গাজা যুদ্ধের সাত মাসে ইসরায়েলি হামলায় ৩৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনের এই অবরুদ্ধ ভূখণ্ডের জনসংখ্যা ২৩ লাখ। যাদের বেশিরভাগই এখন প্রাণ বাঁচাতে বাস্তুহারা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ঢুকে হামলা চালায় ফিলিস্তিনের সশস্ত্রগোষ্ঠী হামাস। ওই হামলায় ১২ শর বেশি ইসরায়েলি নিহত হন। অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ায় ২৫৩ ইসরায়েলিকে। এরপর থেকে গাজায় চলছে ইসরায়েলি তাণ্ডব।
কীভাবে মৃত্যু গণনা হচ্ছে গাজায়
গাজায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করে সেখানকার হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস হাসপাতালে আসা মরদেহ থেকে মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করা হতো। পরে যুদ্ধ তীব্র হতে থাকলে গাজার অনেক হাসপাতালই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নানা পদ্ধতিতে মৃত্যু গণনা শুরু করে।
গত ৭ মে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ইসরায়েলি হামলায় মৃতের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৮৪৪ জন। এদের মধ্যে ২১ হাজার ৫৮ জনের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে পাওয়া গেছে। আর ৩ হাজার ৭১৫ জনের মৃত্যুর খবর তাদের পরিবারের সদস্যরা পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে অনলাইনে ইনপুট দিয়েছে।
গাজায় মৃতের সংখ্যা তাহলে কত
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, যে সংখ্যা বলা হচ্ছে তারচেয়ে মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। গত ৭ মে মন্ত্রণালয়টি জানায়, প্রায় ১০ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এবং যুক্তরাজ্যের ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষকরাও বলছেন, গাজায় মৃতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
বর্তমান মৃতের সংখ্যা কতটা বিশ্বাসযোগ্য
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা রয়টার্সকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশের তুলনায় প্রাক-যুদ্ধকালীন গাজায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি ছিল এবং উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও ছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক মুখপাত্র বলেন, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ভালো ক্ষমতা রয়েছে। তাদের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করা হতো। জাতিসংঘ নিয়মিতভাবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য ব্যবহার করছে।
তবে গাজা শহরের আল-আহলি আল-আরব হাসপাতালে গত ১৭ অক্টোবর বিস্ফোরণে ৪৭১ জন নিহত হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন গোয়েন্দাদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে ১০০ থেকে ৩০০ জনের মতো মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
হামাসের কি এই সংখ্যা প্রকাশে প্রভাব রয়েছে?
২০০৭ সাল থেকে গাজার শাসন হামাসের হাতে। ওই সময় থেকে যারা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পেয়েছে, তাদের বেতন–ভাতা দেয় হামাস। এর আগে নিয়োগপ্রাপ্তরা বেতন পেয়ে থাকে প্যালেস্টাইনিয়ান অথোরিটির কাছ থেকে।
গাজায় হামাসের নিয়ন্ত্রণ কতটা, তা যাচাই করা এখন কঠিন। কারণ, ইসরায়েলি বাহিনীর বেশির ভাগ অংশই দখলে নিয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালেও তাদের দখল রয়েছে।
গাজায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে ইসরায়েল কী বলছে?
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন যে, গাজায় হামাসের নিয়ন্ত্রণের কারণে মৃত্যুর সংখ্যাগুলো সন্দেহজনক। ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন ম্যামরস্টেইন বলছেন, সংখ্যাগুলো হেরফের করা হয়েছে। যার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।
গাজায় কতজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হলো?
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে তথ্য প্রকাশ করে সেখানে হামাস যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিকদের নিয়ে আলাদা তথ্য নেই। তবে ইসরায়েল বলছে, তারা ১৪ হাজারের মতো হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করেছে।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে মৃতদেহ গণনা, হামাসের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আড়িপাতা এবং গোয়েন্দা তথ্য থেকে তারা এই অনুমান করেছে।
হামাস বলছে, ইসরায়েলের প্রকাশিত এ তথ্য অতিরঞ্জিত তবে গোষ্ঠীটি তাদের কতজন সদস্যের মৃত্যু হয়েছে, তা জানায়নি। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, নিহতদের মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি নারী ও শিশু। এর মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি শিশু।
এদিকে যুদ্ধের মধ্যে হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আবার অনেকের মরদেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়ায় তাদেরকেও শনাক্তের তালিকায় আনা যায়নি।
গত বুধবার জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা গাজায় মৃতের সংখ্যা কমিয়ে প্রকাশ করে। জাতিসংঘের সংস্থাটি, শিশু ও মৃতের সংখ্যা অর্ধেক দেখায়। এ নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক।
তবে এ নিয়ে গতকাল সোমবার বিস্তারিত জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি দুটি মৃতের সংখ্যা প্রকাশ করেছে। একটি হলো মৃতের মোট সংখ্যা ও চিহ্নিত মরদেহের সংখ্যা। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে শুধু চিহ্নিত মরদেহের সংখ্যাই রাখা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হেলথ ইমার্জেন্সি প্রোগ্রামের মাইকেল রায়ান বলেন, প্রতিনিয়ত প্রকাশিত সংখ্যাগুলো পুরোপুরি সঠিক নাও হতে পারে। কিন্তু মৃত ও আহতের সংখ্যা কেমন হতে পারে তা এ সংখ্যা বুঝা যায়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএন, এপি
আরও পড়ুন:
- 'পানি নিতে ১২-১৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আসতে হয়'
- গাজার অর্ধেক মানুষ অনাহারে: জাতিসংঘ
- লেবাননের পরিণতি হবে গাজার মতো, হুমকি নেতানিয়াহুর
- গাজায় ১০৪ মসজিদ ধ্বংস করেছে ইসরায়েল
- যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও ফিলিস্তিনিরা ভোলেনি প্রিয় পোষা প্রাণির কথা
- এক দিনে গাজার ৪৫০ জায়গায় হামলা করেছে ইসরায়েল
- আহত ফিলিস্তিনিদের সেবা করছেন ইসরায়েলি এক নারী
- ইসরায়েল-ইউক্রেনের সহায়তা বিল আটকে গেল মার্কিন কংগ্রেসে
- হামাস নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল
- গাজার স্কুলে ইসরায়েলের হামলা, নিহত ২৫
- গাজায় যে শিশুদের পরিবারের কেউ বেঁচে নেই
- ইসরায়েলি কারাগার ফেরত ফিলিস্তিনি তরুণ শোনালেন নির্মম নির্যাতনের কথা
- ‘ভাইয়ের সাথে আমাকেও কবর দিয়ে দাও’