স্তন ক্যানসার বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে অক্টোবর মাস স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয় স্তন ক্যানসার সচেতনতার এই মাস। নারীদের মধ্যে প্রতি ৪ জন ক্যানসার আক্রান্তের অন্তত ১ জন স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত এবং ক্যানসারজনিত প্রতি ৬টি মৃত্যুর ১ টি স্তন ক্যানসারের কারণে ঘটে। যদিও নারী এবং পুরুষ উভয়েই স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারেন, তবে পুরুষের স্তন ক্যানসার অনেকাংশে বিরল। বাংলাদেশে ২০২০ সালে ১৩ হাজারের বেশি নারী নতুন করে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়, যা নারীদের মধ্যে মোট ক্যানসারের ১৯ শতাংশ। স্তন ক্যানসারের কারণে মৃত্যু হয় ৬৭৮৩ জনের যা ক্যানসারের কারণে মোট নারীর মৃত্যুর প্রায় ১৫ শতাংশ।
আমাদের শরীরে কোনো অংশের কোষ খুব দ্রুত এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে এক প্রকারের অস্বাভাবিক লাম্প বা চাকা তৈরি করে যাকে সাধারণত টিউমার বলা হয়। এই টিউমার বিনাইন এবং ম্যালিগন্যান্ট -এই দুই ধরনের হয়ে থাকে। স্তন টিউমারের অধিকাংশই বিনাইন (নির্দোষ টিউমার) হলেও এর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ টিউমার ম্যালিগন্যান্ট (ক্যান্সারাস) টাইপের হয়। স্তনের এই ম্যালিগন্যান্ট টিউমারকেই স্তন ক্যানসার বলা হয়। স্তন ক্যানসার বলতে স্তন কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি পাওয়াকেই বোঝায়।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, একেবারে শুরুর দিকে স্তন ক্যানসারের তেমন উল্লেখযোগ্য লক্ষণ বা উপসর্গ প্রকাশ না পেলেও সময়ের সঙ্গে এক বা একাধিক লক্ষণ প্রকাশ হতে থাকে। স্তনের এসব পরিবর্তন একজন নারী নিজে নিজেই অথবা তার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী অনুভব করতে পারে। প্রজননক্ষম নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের পরপর নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করার উপযুক্ত সময়। তবে, অধিকাংশ পরিবর্তন শুধুমাত্র ম্যামোগ্রাম, এমআরআই, বা আল্ট্রাসাউন্ডের মতো ইমেজিং পদ্ধতির মাধ্যমেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
স্তন ক্যানসারের লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ
১. স্তনের আকার বা আকৃতিতে পরিবর্তন।
২. স্তনে এক বা একাধিক লাম্প বা চাকা অনুভূত হওয়া।
৩. আগে অনুভূত হওয়া কোন চাকা পরিবর্তিত হওয়া।
৪. স্তনের চামড়া ফ্যাকাশে, লাল হওয়া বা ফুলে যাওয়া।
৫. স্তন বা স্তনবৃন্তে ব্যথা হওয়া যা সহজে দূর হয় না।
৬. স্তনবৃন্তের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন হওয়া যেমন, অসমান হওয়া, চ্যাপ্টা হওয়া, বেঁকে যাওয়া বা উলটে যাওয়া।
৭. স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত বা অন্য কোনো তরল নিঃসরণ হওয়া।
৮. বগলে ফুলে যাওয়া বা চাকা দেখা দেওয়া।
উপরের যেকোন এক বা একাধিক উপসর্গ অথবা স্তনের অন্য কোনো পরিবর্তন নারী নিজে অথবা তার চিকিৎসক যেই-ই বুঝতে পারুক না কেন পরিবর্তনটি সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি। চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে পরিবর্তনটি স্তন ক্যানসার কি না তা নির্ণয় করবেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। আর তাই নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করে দেখতে হবে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে কি না।
প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণ
সমাজের সকলে সচেতন হলে স্তন ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়েই দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে স্তন ক্যানসার ক্ষেত্রবিশেষে পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য এবং এর মাধ্যমে স্তন ক্যানসারজনিত মৃত্যুহার হ্রাস করা সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্তকরণ তিনটি ধাপে সম্পন্ন করতে হয়-
১. Breast Self-Examination (BSE): নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা করা। ২০ বছর বয়স থেকে বাড়িতে বসে নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করা উচিত।
২. Clinical Breast Examination (CBE): একজন ডাক্তার বা পেশাদার স্বাস্থ্যসেবক দ্বারা স্তনের পরীক্ষা করানো। ২৯ থেকে ৩৯ বছর বয়সের মধ্যে, মহিলাদের প্রতি ১ থেকে ৩ বছরে একবার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর দ্বারা CBE করানো উচিত। ৪০ ঊর্ধ্ব বয়সের মহিলাদের প্রতি বছর ১ বার নিয়মিত CBE করানো দরকার।
৩. Mamography: ম্যামোগ্রাফি হল স্তনের এক ধরনের কম মাত্রার এক্সরে। স্তন ক্যানসারের জন্য উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী মহিলাদের প্রতি বছর একবার করে ম্যামোগ্রাম করা উচিত।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক গাইনি, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ


পিরিয়ডের ব্যথার কারণ কী? যা যা করা যেতে পারে
শাপলা ডাঁটা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়
