প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর রাজনৈতিক উত্থান ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। শ্রমিক রাজনীতি থেকে শুরু করে হুগো শাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠা, তারপর দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া– এই দীর্ঘ পথচলা যেমন ছিল নাটকীয়, তেমনি বিতর্কও কম নয়। ক্ষমতায় আসার পর তাঁর শাসনামল ভেনেজুয়েলাকে গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কর্মজীবনের শুরুতে নিকোলাস মাদুরো ছিলেন বাসচালক। সেই সময়েই তিনি শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে শ্রমিকদের নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং দীর্ঘদিন শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
হুগো শাভেজের উত্তরসূরি
ভেনেজুয়েলায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা হুগো শাভেজের সঙ্গে নিকোলাস মাদুরোর সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। নব্বইয়ের দশক থেকেই তাঁদের পরিচয় ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল।
শাভেজ সরকারের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে নিকোলাস মাদুরো পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। শাভেজের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। এরপর ২০১৩ সালের নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে প্রথম মেয়াদে নির্বাচিত হন।
এর আগে ১৯৯৮ সালে নিকোলাস মাদুরো ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার হন। সেখান থেকেই তাঁর জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক উত্থান শুরু। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগেও তিনি শাভেজ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
মাদুরোর এক যুগের শাসনামল
২০১৩ সালের এপ্রিলে অল্প ভোটের ব্যবধানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নিকোলাস মাদুরো। এরপর দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে। ২০১৮ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে তিনি প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন মাদুরো।
২০১৪ সাল থেকে মাদুরোর শাসনামলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি চরম সংকটে পড়ে। মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যসংকটসহ নানা সমস্যায় সাধারণ মানুষ দুর্বিষহ অবস্থার মুখে পড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, হাজার হাজার মানুষ দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের দেশত্যাগের নজির আগে দেখা যায়নি।
২০১৭ সালের আগস্টে নিকোলাস মাদুরো একটি জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ গঠন করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেন। বিষয়টি ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তিনি জাতীয় ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কর্মসূচির কথা বললেও বিরোধীদের অভিযোগ, সেটি ছিল নিজের ক্ষমতা আরও সুসংহত করার কৌশল।
মাদুরোর গত ১২ বছরের শাসনামলে মাঝে মাঝেই মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। কিন্তু মাদুরো তাদের কঠোর হাতে দমন করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন কর্তৃত্ববাদী শাসন। তাঁকে ‘স্বৈরশাসক’ বলতে কুণ্ঠা বোধ করছে না আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। আর আমেরিকার রোষানল তো আছেই। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেলবাণিজ্যে অবরোধ, সমুদ্রপথে নজরদারি ও নৌযানে হামলা এবং রাজনৈতিক চাপ– সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যুদ্ধকালীন উত্তেজনার কাছাকাছি। তবে মার্কিন রক্তচক্ষু বারবারই উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়ে গেছেন মাদুরো।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স


ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের দাবি ট্রাম্পের
