
রোববার (১৮ মে) থাইল্যান্ডে যাওয়ার সময় রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয় চিত্রনায়িকা নুসরাত ফারিয়াকে। এরপর ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন রাজধানীর ভাটারা থানাধীন এলাকায় হওয়া একটি হত্যাচেষ্টা ঘটনায় ঢাকার সিএমএম আদালতে দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
মামলার নথিপত্র থেকে জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের সংশ্লিষ্ট ২৮৩ জন ও অজ্ঞাতনামা ৩-৪ শত জনের বিরুদ্ধে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলাটি করেছেন এনামুল হক।

হত্যাচেষ্টা মামলার সময়কাল হলো, আন্দোলন চলাকালীন সময়। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ সময়টার পুরোটাই ছাত্রদের আন্দোলনের পক্ষে কথা বলেছেন ‘হাসিনা’খ্যাত এ তারকা। সবচেয়ে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় হলো, হত্যাচেষ্টার সময়কালের পুরোটা সময় দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন এ তারকা। এমনকি আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ১৬ জুলাই কানাডার ক্যালগারিতে কনসার্ট মঞ্চে ছিলেন। নিজের গানগুলো পরিবেশনায় ব্যস্ত ছিলেন ফারিয়া।

সেই সময়ে ফারিয়ার অবস্থান নিশ্চিত হতে যোগাযোগ করা হয় ক্যালগারির সেই অনুষ্ঠান আয়োজকদের সঙ্গে। তাঁদের ফেসবুক ঘেঁটে পাওয়া যায় বেশ কিছু ছবি। সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালের হাতে এসেছে ফারিয়ার সেই বিদেশ যাত্রা ও ফিরতি টিকিটও।
অন্যদিকে, ১৭, ১৮ ও ১৯ জুলাই—টানা কয়েকদিন আন্দোলনের পক্ষে স্ট্যাটাস দিয়েছেন ফারিয়া, যা চলেছে পরবর্তী ৭ আগস্ট অবধি।

শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নৃশংস হামলার পর ১৭ জুলাই ফারিয়া ফেসবুকে লেখেন, ‘আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে’।

ফারিয়া ১৮ জুলাই পোস্ট করেন ছাত্র আন্দোলন নিয়ে। সে সময় সরকারের ন্যাক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের ‘গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলে’র একটি ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করে ফারিয়া লেখেন, ‘এর চেয়ে হতাশার কিছু নেই।’ এরপর তিনি নিয়মিত ছাত্র আন্দোলনের ছবি প্রকাশ করেন।

আন্দোলন চলাকালীন ১৮ জুলাই রাত পৌনে ৯টার পর থেকে দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ১৭ জুলাই মধ্যরাত থেকে সরকার ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করায় দেশের মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ হয়ে যায়। ব্রডব্যান্ড সংযোগ ২৩ জুলাই চালু হলেও মোবাইল ইন্টারনেট তখনও চালু হয়নি। সে সময়টাতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন ফারিয়া। আর দেশের বাইরে থাকাতেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে তাঁর একাধিক ঘনিষ্ঠজন দাবি করেছেন।
১৯ জুলাই নিজের অসহায়ত্বের কথাও ফুটে ওঠে ফারিয়ার ফেসবুক পোস্টে। লেখেন, ‘২ দিন হয়ে গেল, বাংলাদেশে ইন্টারনেট নেই। দেশটি বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন। আমরা কি সত্যিই আলোচনা করে এই সমস্যার সমাধান করতে পারি না? এটা এত কঠিন কেন? খুব অসহায় বোধ করছি।’
২৩ জুলাই আবারও ফারিয়া তাঁর উৎকণ্ঠা জানান ফেসবুকে। লেখেন, ‘৬ দিন হয়ে গেল আমার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলিনি। আপনারা সবাই জানেন আমার বাবার অবস্থা তেমন ভালো না। কিন্তু আমি আমার সহকর্মী ছাত্র ভাই এবং বোনের জন্য অনুভব করি। সবার সুস্থতা ও দেশের শান্তি কামনা করছি।’
এমনকি ৩ আগস্ট জাতীয় শহীদ মিনারে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে ছবি প্রকাশ করেন এই শিল্পী। যেখানে ঘোষণা করা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ও নয়া বন্দোবস্ত।
এদিকে, ফারিয়ার সেই বিদেশযাত্রা ও অবস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে পাওয়া গেছে ‘ঢাকা টু দুবাই টু কানাডা’ টিকিট এবং রিটার্ন টিকিট। সেখানে দেখা যায়, ফারিয়া কানাডার উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন ৯ জুলাই, ২০২৪। দেশের ফেরেন ১৪ আগস্ট, ২০২৪।

তাহলে নতুন এই সময়ে কি কারণে ফেঁসে যাচ্ছেন এই শিল্পী? ফারিয়ার একাধিক ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শেখ মুজিবুর রহমানের বায়োপিক ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ সিনেমায় অভিনয় ও এ সিনেমা নিয়ে তাঁর বক্তব্যই মামলায় হয়তো নতুন রসদ জুগিয়েছে।
চলতি বছরের ২২ মার্চ ইউটিউবে প্রচারিত একটি পডকাস্টে ফারিয়া ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো সিনেমাটি নিয়ে মুখ খোলেন। সেই অনুষ্ঠানে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, মুজিব সিনেমায় শেখ হাসিনা চরিত্রে অভিনয় করা নিয়ে তাঁর মধ্যে কোনো অনুশোচনা আছে কিনা?
এতে তাঁর বক্তব্য ছিল এমন, ‘আমি বলতে চাই, এখানে অনুশোচনার মতো কিছুই নেই।’ এরপর সেই কথা পরিষ্কার করলেন ফারিয়া এভাবে, ‘আমরা শিল্পীরা সাড়ে ৫টায় ঘুম থেকে উঠে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করি। এর পেছনে অনেক শারীরিক পরিশ্রম যায়। স্পেশাল এই সিনেমার (মুজিব: একটি জাতির রূপকার) জন্য ২০১৯ থেকে ২০২৩—৫ বছর আমি একই লুকে নিজেকে মেইনটেইন করেছি। চুলে কোনো রঙ করিনি, কালো চুল নিয়ে ঘুরেছি এই চরিত্রটির জন্য। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ শারীরিক ওজনের মধ্যে থাকতে হয়েছে। মোট কথা, আমি বলতে চাই এই সিনেমার জন্য আমি আমার জীবনের দীর্ঘ ৫টি বছর দিয়েছি। ফলে সেই কাজটিকে নিয়ে যদি অনুশোচনা করি তাহলে আমার পেশাকেই অপমান করা হবে।’

কাকতালীয়ভাবে সেই সাক্ষাৎকার প্রচারের কয়েকদিনের মধ্যে ঢাকার সিএমএম আদালতে ফারিয়ার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলাটির আবেদন করা হয়। পরবর্তী সময়ে আদালত এটির এজহার করতে ভাটারা থানাকে নির্দেশ দেন।



