হলিউডের এক অনন্য মুখ, অস্কারজয়ী অভিনেত্রী ডায়ান কিটন আর নেই। ৭৯ বছর বয়সে জীবনাবসান হয়েছে এই কিংবদন্তির। তাঁর পরিবার সংবাদটি নিশ্চিত করেছে, তবে জানিয়েছে—এই শোকের মুহূর্তে তারা থাকতে চায় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পরিসরে।
নীরবে নিভে যাওয়া এক আলো
গত কয়েক মাস ধরেই কিটনের শরীর ভালো ছিল না। ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, জীবনের শেষ সময়ে তিনি ছিলেন কেবল পরিবারের সঙ্গেই—বন্ধু, সহকর্মী, এমনকি সংবাদমাধ্যম থেকেও নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের খাদ্যসংক্রান্ত অসুস্থতার সঙ্গে লড়ছিলেন তিনি—একটি খাদ্যজনিত ব্যাধি, যেখানে মানুষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে অতিরিক্ত খাওয়া শুরু করে এবং নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
দ্য গডফাদার থেকে অ্যানি হল
সত্তরের দশকে ‘দ্য গডফাদার’-এ মাইকেল করলিওনের স্ত্রী হিসেবে তাঁর অভিনয়ই ছিল মোড় ঘোরানো। এরপর পরিচালক উডি অ্যালেনের সঙ্গে তৈরি হয় এক অনন্য সৃজনশীল সম্পর্ক, যা তাঁকে নিয়ে যায় হলিউডের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়ে।
১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অ্যানি হল’ ছবির সেই স্নিগ্ধ, স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্র তাঁকে এনে দেয় অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটার মতো বিশ্বসেরা সম্মান। সেই এক চরিত্রেই রোমান্টিক কমেডি পেল নতুন সংজ্ঞা।
ছয় দশকের এক জীবন্ত কিংবদন্তি
ষাটেরও বেশি চরিত্র, ছয় দশকের অভিনয়জীবন—ডায়ান কিটন ছিলেন এক সম্পূর্ণ অধ্যায়। উডি অ্যালেনের সঙ্গে একাধিক চলচ্চিত্র, ‘দ্য ফার্স্ট ওয়াইভস ক্লাব’, ‘ম্যানহ্যাটন’, ‘রেডস’, ‘সামথিংস গটা গিভ’—প্রতিটি ছবিতে তিনি ভেঙেছেন প্রচলিত ধারা।
তাঁর অ্যান্ড্রোজিনাস স্টাইল, টার্টলনেক সোয়েটার, আর ফেডোরা টুপি—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন হলিউড ফ্যাশনের এক চিরকালীন প্রতীক।
চরিত্রের ভেতরে মানবিকতা
‘রেডস’-এ সাংবাদিক লুইস ব্রায়ান্ট, ‘মারভিনস রুম’-এ লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর যত্নশীল আন্টি, কিংবা ‘সামথিংস গটা গিভ’-এ জ্যাক নিকলসনের বিপরীতে পরিণত প্রেমিকাকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা শুধু অভিনয় নয়—ছিল জীবন থেকে নেয়া এক মানবিক স্পর্শ।
২০০৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, 'এটা আমার আদর্শায়িত সংস্করণ ছিল, এ ভাবেই বলি।'
খ্যাতির শিখর থেকে অনুপ্রেরণার প্রতীক
‘অ্যানি হল’ ও ‘লুকিং ফর মিস্টার গুডবার’-এর পর তিনি স্থান পান টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে। ‘রোলিং স্টোন’ পত্রিকা তাঁকে বলেছিল ‘পরবর্তী ক্যাথরিন হেপবার্ন’।
আর চার দশক পর আমেরিকান চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউটের আজীবন সম্মাননা গ্রহণের সময় উডি অ্যালেন বলেছিলেন,
‘আমি যখনই ওকে প্রথম দেখি, ও আমার জন্য এক মহান অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। আমার জীবনের অনেক অর্জনের জন্য আমি ওর কাছে ঋণী। ও সত্যিই বিস্ময়কর।’
অভিনয়ের বাইরে এক সৃষ্টিশীল মন
কিটন ছিলেন শুধু অভিনেত্রী নন—পরিচালক, লেখক, প্রযোজক ও আলোকচিত্রীও ছিলেন তিনি। ক্যালিফোর্নিয়ার পুরনো প্রাসাদ পুনরুদ্ধারে ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। লিখেছেন দুটি স্মৃতিকথা— ‘দেন এগেন’ (২০১১), যেখানে বুলিমিয়া নামের ব্যাধির সঙ্গে তাঁর সংগ্রাম উঠে এসেছে, এবং ‘চলো বলি এটা তেমন সুন্দর ছিল না’ (২০১৪), যেখানে সৌন্দর্য, বয়স ও আত্মপরিচয়ের গল্প বলেছেন নিজের ভাষায়।
ভালোবাসার গল্পগুলোও ছিল সিনেমার মতো
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন আলোচনায়। প্রেম করেছিলেন উডি অ্যালেন, ওয়ারেন বিটি, এবং আল পাচিনো’র সঙ্গে—তিনজনই ছিলেন তাঁর জীবনের একেক অধ্যায়, একেক চরিত্রের মতো।
ডায়ান কিটন হয়তো আর নেই, কিন্তু তাঁর সংবেদনশীলতা, হাসি, অভিনয় আর ব্যতিক্রমী পোশাকের স্টাইল—সবকিছুই চিরকাল বেঁচে থাকবে সিনেমার আলোয়। তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন—এক অনন্যা ডায়ান কিটন।


লন্ডনে রোজিনা যেমন দেখলেন ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত ইলিয়াস কাঞ্চনকে
