রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আজ চতুর্থ বছরে পা দিয়েছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ শেষ করার জন্য সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া তৎপরতা শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে দেশ দুটির শীর্ষ কর্মকর্তারা সম্প্রতি সৌদি আরবে বৈঠক করেছেন। এতে দুই দেশের সম্পর্ক পুনরায় শুরু করা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক দিন ধরে বলে আসছেন, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চান। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও যুদ্ধ শেষ করতে দর-কষাকষি করতে ইচ্ছুক বলে মত প্রকাশ করছেন। তবে রণক্ষেত্রের বাস্তবতা মেনে নিয়েই যুদ্ধ শেষ হতে হবে- এমন দাবি পুতিনের। অর্থাৎ রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের যে পরিমাণ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তা চিরতরে তাদের হয়ে যাবে।
পুতিনের এমন মনোভাব সত্ত্বেও ট্রাম্প বলেছেন, পুতিন যুদ্ধ শেষ করতে চুক্তি করতে আগ্রহী। তবে সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা কেমন হবে, এখনো স্পষ্ট নয়। এরই মধ্যে ট্রাম্প জানিয়েছেন, চলতি ফ্রেব্রুয়ারি মাসেই পুতিনের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হতে যাচ্ছে। তবে এখনো বৈঠক সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কিছু জানায়নি দুই দেশ।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় মিত্র ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সেই সম্পর্ক নড়বড়ে হয়ে গেছে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তববাদী চিন্তাভাবনার কারণে বর্তমানে বলতে গেলে পাহাড়সম চাপে আছে কিয়েভ। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয়দের সঙ্গে ঐক্য অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি জেলেনস্কিকে ‘বিনা নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক’ বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প অনেকটা হুমকির সুরে বলেছেন, জেলেনস্কিকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অন্যথায় তাঁর দেশ বলে কিছু থাকবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন হুমকি জেলেনস্কি তো বটেই, মিত্রদেরও হতবাক করেছে।
ট্রাম্পের ইউক্রেন যুদ্ধ তড়িঘড়ি করে শেষ করতে চাওয়ায় ওয়াশিংটনের ইউরোপীয় মিত্ররা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের রিয়াদে বৈঠকে ইউক্রেনকে আমন্ত্রণ না জানানো এবং ২০২২ সালের যুদ্ধের জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করায় তারা বেশ বিচলিত।
ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগের তোড়জোড়ের মধ্যে ইউরোপীয় নেতারা ইউক্রেন নিয়ে বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁরা নিজ নিজ প্রতিরক্ষা ব্যয় কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ইউরোপের কোনো কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইউক্রেনে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠাতে চায়। এই প্রস্তাবকে জেলেনস্কি স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ইউক্রেনে ইউরোপীয় বাহিনী পাঠানো নিয়ে গুরুতর আপত্তি জানিয়েছে রাশিয়া।
ন্যাটোর ভূমিকা
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গত সপ্তাহে ন্যাটো মিত্রদের বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির যে আলোচনা চলছে, এর আওতায় ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করা বাস্তবসম্মত নয়। তাছাড়া হারানো ভূখণ্ড ফিরে পাওয়ার যে চিন্তা কিয়েভ করছে, তা ‘অলীক’।
ন্যাটোর ২০০৮ সালের শীর্ষ সম্মেলনে বলা হয়েছিল, একদিন না একদিন ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হবে। যেকোনো ধরনের শান্তিচুক্তির জন্য রাশিয়ার অন্যতম প্রধান দাবি, কিয়েভকে এই আশা বাদ দিতে হবে। শান্তিচুক্তির জন্য ন্যাটো সদস্যদের বাহিনী ইউক্রেনে শান্তিরক্ষী হিসেবে মোতায়েনের পরিকল্পনারও রদ চায় মস্কো।
কিন্তু যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁসহ আরও কয়েকজন ইউরোপীয় নেতা ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইউরোপীয় বাহিনী পাঠানোর বিষয়ে এখনো আগ্রহী। তারা এটি নিয়ে একটি নতুন প্রস্তাব তৈরির চেষ্টা করছেন।
এদিকে ইউক্রেন যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য হতে চায়, এ বিষয়ে রাশিয়ার খুব একটা আপত্তি নেই। ক্রেমলিন এরই মধ্যে বলেছে, ইউক্রেন ইইউতে যেতে চায় কি না, এটি একান্তভাবে কিয়েভের প্রশ্ন এবং সার্বভৌম অধিকার। এতে মস্কো হস্তক্ষেপ করবে না।
ভূখণ্ড
যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনাদের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। তারা এরই মধ্যে পূর্ব ও দক্ষিণে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড দখলে নিয়েছে। বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের ভূখণ্ডের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার স্কয়ার কিলোমিটার, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের প্রায় সমান। তাই সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইউক্রেনকে কী পরিমাণ ভূখণ্ড হারাতে হবে? অন্যভাবে বললে, রাশিয়া কী পরিমাণ ভূখণ্ডের দাবি করবে?
গত বছরের জুনে ভূখণ্ডের বিষয়ে নিজের খোলামেলা অবস্থান তুলে ধরেন পুতিন। তখন তিনি ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণের অঞ্চল নিয়ে রাশিয়া যে চারটি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেছে, সেখান থেকে ইউরোপীয় সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার চেয়েছেন।
এসব অঞ্চলের অধিকাংশ বর্তমানে রাশিয়ার দখলে হলেও সেখানকার কিছু কিছু ভূখণ্ডে এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে স্থানীয়দের দিয়ে গঠিত রুশ প্রশাসন চলছে। ব্যাংক ব্যবস্থা, স্কুলের বই, সড়কের নির্দেশনা, রেডিও-টেলিভিশনসহ সব ধরনের সংবাদমাধ্যম রুশ ভাষায় চলছে।
গত নভেম্বরে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করতে সম্মত হলেও ইউক্রেনের উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ড ছাড়তে রাজি হবেন না পুতিন। অন্যদিকে কিয়েভের ন্যাটোতে যোগদানও কোনোভাবেই মেনে নেবে না মস্কো।
ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক
ওয়াশিংটন-মস্কোর আলোচনা বর্তমানে যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠক অনিবার্য। তবে তা কবে নাগাদ হতে পারে, এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। যদি এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তা হবে ২০২১ সালের পর রুশ ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। এই বৈঠক থেকে কি ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে, সেটিই দেখার অপেক্ষা।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, টেলিগ্রাফ



