ট্রাইকোটিলোমানিয়া এক প্রকারের মানসিক ব্যাধি। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি চুল, ভ্রু বা শরীরের অন্য অংশ থেকে লোম টেনে তোলার চেষ্টা করেন। ট্রাইকোটিলোমানিয়া, যা Hair-Pulling Disorder নামেও পরিচিত। এটি একটি মানসিক রোগ, যেখানে ব্যক্তি বারবার নিজের চুল টেনে তোলেন, যা চুলের ক্ষতি এবং মানসিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে। DSM-5 (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders, 5th Edition) অনুযায়ী, এটি অবসেসিভ কমপালসিভ রিলেটেড ডিসঅর্ডার বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। এটি শুধু একটি খারাপ অভ্যাস নয়, বরং নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ যা ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করতে পারে।
DSM-5 এই ব্যাধিকে নির্ণয় করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো:
১. পুনরাবৃত্তিমূলক চুল টানা এবং চুলের ক্ষতি: ব্যক্তি বারবার মাথার চুল, ভ্রু, চোখের পাপড়ি বা শরীরের অন্যান্য অংশের লোম টেনে ফেলেন, যার ফলে দৃশ্যমান চুলের ক্ষতি হয়।
২. চুল টানা বন্ধ করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা: ব্যক্তি সচেতনভাবে চুল টানার অভ্যাস কমানোর চেষ্টা করলেও বারবার ব্যর্থ হন।
৩. সামাজিক বা ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব: এই আচরণ ব্যক্তির মানসিক অস্বস্তি, আত্মবিশ্বাসের সংকট এবং সামাজিক বা কর্মক্ষেত্রের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৪. অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক রোগের কারণে নয়: চুল টানার কারণ যদি অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা (যেমন: চর্মরোগ) বা মানসিক ব্যাধি (যেমন: বডি ডিসমরফিক ডিসঅর্ডার) দ্বারা ব্যাখ্যা করা না যায়, তবে এটি ট্রাইকোটিলোমানিয়া হিসেবে বিবেচিত হবে।
ট্রাইকোটিলোমানিয়ার বৈশিষ্ট্য
- এটি একটি নিয়ন্ত্রণহীন ইচ্ছা, যা ব্যক্তির পক্ষে থামানো কঠিন হয়ে ওঠে।
- চুল টানার আগে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং টানার পর স্বস্তি বা তৃপ্তির অনুভূতি হয়।
- এটি হতে পারে সচেতন বা অজান্তে।
- অনেকে চুল খাওয়া বা চুলের অংশ মুখে দেওয়ার অভ্যাসও গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে হজমজনিত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো
DSM-5 অনুযায়ী, ট্রাইকোটিলোমানিয়ার নির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা না গেলেও কয়েকটি বিষয় এটির সাথে সম্পর্কিত:
১. জেনেটিক কারণ: পরিবারের কারও ট্রাইকোটিলোমানিয়া থাকলে এই ব্যাধির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
২. স্নায়বিক পার্থক্য: মস্তিষ্কের কিছু নিউরোট্রান্সমিটারের (যেমন: ডোপামিন, সেরোটোনিন) ভারসাম্যহীনতা এই সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
৩. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: উচ্চ মাত্রার মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্নতা ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে।
৪. অন্যান্য মানসিক রোগের সঙ্গে সম্পর্ক: ট্রাইকোটিলোমানিয়া অনেক সময় অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসওর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিসওর্ডার, বডি ডিসমরফিক ডিসঅর্ডার ইত্যাদির সাথে সহাবস্থান করে।
ট্রাইকোটিলোমানিয়ার প্রভাব
১. সামাজিক ও আত্মবিশ্বাসজনিত সমস্যা: আক্রান্ত ব্যক্তিরা চুল হারানোর কারণে আত্মবিশ্বাস হারাতে পারেন এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলতে পারেন।
২. দৈনন্দিন জীবনে ব্যাঘাত: কাজ, পড়াশোনা এবং ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
৩. শারীরিক জটিলতা: যারা চুল খেয়ে ফেলেন, তারা Trichobezoar (hairball formation) সমস্যায় পড়তে পারেন, যা অন্ত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে।
DSM-5 অনুযায়ী, ট্রাইকোটিলোমানিয়ার কার্যকর চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে:
মনোচিকিৎসা
- কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে ব্যক্তি তার ট্রিগারগুলো চিহ্নিত করতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেন।
- হেবিট রিভারসেল ট্রেনিং পদ্ধতিতে চুল টানার পরিবর্তে বিকল্প আচরণ গড়ে তোলার কৌশল শেখানো হয়।
জীবনধারা পরিবর্তন ও স্ব-নিয়ন্ত্রণ কৌশল
১. স্ট্রেস কমানোর জন্য মেডিটেশন, যোগব্যায়াম ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে পারেন।
২. হাত ব্যস্ত রাখতে রাবার ব্যান্ড টানানো, বল চেপে ধরা, ডুডল করা ইত্যাদি সহায়ক হতে পারে।
৩. লম্বা হাতাওয়ালা জামা পরা বা চুল ঢেকে রাখা চুল টানার প্রবণতা কমাতে পারে।
DSM-5 অনুযায়ী, ট্রাইকোটিলোমানিয়া শুধুমাত্র একটি অভ্যাস নয়, বরং এটি অবসেসিভ কম্পালসিভ রিলেটেড ডিসঅর্ডার শ্রেণির একটি গুরুতর মানসিক ব্যাধি। সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তা পেলে এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই, যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ এই সমস্যায় ভুগে থাকেন, তবে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।
লেখক: সাইকোলজিস্ট, শান্তিবাড়ী



