লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং সম্প্রতি ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজনীতিবিদ বাবা সিদ্দিক ও পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসওয়ালাকে হত্যাসহ বেশ কয়েকটি বড় অপরাধে জড়িত অভিযোগে কঠোর তদন্তের মুখে রয়েছে। বলিউড সুপারস্টার সালমান খানকে বারবার হুমকির সঙ্গেও যুক্ত এই গ্যাংয়ের নাম। উৎপত্তি ও কার্যকলাপের কারণে এটি বর্তমানে উত্তর ভারতে কাজ করা সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর একটি বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম ‘মানিকন্ট্রোল’।
বাবা সিদ্দিক খুন
ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে যুক্ত মহারাষ্ট্রের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ বাবা সিদ্দিককে গত ১২ অক্টোবর রাতে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৬৬ বছর বয়সী এই বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিকের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ছিল। তিনি ২০০৪ ও ২০০৮-এর মধ্যে এনসিপি সরকারে কংগ্রেসে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সালমান খান ও শাহরুখ খানসহ বলিউড তারকাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের জন্যও তিনি সুপরিচিত ছিলেন, প্রায়ই তাদের পাশাপাশি জনসমক্ষে উপস্থিত হতেন।
সিদ্দিক হত্যার তদন্ত দ্রুত লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের দিকে আঙুল তুলেছে। মুম্বাই পুলিশ একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট যাচাই করে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের একজন কথিত সদস্যকে দায়ী করেছে।
লরেন্স বিষ্ণোই কে
লরেন্স বিষ্ণোই হলেন ৩১ বছর বয়সী একজন গ্যাংস্টার, যিনি পাঞ্জাবের ফিরোজপুর জেলার ধাতারানওয়ালি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের অন্তর্গত, যা পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও রাজস্থানের কিছু অংশজুড়ে বিস্তৃত।
দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর লরেন্স বিষ্ণোই উচ্চ শিক্ষার জন্য ২০১০ সালে চণ্ডীগড়ে চলে আসেন। তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিএভি কলেজে ভর্তি হন এবং দ্রুত ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০১১-২০১২ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের (এসওপিইউ) সভাপতি হন তিনি।
যাইহোক, লরেন্স বিষ্ণোই দ্রুতই অপরাধ জগতে পা রাখেন। তাঁর নামে প্রথম ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা হয় ২০১০ সালে। সেটি ছিল হত্যাপ্রচেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগ। বিষ্ণোই তখন থেকে চাঁদাবাজি থেকে খুন পর্যন্ত নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হতে থাকেন। সবরমতি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকা সত্ত্বেও, তিনি কারাগারের আড়ালে থেকে অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
গ্যাং প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অপরাধ কর্মকাণ্ড
অপরাধ জগত ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ক্ষমতায় উত্থান চ্যালেঞ্জবিহিন ছিল না। এই গ্যাংটি অনেক হিংসাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে জড়িত ছিল, প্রায়শই তাদের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড চালায়। রাজনীতি ও ব্যবসা উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে এই গ্যাংয়ের কার্যকলাপ বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিষ্ণোইয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন জাসবিন্দর সিং, যিনি রকি নামেও পরিচিত। রকি পাঞ্জাবের ফাজিলকা থেকে একজন গ্যাংস্টার থেকে রাজনীতিবিদ হয়েছিলেন। রাজস্থান-পাঞ্জাব সীমান্তের শ্রী গঙ্গানগর ও ভরতপুরের মতো শহরে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের কার্যক্রম প্রসারিত করতে রকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু রকি নিজেই ২০২০ সালের মে মাসে হিমাচল প্রদেশে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংস্টার জয়পাল ভুলারের হাতে খুন হন।
বিষ্ণোই গ্যাং বেশ কয়েকটি আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান কার্যক্রম, বিশেষ করে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। গুজরাটের অ্যান্টি-টেররিস্ট স্কোয়াড (এটিএস) বিষ্ণোইকে তাঁর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে চোরাচালানের জন্য অভিযুক্ত করেছে।
সালমান খানকে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের হুমকি!
বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা সালমান খানকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে লরেন্স বিষ্ণোইর নাম জনসাধারণের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ১৯৯৮ সালে সালমান খান রাজস্থানে সিনেমার শুটিং চলাকালীন একটি কৃষ্ণকায় হরিণ হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ওই মামলার পর সালমান খানকে হুমকি দেন লরেন্স বিষ্ণোই।
প্রসঙ্গত, বিষ্ণোই সম্প্রদায় কৃষ্ণকায় হরিণকে একটি পবিত্র প্রাণী বলে মনে করে। এ নিয় তারা দীর্ঘদিন ধরে অভিনেতা সালমান খানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ পোষণ করে আসছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় যখন বিষ্ণোই ও তাঁর গ্যাং প্রকাশ্যে সালমান খানকে লক্ষ্যবস্তু (টার্গেট) করে। কৃষ্ণকায় হরিণ হত্যাকাণ্ডের র প্রতিশোধ নিতে এই চক্রটি সালমানকে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে জানা গেছে। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে সালমান খানের মুম্বাইয়ের বাসভবনের বাইরে কয়েক রাউন্ড গুলি চালানো হয়। অভিযোগ, বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সদস্যরা এই কাজে যুক্ত। এই হত্যাচেষ্টার পর মুম্বাই পুলিশ সালমান খানের বাড়ির চারপাশে নিরাপত্তা বাড়ায়। বর্তমানে তাঁর বাড়ির কাছে সবসময় পুলিশ উপস্থিতি থাকে।
কারাগারে থেকেও লরেন্স বিষ্ণোই তাঁর অপরাধমূলক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। তিনি কারাগারে বসে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন বলেও অভিযোগ। সালমান খানের বিরুদ্ধে তাঁর হুমকি শুধুমাত্র কুখ্যাতি অর্জনের চেষ্টাই নয়, বরং এই অভিনেতা ও বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান গভীর সাংস্কৃতিক উত্তেজনাকেও প্রতিফলিত করে।



