‘ট্রাম্পকে আমি ভালোবাসি’ থেকে ‘ট্রাম্পের পদত্যাগ চাই’, মাস্ক ইউটার্ন নিলেন কেন? 

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৫, ০৫:১৯ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ধনকুবের ইলন মাস্কের সম্পর্ক এখন চরম তিক্ত। যে মাস্ককে এই কিছু দিন আগে জড়িয়ে ধরেছিলেন ট্রাম্প, যাঁর জন্য হোয়াইট হাউসে গড়ে দিয়েছিলেন আলাদা দপ্তর, সেই তিনিই হয়ে উঠেছেন তাঁর সরকারের পথের ‘কাঁটা’! মাস্কের সংস্থাগুলোর ভর্তুকি বাতিল থেকে শুরু করে সরকারি চুক্তি বাতিল—একের পর এক কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু মাস্কও থামছেন না। পাল্টা আক্রমণ করেই যাচ্ছেন, যে আক্রমণ হচ্ছে ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও। 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির ফলে এক ধাক্কায় মাস্কের সংস্থার শেয়ার পড়ে গেছে। মানুষজন টেসলার শেয়ার বিক্রি করে দিতে দু’বার ভাবছে না। কিন্তু সেই আর্থিক ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়েও নিজের অবস্থানে অনড় স্পেসএক্সের মালিক। তিনি বলছেন, ‘আমি সাহায্য না করলে ট্রাম্প আমেরিকার মসনদেই বসতে পারতেন না।’

কিন্তু ট্রাম্প-মাস্কের সম্পর্কে কেন এই ‘ইউটার্ন’? গলায়-গলায় বন্ধুত্ব কেন কাদা ছোড়াছুড়িতে পরিণত হলো? কেমন ছিল তাঁদের ‘ব্রোম্যান্স’-এর (মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো ট্রাম্প-মাস্কের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে এই শব্দ ব্যবহার করছে) শুরুটা?

সম্পর্কের ‘মধুর সময়’ 
২০২৪ সালের ১৩ জুলাই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চার মাস আগে পেনসিলভানিয়ায় একটি সভা করতে যান রিপাবলিকান পদপ্রার্থী ট্রাম্প। সেখানে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে গুলি চালান এক যুবক। গুলি ট্রাম্পের কান ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়, রক্ত ঝরে মঞ্চে। ওই ঘটনা আমেরিকায় আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। সেখানেই মাস্কের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের সূত্রপাত। ট্রাম্পের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন মাস্ক। তিনি লেখেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। আশা করছি উনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।’ 

এরপর একাধিক জনসভায় ট্রাম্পের পাশে দেখা যেতে থাকে মাস্ককে। পরনে ট্রাম্পের স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ সম্বলিত টুপি। ট্রাম্পের হয়ে ঢালাও প্রচারও করেছিলেন নির্বাচনে। তিনি এসব সভায় নাচছেন–এমন ছবিও প্রকাশ্যে আসে।  

ট্রাম্প দ্বিতীয় বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরে মাস্কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। মাস্ককে প্রথমে প্রেসিডেন্টের বিশেষ পরামর্শদাতা (অবৈতনিক) পদে নিয়োগ করেছিলেন ট্রাম্প। পরে তাঁর জন্য প্রতিষ্ঠা করেন সরকারি দক্ষতা বিষয়ক দপ্তর (ডিওজিই)। সেই দপ্তরের কাজই ছিল ‘অপ্রয়োজনীয়’ খরচ কাটছাঁট করে ট্রাম্প প্রশাসনকে সাহায্য করা। দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন মাস্ক। তখন লিখেছিলেন, ‘আমি ট্রাম্পকে ভালোবাসি।’ সেই সময় ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠেছিলেন মাস্ক। খরচ কমাতে একাধিক সাহসী পদক্ষেপও নেন তিনি।

ইলন মাস্ক ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সএকটি বিল ও সম্পর্কের তিক্ততার শুরু
আমেরিকার জনস্বার্থে গত মাসে কর হ্রাস সংক্রান্ত ‘জনকল্যাণমূলক’ বিলে স্বাক্ষর করেছেন ট্রাম্প। নিজে সেটিকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘বড় ও সুন্দর বিল’ হিসেবে। কিন্তু সেই বিলেই ট্রাম্প-মাস্ক তিক্ততার বীজ বোনা হয়। একটি সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে মাস্ক বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বলছেন, নতুন বিলটি বেশ বড় ও সুন্দর। কিন্তু কোনো বিল একই সঙ্গে বড় ও সুন্দর হতে পারে বলে আমি মনে করি না। হয় সেটি বড় হবে, নয়তো সুন্দর।’ ট্রাম্পের ওই বিলের ফলে এত দিন ধরে ডিওজিই যে কাজ করে এসেছে, তা ব্যর্থ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন মাস্ক। পরদিনই ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ইস্তফা দেন এই ধনকুবের।

পদত্যাগের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই ঘোষণা করেন মাস্ক। তিনি লেখেন, ‘আমার নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’ পরদিন মাস্ককে পাশে বসিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ট্রাম্প। সে দিনও দু’জনের সম্পর্কের তিক্ততার আঁচ দেখতে পাওয়া যায়নি। মাস্ককে ‘দুর্দান্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। মধুর কথায় বিদায় দিয়েছিলেন। 

পদত্যাগের পর মাস্ক অবশ্য আর রাখঢাক করেননি। প্রকাশ্যেই ট্রাম্পের বিলের সমালোচনা করতে শুরু করেন। তিনি দাবি করেন, ওই বিল মার্কিন প্রশাসনকে ‘দেউলিয়া’ করে দেবে। ব্যর্থ করবে ডিওজিইর যাবতীয় সাশ্রয়ের চেষ্টা। মাস্ক বলেন, ‘কংগ্রেসের এই বিশাল সাংঘাতিক বিল জঘন্য।’ 

মাস্ক মুখ খোলার পর নীরব থাকেননি ট্রাম্পও। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সরাসরি অভিযোগ করেন, বৈদ্যুতিক গাড়ির ট্যাক্স ক্রেডিট বাতিল করায় টেসলার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তাই মাস্ক চটেছেন এবং পরিকল্পনা করেই ওই ‘সুন্দর’ বিলটির বিরোধিতা করছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘ইলনের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। জানি না আগামী দিনে আর তা থাকবে কি না। ওর আচরণে আমি খুব হতাশ। এই বিলের খুঁটিনাটি ও জানত। অন্য যে কোনো লোকের চেয়ে বেশি জানত। এটা নিয়ে প্রথম থেকে ওর কোনো সমস্যা ছিল না।’ 

ট্রাম্পের সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মাস্ক পাল্টা বলেন, ‘এই বিল আমাকে একবারের জন্যও দেখানো হয়নি। গভীর রাতে লুকিয়ে এই বিল পাশ করানো হয়েছে। কংগ্রেসের কাউকে বিলটা পড়ে দেখারও সুযোগ দেওয়া হয়নি।’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, কাদা ছোড়াছুড়ির মধ্যেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বসেন মাস্ক। তিনি দাবি করেন, যৌন কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এ ছাড়া আমেরিকায় নতুন একটি রাজনৈতিক দল শুরু করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন মাস্ক। ট্রাম্পের অপসারণের দাবি তোলেন তিনি। এর পরিবর্তে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের প্রতি সমর্থন জানান। রাখঢাক না করে মাস্ক এ-ও বলছেন যে, ট্রাম্প যে শুল্কনীতি অনুসরণ করছেন, তা অদূর ভবিষ্যতে গোটা বিশ্বকে অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ঠেলে দেবে। 

অন্যদিকে, ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মাস্কের সংস্থার ভর্তুকি বাতিল করার। তাতে এক দিনের মধ্যে টেসলার শেয়ার পড়ে গিয়েছে ১৪ শতাংশ। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, মাস্কের ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়েছে ৮৭৩ কোটি ডলার! ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, মাস্ক তাঁর বিপক্ষে গিয়েছেন বলে তিনি চিন্তিত নন। তবে এটা আরও আগেই করা উচিত ছিল তাঁর।

ইলন মাস্কেের মুখের আদলে বানানো একটি স্থাপণায় ভাঙচুর হয়। ছবি: রয়টার্সএখন কী হবে?
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, রিপাবলিকানদের মধ্যে মাস্ক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। যদিও তাঁর রাজনৈতিক উত্থান অনেকটাই ট্রাম্পের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত ধরে। কিন্তু এখন তিনি ডেমোক্র্যাট আর ট্রাম্পের অনুগতদের কাছে ঘৃণার পাত্র হয়ে যেতে পারেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ফৌজদারি অভিযোগসহ সাধারণ মানুষের কাছে কেলেঙ্কারি থেকে বেঁচে থাকার রেকর্ড রয়েছে। তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে সরকারি ক্ষমতা ব্যবহারের স্পষ্ট ইচ্ছাও দেখিয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর ডেমোক্রেটিক পূর্বসূরি জো বাইডেনের প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

এরই মধ্যে মহাকাশবিষয়ক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স, যোগাযোগবিষয়ক প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকসহ মাস্কের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘বাজেটে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থ সাশ্রয় করার সবচেয়ে সহজ উপায় ইলনের প্রতিষ্ঠানগুলোর সরকারি ভর্তুকি ও চুক্তি বাতিল করা।’

মাস্কও পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেক ভাষণে ট্রাম্প তাঁর একটি ইচ্ছার কথা জানান। তিনি বলেন, মঙ্গল গ্রহের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা দেখার অভিপ্রায় রয়েছে তাঁর। কিন্তু গতকাল মাস্ক বলেছেন, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছানোর জন্য স্পেসএক্সের রকেট ব্যবহারের যে উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে, তিনি তা বাতিল করার পরিকল্পনা করছেন। তবে সেটি নিশ্চিত নয়। মার্কিন সিনেটে ট্রাম্পের সই করা কর ও ব্যয় বিল আটকে দিতে আর্থিক খাতের রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারেন মাস্ক।

ট্রাম্প-মাস্কের ‘দ্বৈরথ’ কোথায় গিয়ে থামবে, প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারির মুখে পিছিয়ে গিয়ে মাস্ক থামবেন, নাকি শেষমেশ ট্রাম্পকেই ‘নত’ হতে হবে–তা এখনও স্পষ্ট নয়।

কয়েক সপ্তাহের নাটকীয়তার পরেও নিজেদের দূরত্ব দূর করতে পারেনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতার মাঝেও দুই দফা হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে তারা। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকেরা বলছেন,...
তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর শান্তি চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর...
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে প্রাথমিক চুক্তি সই হয়েছে। শুক্রবার থেকেই খুলছে হরমুজ প্রণালি। আর এতেই ওলটপালট হয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি। বড় ধাক্কা...
দীর্ঘ ১০০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট আর টালমাটাল অর্থনীতি। অবশেষে কি থামতে চলেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত? কী আছে এই চুক্তির খসড়ায়? কেন এই চুক্তিকে কেউ বলছেন ঐতিহাসিক বিজয়, আবার...
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই টানটান উত্তেজনা, শেষ মুহূর্তের নাটক, আর কোটি ভক্তের স্বপ্নপূরণ। কিন্তু এর উল্টো পিঠটাও বড্ড নিষ্ঠুর। সেমিফাইনালের মহারণ শেষে আজ রাত ৩টায় আমেরিকার মায়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী...
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ খেলতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে জাতীয় দলের দায়িত্বের...
গত বছরের ২৭ মে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। আরও গ্রেপ্তার হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ, শ্যুটার আরাফাত ও শরীফ। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর একের পর এক হত্যাকাণ্ডে...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর