কেমন ছিল সেদিনের সেই সকাল

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৩, ১২:০০ এএম

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য এক শোক বিহ্বল দিন। গোটা জাতির ইতিহাস বদলে দেওয়া, বাঙালির কপালে অকৃতজ্ঞতার তীলক এঁকে দেওয়া সেই দিনের সকালটি আসলে কেমন ছিল?

 ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা। ঢাকা সেনানিবাসে হঠাৎ সচল হয়ে ওঠে টু-ফিল্ড রেজিমেন্টের যানবাহনগুলো। ভারী ট্রাক দিয়ে কামানগুলো টেনে নিয়ে যাওয়া হয় কুর্মিটোলায় নির্মাণাধীন নতুন বিমানবন্দরের দিকে।
 
রাত ১০টা নাগাদ সেনানিবাসের উত্তর প্রান্ত থেকে টি-৫৪ ট্যাংকগুলো নিয়ে বের হয়ে যায় আরেকটি ইউনিট। সবগুলো আবার একত্রিত হয় বিমানবন্দরে। মোট ১৮টি কামান ও ২৮টি ট্যাংক।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ের বিবরণ বলা হয়েছে, রাত প্রায় সাড়ে ১১টা নাগাদ বিমানবন্দর এলাকায় আসেন মেজর শরিফুল হক ডালিম, মেজর এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ বজলুল হুদা, মেজর শাহরিয়ার রশিদ, মেজর আজিজ পাশা, মেজর রাশেদ চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা।

তাদের লক্ষ্য, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি। ওই দিন অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান। তিনিই অন্য কর্মকর্তাদের অপারেশনের পরিকল্পনা জানান।

কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন সরাসরি আক্রমণের। কর্মকর্তাদের দুটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দল সরাসরি যাবে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে। আরেকটি বাইরে থেকে রক্ষীবাহিনী বা সেনাবাহিনী থেকে আসা প্রতি-আক্রমণ ঠেকাবে। আক্রমণ ঠেকানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর নূর ও মেজর হুদাকে।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের পাশাপাশি শেখ ফজলুল হক মণি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসাতেও আক্রমণের সিদ্ধান্ত হয়।

চূড়ান্ত পরিকল্পনার পর মেজর ডালিম এক প্লাটুন সেনাসহ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসার দিকে রওনা দেন। আর শেখ মণির বাসায় আক্রমণের জন্য দুই প্লাটুন সেনা নিয়ে যান রিসালদার মোসলেমউদ্দিন খান।

পিলখানা থেকে বিডিআর আক্রমণ করলে তা প্রতিহতের দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর শাহরিয়ারকে। একই সঙ্গে তিনি রেডিও স্টেশন, বিশ্ববিদ্যালয় ও নিউমার্কেট এলাকা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও নেন। আর রক্ষীবাহিনীকে প্রতিহতের দায়িত্ব নেন মেজর ফারুক নিজেই। ট্যাংক আর মেশিনগান নিয়ে শেরেবাংলা নগরে অবস্থান নেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের জন্য ১২টি ট্যাংক আর ৩০০ সৈনিক নিয়ে রওনা হন মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ। মেজর রশিদের দায়িত্ব ছিল হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। তার নেতৃত্বে ১৮টি কামান গোলাভর্তি করে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল যুদ্ধাবস্থার জন্য। এগুলো তাক করা হয়েছিল রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টার ও বঙ্গবন্ধুর বাসার দিকে।

ঘাতকের দল যাত্রা শুরু করে ১৫ আগস্ট ভোর ৪টা নাগাদ। ভোর সোয়া ৫টার দিকে মেজর ডালিম ও রিসালদার মোসলেমউদ্দিনের প্লাটুন ধানমন্ডিতে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ মণির বাসায় আক্রমণ করে।

এ সময় শেখ মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণিকে হত্যা করা হয়। লুকিয়ে প্রাণে বেঁচে যান শেখ মণির ছেলে ৫ বছরের শেখ ফজলে শামস পরশ ও ৩ বছরের শেখ ফজলে নূর তাপস।

অন্যদিকে, মেজর ডালিমের নেতৃত্বে হত্যা করা হয় আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ১৪ বছর বয়সী মেয়ে বেবী, ১২ বছরের ছেলে আরিফ, চার বছরের নাতি বাবু, ভাতিজা শহীদ সেরনিয়াবাত, ভাগনে আবদুল নইম খান রিন্টু, তিন অতিথি এবং চারজন গৃহকর্মীকে।

৩২ নম্বরে আক্রমণ

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আক্রমণের আগেই বঙ্গবন্ধু আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় আক্রমণের খবর পান এবং নিচে থাকা তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মহিতুল ইসলামকে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে খবর দিতে নির্দেশ দেন।

‘সেই অন্ধকার’ নামের এক প্রামাণ্যচিত্রে সে ঘটনার বিবরণ দিয়ে মুহিতুল ইসলাম বলেন, ‘১৪ আগস্ট রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার ভেতরে বঙ্গবন্ধু গণভবন থেকে চলে এলেন। এসে ওপরে উঠে গেলেন। তারপর তোফায়েল সাহেব এসেছিলেন। তার সঙ্গে কিছু কথা বললেন। ওনারাও চলে গেলেন। উনি প্রতিদিন সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে বিছানায় শুয়ে পড়তেন। সেদিনও তা-ই করেছিলেন। আমি রাত একটা-দেড়টা পর্যন্ত গেটের এক আর্মি সিপাইয়ের সাথে গল্প করে আমাদের নির্ধারিত জায়গায় শুয়ে পড়লাম। কখন যে ঘুমিয়ে গেছি, জানি না। হঠাৎ আমাদের টেলিফোন মিস্ত্রি এসে আমাকে বলছে, স্যার প্রেসিডেন্ট সাহেব আপনাকে ডাকছেন। আমি গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরা অবস্থায় ছিলাম, সে অবস্থাতেই টেলিফোন ধরলাম। আমি টেলিফোন ধরার সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু বললেন, সেরনিয়াবাত সাহেবের বাসায় আক্রমণ করেছে, ইমিডিয়েট পুলিশ কন্ট্রোল রুমকে টেলিফোন করো।’

মুহিতুল ইসলাম বলেন, ‘আমি টেলিফোন ঘোরাচ্ছিলাম, কিন্তু কন্ট্রোল রুম পাচ্ছিলাম না। না পেয়ে আমি গণভবন এক্সচেঞ্জকে টেলিফোন করলাম। ওখানে অপারেটর রিসিভ করল, কিন্তু কোনো কথা বলছিল না। ঠিক সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু লুঙ্গি-গেঞ্জি গায়ে নিচে নেমে এলেন। নেমে এসে আমাকে বললেন, কিরে, তোরে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন লাগাতে বললাম, লাগালি না। আমি বললাম, স্যার আমি চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পাচ্ছি না। আমি গণভবনকে পেয়েছি, কিন্তু কথা বলছে না। তখন উনি রিসিভারটা আমার হাত থেকে নিয়ে নিজেই বললেন, হ্যালো, আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি। সেই মুহূর্তে পেছনের জানালা দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি আসতে লাগল। এরই মধ্যে জানালার একটি গ্লাস ভেঙে আমার হাতে ফুটল। কেটে প্রচুর রক্ত ঝরতে লাগল। এটা দেখে বঙ্গবন্ধু আমার হাত ধরে টেনে বললেন শুয়ে পড়ার জন্য। কিছুক্ষণ পর গুলি বন্ধ হয়ে গেল। সেই সময় কাজের ছেলে আব্দুল ওনার পাঞ্জাবি আর চশমা নিয়ে এলো। উনি আমার সামনেই পাঞ্জাবিটা পরলেন, চশমা হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বললেন, পুলিশ সেন্ট্রি, আর্মি সেন্ট্রি, এত গুলি চলছে, তোমরা কী করছ? এই বলে উনি চলে গেলেন।’

আদালতে মুহিতুল ইসলামসহ কয়েকজনের ভাষ্য থেকে জানা যায়, বাড়ি আক্রমণ হলে বেগম মুজিব আতঙ্কিত অবস্থায় ছোটাছুটি শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর বাসার গৃহকর্মী আব্দুর রহমান রমা তিনতলায় গিয়ে শেখ কামাল ও তাঁর স্ত্রী সুলতানা কামালকে ঘুম থেকে তোলেন। ঘটনা শুনে শার্ট-প্যান্ট পরে নিচতলায় নামেন শেখ কামাল। সুলতানা কামাল আসেন দোতলা পর্যন্ত। রমা দোতলায় শেখ জামাল ও তাঁর স্ত্রীকেও ঘুম থেকে তোলেন। জামা-কাপড় পরে শেখ জামাল তাঁর স্ত্রী রোজীকে নিয়ে দোতলায় বেগম মুজিবের কক্ষে যান।

ঠিক তখনই মেজর নূর, মহিউদ্দিন আহমেদ এবং ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢোকেন। কোনো কথা না বলে শেখ কামালের পায়ে গুলি করেন বজলুল হুদা।

মুহিতুল ইসলাম তাঁর বর্ণনায় বলেন, ‘কামাল ভাই নেমে এসে বললেন, পুলিশ সেন্ট্রি, আর্মি সেন্ট্রি কে কে আছেন, আসেন আমার সাথে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি এবং ডিএসপি সাহেব (নুরুল ইসলাম খান) ওনার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। হঠাৎ দেখি তিন-চারজন কালো পোশাক পরা লোক ওনার সামনে এসে হাজির হলো। এসেই বলল, এই শুয়রের বাচ্চা, সোজা হয়ে দাঁড়া। এই দেখে ডিএসপি সাহেব আমাকে পেছন থেকে টান দিলেন, ঘরে ঢুকতে ইঙ্গিত করলেন। প্রায় জোর করেই তিনি আমাকে নিয়ে এলেন ঘরের ভেতরে। আর সেই মুহূর্তে ওরা কামাল ভাইয়ের পায়ের ওপর গুলি করল। কামাল ভাই ওখান থেকে জান নিয়ে এখানে এসে পড়লেন। এমনভাবে পড়লেন যে ওনার ধাক্কায় আমিও পড়ে গেলাম। সেই মুহূর্তে কালো পোশাকধারীরা কামাল ভাইকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করল। কামাল ভাইয়ের বুক ঝাঁঝরা হয়ে একটা গুলি লাগল ডিএসপি সাহেবের পায়ে, আর একটা লাগল আমাকে। কামাল ভাই ওখানেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন।’

গুলি লাগা অবস্থাতেই মহিতুলকে টেনে ডিএসপি নুরুল ইসলাম তাঁর কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তাঁরা দেখেন, পুলিশের বিশেষ শাখার এক সদস্য দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছেন। অস্ত্র পড়ে আছে পায়ের কাছে। এ সময় ঘরে ঢোকেন বজলুল হুদা। সবাইকে বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে বলেন।

মুহিতুল সে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘গিয়ে দেখলাম সেখানে পুলিশের কিছু লোক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরাও দাঁড়িয়ে রইলাম। তিন-চারজন সেন্ট্রিকে সেখানে পাহারায় রেখে তারা ভেতরে চলে এলো। আমরা যখন লাইনে দাঁড়িয়ে ভেতরে বেশ হই-হল্লার শব্দ শুনলাম। একসময় বঙ্গবন্ধুর একটা কণ্ঠ শুনলাম, আমাকে কোথায় যেতে হবে? এর কিছুক্ষণ পরেই প্রচণ্ড ব্রাশফায়ার শুনলাম। তখন ওপরে বেশ নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কিছু পরে মহিলাদের কান্নার রোল পড়ে গেল। এ সময়ও প্রচণ্ড ফায়ার হচ্ছিল। একসময় কান্নাগুলো থেমে গেল।’

নিচে যখন শেখ কামালকে হত্যা করা হয়েছে, ঠিক সে সময় দোতলায় নিজের ঘরে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন বঙ্গবন্ধু। একপর্যায়ে ফোনে কথা বলেন তাঁর সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দিনের সাথে। তিনি কর্নেল জামিলকে বলেন, ‘তুমি তাড়াতাড়ি আসো। আর্মির লোকরা আমার বাসা অ্যাটাক করেছে। সফিউল্লাহকে ফোর্স পাঠাতে বলো।’

এ সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহকেও ফোন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাঁকে বলেন, ‘তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে, কামালকে (শেখ কামাল) বোধ হয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।’

জবাবে সফিউল্লাহ বলেন, ‘আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং। ক্যান ইউ গেট আউট অফ দ্য হাউস?’

বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়েই কর্নেল জামিল তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসার দিকে রওনা হন। পথে সোবহানবাগ মসজিদের কাছে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এদিকে বঙ্গবন্ধুর বাসায় আক্রমণকারীরা গুলি করতে করতে দোতলায় উঠে যায়। বঙ্গবন্ধুর ঘরে তিনি ছাড়াও ছিলেন স্ত্রী ফজিলাতুন নেছা মুজিব, ছেলে শেখ জামাল ও শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী পারভীন জামাল রোজী।

আক্রমণকারীরা বঙ্গবন্ধুর ঘরের বাইরে অবস্থান নেয়। গোলাগুলি কিছুটা থামলে বঙ্গবন্ধু ঘর থেকে বের হয়ে এলে তাঁকে ঘিরে ধরে তারা। এ সময় মেজর মহিউদ্দিন অন্য সৈন্যদের সাথে বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে যেতে থাকে। বঙ্গবন্ধু তাদের বলেন, ‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?’

তিনি আরও বলেন, ‘তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি, কী করবি-বেয়াদবি করছিস কেন?’

এ সময় দোতলায় সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে দাঁড়ান বজলুল হুদা ও নূর। বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে আসার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করেন বজলুল হুদা ও নূর। সেখানেই স্তব্ধ হয়ে যান বঙ্গবন্ধু। তাঁর বুকে ও পেটে ১৮টি গুলি লাগে। রক্তে ভেসে যায় সিঁড়ি।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর বেগম মুজিবকে জানান আব্দুর রহমান রমা। এ সময় ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেন তিনি, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, শেখ নাসের ও রমা।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেমউদ্দিন তাদের সৈন্যদল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে প্রবেশ করেন। আজিজ পাশা সোজা চলে যান দোতলায়। ধাক্কা দিতে থাকেন বঙ্গবন্ধুর ঘরের দরজায়। একপর্যায়ে গুলি করলে বেগম মুজিব দরজা খুলে দেন এবং ভেতরে থাকাদের হত্যা না করার অনুরোধ জানান।

ঘাতকেরা বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে আসতে থাকেন। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বেগম মুজিব। চিৎকার করে বলেন, ‘আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।’

এ সময় শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিয়ে নিচে নেমে যায় ঘাতকদের একটি দল। আর বেগম মুজিবকে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর ঘরে। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। বেগম মুজিবসহ বাকিদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেন আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেমউদ্দিন।

নিচে নামিয়ে আনার পর প্রথমে শেখ আবু নাসেরকে হত্যা করে ঘাতকেরা। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলাম তাঁর বর্ণনায় এ ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর নাসের কাকাকে ওপর থেকে নামিয়ে নিয়ে এলো। উনি যখন নেমে এলেন, দেখলাম একটা শাড়ির আঁচল দিয়ে ওনার আঙুলগুলো বাঁধা। মনে হচ্ছিল, হয়তো আঙুলগুলো নেই। উনিও আমাদের লাইনে এসে দাঁড়ালেন। কয়েকজন আর্মি তখন বলল, চলেন, আপনি ওই রুমে বসেন। বলে তাঁকে নিয়ে গেলেন আমাদের অফিস রুমের এটাচড বাথরুমে। সেখানে নিয়ে এসে গুলি করল। যে গুলি করল, সে আমাদের লাইনের কাছাকাছি এসে আবার দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পর নাসের কাকা পানি পানি বলে চিৎকার করে উঠলেন। তখন আরেকজন বলল, পানি দিয়ে আয়। তখন যে গুলি করেছিল সে গিয়ে ফায়ার করল, এরপরই নাসের কাকা স্তব্ধ হয়ে গেলেন।’

শেখ রাসেলকে হত্যার বর্ণনা দিয়ে মহিতুল ইসলাম বলেন, ‘এরপর দেখি রাসেলকে নিয়ে নিচে নেমে এসেছে। রাসেল আমাকে দেখে, সে যে গান পয়েন্টে ছিল এটা ভুলে গিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো? আমি বললাম, না, ভাইয়া তোমাকে মারবে না। ও আমাকে জড়িয়ে ধরেছে দেখে একজন আর্মি ওকে ধরে নিয়ে ডান পাশে থাকা পুলিশ বাংকারের কাছে নিয়ে গেল। নিয়ে আটকে রাখল। তখন সে কান্নাকাটি করছিল, আমি মায়ের কাছে যাব। তখন ওকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে ওপরে নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে বেশ কয়েকটি গুলির শব্দ শুনলাম। সব স্তব্ধ হয়ে গেল।’

এই হত্যাযজ্ঞে বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের রক্তে ভেসে যায় ৩২ নম্বরের বাসার মেঝে। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। পৃথিবীর বুকে বাঙালি জাতির জন্য একটি স্বাধীন দেশ এনে দিয়েছেন যে নেতা, তাঁর কণ্ঠ এভাবেই ঘাতকের বুলেটে স্তব্ধ হয়ে যায়।

রোগীদের সাদা কাপড়ের কাফনে বঙ্গবন্ধুকে দাফন

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরদিন সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। বিক্ষোভ এড়াতে আগে থেকেই সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। স্থানীয় থানা-পুলিশের পাশাপাশি গোপালগঞ্জ থেকেও আনা হয় বাড়তি ফোর্স।

হেলিকপ্টার আসার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ আসতে থাকে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে। কিন্তু সেদিন সেনাবাহিনী কাউকেই কাছে আসতে দেয়নি। সেই সময় গোপালগঞ্জ মহকুমার দায়িত্বে ছিলেন মহকুমা পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) মো. নুরুল আলম। তিনি ‘সেই অন্ধকার: ১৫ আগস্টের প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রে দিনটির বর্ণনা দিয়েছেন।

নুরুল আলম তাঁর বর্ণনায় বলেন, ‘১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পরদিন সকালে আমি অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে বলা হলো, আমি ঢাকার এসপি সালাম বলছি। কিছুক্ষণের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর লাশ নিয়ে একটি হেলিকপ্টার টুঙ্গিপাড়া যাবে। আপনি কবর খোঁড়ার ব্যবস্থা করুন এবং সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। হেলিকপ্টার আসার পর সেটি শূন্যের ওপর রেখেই একজন আর্মি অফিসার মুখ বের করে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটু এগিয়ে গিয়ে বললাম, আমি মহকুমা পুলিশ অফিসার। তিনি তখন জানতে চাইলেন, এখানে হেলিকপ্টার নামানোর জন্য নিরাপদ কি না। আমি তাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলে তিনি হেলিকপ্টার নামালেন।’

সেই সেনা কর্মকর্তা হেলিকপ্টার থেকে নেমেই কবর খননের বিষয়ে জানতে চান। নুরুল আলম বলেন, ‘তিনি জানতে চান, এলাকায় লাশ ছিনতাইয়ের কোনো সম্ভাবনা আছে কি না। আমি ওনাকে বললাম, কোনো অসুবিধা নেই। আমরা থানার পুলিশ ও ক্যাম্পের পুলিশ দিয়ে নিরাপদ করেছি। আরও পুলিশ গোপালগঞ্জ থেকে মধুমতী নদী দিয়ে লঞ্চে করে আসছে। মরদেহসহ বরফভর্তি কফিন অত্যন্ত ভারী ছিল। নামাতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমরা কফিন নামাই, আর এটি নামাতে আর্মির হাবিলদারসহ দু-একজন আমাদের সহযোগিতা করে। এটা এত ভারী ছিল যে, চার-পাঁচজনের বহন করাও কষ্ট হচ্ছিল।’

এ সময় কর্তব্যরত সেনা কর্মকর্তার কাছে জানাজার বিষয়ে জানতে চাইলে রোষে পড়ার আশঙ্কার কথা জানান নুরুল। তিনি বলেন, ‘একপর্যায়ে আমি আমাদের সাথে থাকা আর্মি অফিসারকে বললাম, জানাজা পড়তে হবে কি না, নাকি ঢাকা থেকে পড়ানো হয়েছে। অবশ্য তিনি আমাদের নিরাপত্তায় সন্তুষ্ট ছিলেন না বলে কয়েকবারই রাগ করেছেন। আমার প্রশ্ন শুনে তিনি অত্যন্ত রেগে যান এবং আমাকে ধমকে বলেন, জানাজা কি ধর্মীয় রীতিনীতি বিরুদ্ধ? এ সমস্ত প্রশ্ন অবান্তর। তখন আমি কথা না বাড়িয়ে জানাজা পড়াতে একজন মৌলভী সাহেব ডাকতে ওসিকে নির্দেশ দিই।’

বঙ্গবন্ধুর মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ির আঙিনায় আনা হলে স্থানীয় কয়েকজনকে কাছে আসার সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাঁরাই বঙ্গবন্ধুর জানাজা ও দাফনে অংশ নেন।

এসডিপিও নুরুল আলম তাঁর বর্ণনায় বলেন, ‘কফিনের ডালা খুলে পাশে রাখার পর আমরা ধরাধরি করে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ ডালার ওপর রাখি। তারপর কাফনের কাপড় খুলতেই দেখা গেল একটা সাদা কাপড়কে লম্বালম্বি দুই ভাঁজ করে মুড়িয়ে পেঁচানো হয়েছে। সেটি খুলতেই দেখা গেল বঙ্গবন্ধুর পরনে পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি। উনি যেন শুয়ে ঘুমাচ্ছেন। গোসলের জন্য পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি খোলার চেষ্টা করা হলো, কিন্তু খোলা যাচ্ছিল না। তখন আমাদের মধ্য থেকেই কেউ একজন দৌড়ে পাশের দোকানে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে থানার ওসি একজন মৌলভী সাহেবসহ একজনকে নিয়ে আসলেন। সাথে সাথে পাশের দোকান থেকে একজন ব্লেড আর কাপড় কাচার একটি ৫৭০ সাবান নিয়ে আসলেন। মৌলভী সাহেবকে তখন গোসলের ব্যবস্থা করতে বলা হলো।’

বঙ্গবন্ধুকে গোসল করানোর জন্য পানি আনতে কোনো পাত্র পাওয়া না গেলে গোয়ালঘর থেকে সংগ্রহ করা হয় বালতি। নুরুল বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গোয়ালঘরে কিছু গরু ছিল, সেগুলোকে খাওয়ানোর জন্য বালতি ছিল। আমাদের এখান থেকে কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে সে বালতি পরিষ্কার করে পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে আসল। মৌলভী সাহেবকে গোসলের ব্যবস্থা করতে বলাতে তিনি ব্লেড হাতে নিয়ে কাঁপতে থাকলেন। ব্লেড কাগজ থেকে খুলে বঙ্গবন্ধুর শরীর থেকে গেঞ্জি, পাঞ্জাবি খুলতে তিনি পারছিলেন না। আমি হাত থেকে ব্লেড নিলাম। নিজেই বঙ্গবন্ধুর পরনের কাপড় কেটে দুই ফাঁক করে দিই। এ সময় দেখা গেল বঙ্গবন্ধুর সারা বুক ঝাঁঝরা, গুলিতে। ঘাড়ের ওপরে একটা গুলি ছিল, হাতের ওপরে গুলি ছিল, আঙুল একটা অল মোস্ট ছেঁড়া অবস্থায়। আর পাঞ্জাবির পকেটে একটি ভাঙা চশমা ও পাইপের অংশ।’

এসডিপিও নুরুল আলম বলেন, ‘গোয়ালঘর থেকেই একটি চাটাইয়ের মতো এনে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ আড়াল করে গোসলের কাজ চলছিল। রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল থেকে কয়েকটি শাড়ি নিয়ে আসা হয়। আমার মনে হয় চারটি হবে। দুটির পাড় কেটে তখন কাফনের কাপড় তৈরি করা হলো। এরপর আমরা জানাজার অনুমতি নিলাম। জানাজার জন্য যখন আমরা দাঁড়াচ্ছি, তখন নিরাপত্তার জন্য থাকা এক পুলিশ ইনসপেক্টর বললেন, অনেকেই জানাজা পড়ার জন্য অপেক্ষা করছে, অনুমতি থাকলে তারা আসবেন। আমি যখন অনুমতি নিতে গেলাম, মেজর সাহেব রেগে গেলেন। বললেন, কোনো অনুমতি হবে না। বাহির থেকে কারো এসে জানাজা পড়ার দরকার নেই। আমরা আর দেরি না করে জানাজার জন্য দাঁড়িয়ে যাই। প্রায় ২৪-২৫ জন অংশ নেন। সবাই ধরাধরি করে কবরে লাশ নিয়ে যাওয়া হলো।’

 এভাবেই নিতান্ত সাদামাটাভাবে দাফন করা হলো স্বাধীন বাংলার স্থপতিকে।   

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, সাধারণ নাগরিককে শোক প্রকাশ করতে আসার কারণে শারীরিকভাবে আক্রমণ ও পরবর্তীতে কাউকে গ্রেপ্তার দেখানো নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন। একজন নাগরিক কোথায় যাবে, কোথায়...
দেশ জুড়ে বঙ্গবন্ধুর অপ্রয়োজনীয় মুরাল ও ভাস্কর্য তৈরি করে সরকারি টাকা অপচয়ের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। এছাড়া সাবেক সরকারের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা ও অনুসন্ধানের...
রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটসহ ১৪ হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজের নাম পরিবর্তন করেছে সরকার। রোববার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র...
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা মনে করে না অন্তর্বর্তী সরকার। আজ বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে ১৫ আগস্টসহ জাতীয় দিবস বাতিল প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম এ...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজন জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের মূল হোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জে র‍্যাব-৯-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাব কর্মকর্তারা।
বেলুচিস্তানের খোজদার জেলার জিদিতে চালানো এক অভিযানে ১৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। বেলুচিস্তান পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর