আজ বেশ একটা ঘটনাবহুল দিন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের যে কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল, তার মধ্যে চারটি কমিশনের প্রধানেরা আজ বুধবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তাঁদের সুপারিশ হস্তান্তর করেছেন। এই একই দিনে রাজধানীর এনসিটিবি কার্যালয় এলাকায় প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’ ব্যনারের শিক্ষার্থীরা হামলার শিকার হলো। কে করল? শিক্ষার্থীদের আরেকটি সংগঠন, যারা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’ নামে।
নতুন পাঠ্যবই নিয়ে হুল্লড়টা চলছেই। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পাঠ্যবই সংস্কারে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটি কাজ শুরুই করতে পারেনি। এক পক্ষের হুঙ্কারেই সেই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এর পর কি পাঠ্যবই পরিমার্জন বা সংস্কার থেমে ছিল? না। সংস্কার হয়েছে। বিভিন্ন বইয়ের ইতিহাস, বাংলা বইয়ের গল্প‑কবিতা থেকে শুরু করে, নানা কিছুই বদল হয়েছে। বেশ কিছু বিষয় প্রবেশ করেছে। গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে এমন গ্রাফিতি, কবিতা ইত্যাদির সংযোজন হয়েছে।
এই সংযোজন ও নতুন করে বই ছাপার কারণে পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতেও পৌঁছাতে দেরি হয়েছে। এখনো সব জায়গায় বই পৌঁছায়নি। এ বিষয়ে অবশ্য প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম একটি উপায় বাতলে দিয়েছেন শিক্ষার্থীদের। এ সম্পর্কিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন, সবার হাতে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এনসিটিবির ওয়েবসাইটে সব পাঠ্যবই আপলোড করা আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ও শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট পাঠ্যবইয়ের পিডিএফ নামিয়ে কাজ চালাতে পারছেন।
সে যাক। ফেরা যাক আজকের ঘটনায়। এই পাঠ্যবই পরিমার্জনের পর নবম ও দশম শ্রেণির নতুন পাঠ্যবইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে গণঅভ্যুত্থানের সময় করা একটি গ্রাফিতি স্থান পায়। অভ্যুত্থানের সময় তো বটেই অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর কয়েক দিন শিক্ষার্থীরা পথে পথে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের সময় এ ধরনের বেশ কিছু গ্রাফিতি করেছিল। যদি শিরোনাম দেওয়া হয়, তবে এই গ্রাফিতিকে ডাকতে হয় ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’ নামে। গ্রাফিতিটিতে একটি চারাগাছের বেশ কিছু পাতায় দেশের ধর্ম‑জাতি নানা মানদণ্ডে বৈচিত্র্যকে জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে স্থান পাওয়া গ্রাফিতিটিতে থাকা পাঁচটি পাতার মধ্যে ছিল–‘মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও আদিবাসী’ শব্দগুলো। নিচে লেখা ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’। আর প্রচ্ছদে গ্রাফিতিটির ওপরে লেখা–কারও মনে কষ্ট দিও না।
নিঃসন্দেহে গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও তার কার্যক্রমের বিস্তারের সময়ে বহুল উচ্চারিত ‘ইনক্লুসিভিটি’ বা ‘ইনক্লুসিভ সোসাইটি’ গঠনের যে প্রত্যয়, তারই একটি নিদর্শন হিসেবে একে গণ্য করা যায়। মুশকিল হলো, এই ‘ইনক্লুসিভ সোসাইটি’র যে প্রস্তাব পাঠ্যবইয়ে উঠে এল একটি গ্রাফিতির মাধ্যমে, সেখানে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকে মানতে পারল না একটি গোষ্ঠী। আগেই বলা হয়েছে, এই গোষ্ঠীটি নিজেদের পরিচয় দেয় ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’ নামে। তারা প্রতিবাদ জানাল। এবং পাঠ্যবই থেকে ‘আদিবাসী’ শব্দযুক্ত গ্রাফিতি সরানোর দাবি নিয়ে এনসিটিবি ঘেরাও করল। তাদের ঘেরাওয়ের ফল–নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের পেছনের প্রচ্ছদের ‘আদিবাসী’ শব্দযুক্ত গ্রাফিতি রাতারাতি সরে গেল। সেই স্থান নিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পঙ্ক্তি–‘বল বীর/ চির উন্নত মম শির’।
এটা অবশ্য নতুন নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও তার সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা দপ্তরগুলো এমন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আগেও নিয়েছে। দেখা গেছে কেউ ঘেরাও করল, কেউ হুঙ্কার দিল, বা কেউ হুমকি দিয়ে কোনো দাবি উত্থাপন করল, তো রাতারাতি সিদ্ধান্ত বদল হলো। কী ধরনের সিদ্ধান্ত? একটি তো এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে। জনা দু শ শিক্ষার্থীর কয়েক ঘণ্টার ঘেরাও কর্মসূচিতে এইচএসসির বাকি থাকা পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল কর্তৃপক্ষ। পাঠ্যপুস্তক সংশোধন কমিটির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটল। একই ধারায় প্রকাশিত পাঠ্যবইয়ের পেছনের প্রচ্ছদ গেল বদলে। রসাতলে গেল প্রথম গ্রাফিতিটির মাধ্যমে পরোক্ষে ঘোষিত ‘ইনক্লুসিভিটি’ ও সে সম্পর্কিত আলোচনা। এমনকি এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরফ থেকেও কোনো ট্যাঁফো হলো না। অথচ কথা ছিল–বৈষম্যের চিহ্ন দেখলেই আওয়াজ উঠবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই গোটা আমলে ‘ছাত্র‑জনতার’ সামনে এ ধরনের বিষয়গুলো এমন এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে যে, ঘেরাও করতে পারলেই কাজ হবে। ফলে নিজেদের দাবি জানাতে কর্মসূচি ঘোষণা করে ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’। ঘোষণা অনুযায়ী আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের সামনে সমবেত হয় তারা। সেখান থেকে এনসিটিবির উদ্দেশে মিছিল নিয়ে যায়। এনসিটিবি ঘেরাও করে নিজেদের দাবি উত্থাপনের জন্যই তারা গিয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’ নামের সংগঠনটিও ওই গ্রাফিতি বাদ গেলেও তাদের দাবি পুরোপুরি মানা হয়নি মর্মে ঘেরাও কর্মসূচি নিয়ে যায়। সেখানে ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’ ব্যানারে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও জনতার ওপর হামলা চালায়। আহত হয় অনেকে। এ ঘটনায় ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’রও কয়েকজন আহত হয়।
‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’র দাবিগুলো আসলে কী? দেখা যাক–‘পাঠ্যপুস্তকে রাষ্ট্রদ্রোহী, সংবিধানবিরোধী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিভাষা “আদিবাসী” শব্দ প্রবেশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিরোধী অখণ্ড ভারতের কল্পিত গ্রাফিতি সংযোজনের দায়ে রাখাল রাহা ওরফে সাজ্জাদের অপসারণ এবং এর সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে তদন্ত কমিটি গঠন না হওয়ায় পুনরায় “জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)” ঘেরাও কর্মসূচি ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠন “স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি”।’
অর্থাৎ, ‘আদিবাসী’ শব্দ নিয়ে তাদের আপত্তি মুখ্যত সংবিধানকেন্দ্রিক। অর্থাৎ, প্রস্তাবিত সংস্কারযুক্ত সংবিধান নয়, বিদ্যমান সংবিধান। বিদ্যমান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচনাতেই ‘আদিবাসী’ শব্দপ্রয়োগকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বিষয় হিসেবে দেখেছে তারা। তাহলে প্রশ্ন আসে, এই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ও বিস্তৃত হওয়া বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তো বলছে, তারা সব জাতিসত্তাকে জায়গা করে দিতে পারে এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। কোনো একটি সম্প্রদায় বা জাতি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার মতো কোনো বিধান তারা রাখতে চায় না, যা ক্ষমতাতন্ত্রকে বা শাসককে ফ্যাসিবাদী হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। এ জন্য সংবিধানে বড় ধরনের সংস্কারের কথাও তারা বলছে। শুরুতেই বলা হয়েছে, এই সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশন এরই মধ্যে তাদের প্রস্তাব বা সুপারিশমালা প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দিয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন আসে, কোন ইনক্লুসিভিটির কথা বলা হচ্ছে? সংস্কারে আসলে প্রশাসনিক বিষয়গুলোর বাইরে মানুষ কতটা স্থান পাচ্ছে? যারা বিদ্যমান সংবিধানকে ছুড়ে ফেলার কথা বলছে, তারাই কী করে আবার এর ভিত্তিতেই একটি শব্দ প্রয়োগকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে? বিষয়গুলো কি সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে না?
তারচেয়েও বড় প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসছে, সব প্রতিবাদ কি তবে সমান মর্যাদা পাবে না। অথচ সংবিধান সংস্কারে গঠিত কমিশনের প্রস্তাবে থাকা পাঁচ মূলনীতিতে তো বলা হচ্ছে–সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও বহুত্ববাদের কথা। আবার, বিদ্যমান সংবিধানেও প্রতিবাদ, মিছিল, সভা ও সমাবেশ করার অধিকারের কথা বলা আছে। তাহলে কীসের ভিত্তিতে একটি প্রতিবাদী কর্মসূচিতে হামলা করা হয়? এতে আহত হয় এমন অনেকে, যারা ঝুঁকি নিয়ে জুলাই থেকে আন্দোলনে ছিলেন। এর মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’র রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা (২৪), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইসাবা (২৬), রেংইয়াং (২৯), ধনযেত্রা (৩০), ঢাবির লোক প্রশাসন বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী শৈলী (২৭), দনওয়াই ম্রো (২৪), তনিচিরাং (৩০) ও সাংবাদিক জুয়েল মার (৩৫)।
এই আহতদের তরফ থেকে প্রশ্ন উঠেছে–তাহলে কোন বৈষম্য নিরসনে তাঁরা আন্দোলন করেছিলেন? বৈষম্যেরও কি তবে ভালো‑মন্দ ভাগ আছে যে, মন্দ বৈষম্য হটাতে হবে এবং ভালো বৈষম্য রেখে দিতে হবে? থাকলে কীসের ভিত্তিতে ‘ভালো’ এবং ‘মন্দ’ বৈষম্য সংজ্ঞায়িত হবে? কে করবে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা কঠিন বলে মনে হতে পারে। তবে প্রতিবাদ কর্মসূচি নিরাপদে পালনের ক্ষেত্রেও কোনো কোটা‑রি আছে কিনা–এ প্রশ্নের উত্তর প্রশাসন ও কর্তাব্যক্তিরা চাইলেই দিতে পারেন। কারণ, সুস্পষ্টভাবে সমাজের বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কোনো একটি অংশের প্রতিবাদই এখন পর্যন্ত সাদরে গ্রহণ করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকেও বেশ নমনীয় মনে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবাদ বা দাবি উত্থাপনমাত্রই তা মেনে নেওয়া হয়েছে। ফলে সমাজের একটি অংশকে বাড়তি সুযোগ বা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে অপর অংশ ‘বৈষম্য’ শব্দটি নতুন প্রেক্ষাপটে হাজির করলে, বলার কিছু থাকবে কী?
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



