ইসরায়েলে হামাসের হামলার দুদিনে শত শত মানুষ মরেছে। পাল্টা হামলা করছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আক্ষরিক অর্থেই ‘গাজা’–কে ধুলার সাথে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। হামাসও পিছু হটবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আমেরিকান নাগরিকদের বন্দী হওয়ার খবর। বাইডেন পরিস্থিতি দেখছেন। সব মিলিয়ে গোটা বিশ্ব আরেকটি যুদ্ধের মুখোমুখি। কিন্তু এতে কার লাভ?
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরাসরি দায় চাপিয়েছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ঘাড়ে। সংবাদমাধ্যমটিতে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, রাজনীতিক, নিরাপত্তা ইস্যুতে নিজের জ্ঞানগম্যি নিয়ে আত্মগর্বী নেতানিয়াহুই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তিনি ক্ষমতায় আসার পর ইসরায়েল নতুন করে আবার দখলদারি শুরু করে। অধীকৃত অঞ্চলগুলোয় এমনভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ শুরু করে এবং ইসরায়েলের বন্ধু হতে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর ওপর ওয়াশিংটনের মাধ্যমে এমনভাবে চাপ সৃষ্টি করে, যেন ফিলিস্তিনে কেউ থাকেই না, থাকলেও তাদের কোনো অধিকারই নেই।
হারেৎজের এই সম্পাদকীয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা এ কারণে যে, এই মুহূর্তে হামাসই আলোচনার কেন্দ্রে। আর ইসরায়েলের দিক থেকে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে দেখা হচ্ছে প্রত্যাঘাত হিসেবে। হ্যাঁ, এটা প্রত্যাঘাতই। অন্তত ব্যাকরণগত দিক থেকে ঠিক আছে। কিন্তু এই প্রত্যাঘাতের পরিস্থিতিতে যে লাখো মানুষ পড়ল, এবং উলুখাগড়ার মতো প্রাণ দেওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি হলো তাদের, তার জন্য আসলে ইসরায়েলের, আরও ভালো করে বললে তাদের বর্তমান নেতা নেতানিয়াহুর উচ্চাভিলাষই দায়ী।
নেতানিয়াহু সরকার গঠনের পর অনেক উচ্চকিত থাকলেও ক্রমেই নিজ দেশে তাঁর কণ্ঠের জোর কমে আসতে থাকে। দেশটির অভ্যন্তরেও বিস্তর গুজগুজ তৈরি হয় তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে। বিশেষত কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে দেশটির নেমে যাওয়া নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। সবৃশেষ আদালত ব্যবস্থায় আনা পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে এমনকি ইসরায়েলের অভ্যন্তরেই গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টির শঙ্কা তৈরি হয়। যুদ্ধ বোঝা নেতানিয়াহু এর নিদান খুঁজেছেন। আর এ নিদান অতি–অবশ্যই সামরিক পথে, জাতীয়তাবাদী ধ্বজা উড়িয়ে।
জাতীয়তাবাদী নানা স্লোগান তুলে নেতানিয়াহু সব চোখ গাজা ও পশ্চিমতিরের দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। গোটা বিশ্বকেই চালিত করেছেন সেদিকেই নজর দিতে। আমেরিকাও হেঁটেছে তাঁর দেখানো পথেই। তারা ইসরায়েলের স্বীকৃতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মোড়ল দেশগুলোর দ্বারস্থ হয়েছে। সফলও হয়েছে। আর এদিকে গাজাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিরা দেখেছে, নিজের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।
নেতানিয়াহুর গৃহীত অতি–জাতীয়তাবাদী নীতি শুধু তাঁর দেশেই কাজে লাগেনি, জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়েছে অন্যত্রও। সেটা ফিলিস্তিনে। ফিলিস্তিনের নির্বাচিত সরকারকে নখদন্তহীন বলে আরও জোর গালাগাল দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে হামাসের মতো সংগঠনগুলো। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রতিদিনই একটু একটু করে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা, যা সময়ের সঙ্গে শুধু বড় হয়েছে, যা হামাসকে শক্ত ভিত দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত হামাস ঠিকই হামলা করে বসল। প্রাণ গেল শত শত মানুষের। এখন পাল্টা আঘাতের কথা বলা হচ্ছে। ইসরায়েল যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বসে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কষছেন। খবর এসেছে মার্কিন নাগরিক হামাসের হাতে বন্দী হওয়ার। হোয়াইট হাউস ইসরায়েলকে নানা সহযোগিতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, এই পরিস্থিতিকে আর সংঘাত শব্দ দিয়ে বর্ণনা করার সুযোগ থাকবে না হয়তো। একে যুদ্ধই বলতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে লাভ কার? অবশ্যই নেতানিয়াহুর। ইসরায়েলের অনেকেই এখন বলতে শুরু করেছেন, ফিলিস্তিনকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নে নেতানিয়াহুর যে বিরোধিতা, তা ছিল যৌক্তিক। নেতানিয়াহুর বিরোধী অংশগুলো এখনো তাঁর সমালোচনামুখর থাকলেও তাঁকে সমর্থন করা লোকের সংখ্যা বাড়ছে ক্রমেই। সময়ের সাথে এ পাল্লা ভারী হওয়াই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে লাভবানের তালিকায় যে নেতানিয়াহু একজন, তাতে কোনো সন্দেহ আর থাকে না।
আরেক লাভবান নিঃসন্দেহে হামাস। তারাও ফিলিস্তিন প্রশ্নে নিজেদের আক্রমণাত্মক ভাবমূর্তিকেই যৌক্তিক বলে সবার কাছে সাব্যস্ত করতে পারবে অচিরেই। ইসরায়েলের পাল্টা হামলা ও এতে ফিলিস্তিনিদের হওয়া ক্ষয়ক্ষতিই তাদের এই সুবিধা দেবে।
তৃতীয় আরেকটি পক্ষ কিন্তু আছে। আর তা হলো আমেরিকাসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ, যাদের অস্ত্রের চালানগুলো এখন দারুণভাবে গন্তব্য খুঁজে পাবে। এই যুদ্ধ যে অস্ত্র বিক্রির রাস্তাটিও খুলে দিল। আর রয়েছে মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কট্টর ইসলামপন্থী দল বা গোষ্ঠীগুলো। এই হামলা বা সংঘাত তাদেরও শক্তি জোগাবে। মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে তারাও স্ব–স্ব অঞ্চলে নিজেদের ভিত শক্ত করবে।
আর লোকসান? এ প্রশ্নের উত্তর সবারই জানা। লোকসান হলো শুধু সাধারণ মানুষের। ইসরায়েল বা ফিলিস্তিন বা বিশ্বের আর যে অঞ্চলেই তার বাস হোক না কেন, তার সামনে থাকছে শুধু যুদ্ধে মরার, বা মৃতদের দেখার এবং অতি অবশ্যই যুদ্ধের কারণে নানা অঞ্চলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অভিঘাতের বলি হওয়ার। যুদ্ধের একটা ব্যয় থাকে। আর সে ব্যয় মেটায় কিন্তু সাধারণ জনতাই। তার পকেটে হাত না ঢোকালে কোনো যুদ্ধই আর এগোয় না। ফলে নিত্যদিনের ব্যয়ের বহর বাড়তে থাকলে, দেশে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার এই সময়ে তার পক্ষেও আর সুস্থ জীবন যাপন করা সম্ভব হবে না। এটাই বাস্তবতা।
হামাসের গোলা বা ইসরায়েলের হামলা, কিংবা ইউক্রেন বা রাশিয়ার দিক থেকে ছোড়া যেকোনো বোমার আঘাতে তাই একমাত্র সাধারণ মানুষই থাকছে ভুক্তভোগীর তালিকায়। লাভের গুড় কোথায় যাবে বা যায়, তা বরাবরের মতোই এই সাধারণ পরিসরের যুদ্ধকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী আলোচনা ও বিতর্কের মঞ্চের আড়ালেই থেকে যাবে।


ইসরায়েলের কারাগারে এত ফিলিস্তিনি কেন?
