার্মানিতে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। তথা পশ্চিমা দেশগুলোতে সন্ত্রাসবাদ, একক ব্যক্তির হামলার ঘটনা বেড়েছে। কারণ, গাজায় ইসরায়েলের ‘গণহত্যা’ মুসলমান তরুণেরা মেনে নিতে পারছে না। তাই তারা ব্যক্তিগত পর্যায়ের হামলা দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে চেষ্টা করছে।
ইকনোমিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামাস ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কেউই আশার আলো দেখাতে পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অভিপ্রায় কাজ না করলে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের সংঘাত ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। এখন সেই রাজনৈতিক অভিপ্রায় কীভাবে কাজে রূপ দেওয়া যায়, সেটি খুঁজে বের করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র: দ্য ইকনোমিস্ট, বিবিসি, কায়রো রিভিউ অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স, আল জাজিরা



