২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২। পৃথিবীর ইতিহাসে যোগ হয়েছিল আরও একটি নাটকীয় অধ্যায়। ইউক্রেনের সামাজিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক, এই তিনটি মূল স্তম্ভে সরাসরি আঘাত হেনেছিল রাশিয়া। পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞাসহ সবকিছুকে উপেক্ষা করে রাশিয়া আজও এ যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যেতে অনড়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সমর্থন নিয়ে পুতিনের চোখে চোখ রেখে লড়াই চালিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও।
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার এক বছর পরই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যা এখনও চলমান। জো বাইডেনের প্রশাসনের যাত্রা শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে এ পর্যন্ত ১৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে সমীকরণ পাল্টে গেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর। নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, তিনি কীভাবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থামাবেন। জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘এই দুই দেশের নেতারই ভুল রয়েছে এবং তাদের উভয়েরই শক্তি রয়েছে। তবে আমি এলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ যুদ্ধের নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।’
অতিরিক্ত মার্কিন সহায়তার জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অনুরোধের সমালোচনাও করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত জুনে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে আমি বিষয়টি নিষ্পত্তি করে ফেলব।’
ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, তিনি নিশ্চিত যে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাশিয়ার সাথে তাঁর দেশের যুদ্ধ ‘দ্রুত শেষ’ হবে। সবশেষ তিনি বলেছেন, দখলমুক্ত ইউক্রেন ন্যাটোর অধীনে এলেই যুদ্ধ শেষ হতে পারে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, যেসব অঞ্চল রাশিয়া দখল করে নিয়েছে, তার দাবি এখন ছাড়তেও রাজি জেলেনস্কি। তবে ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জেলেনস্কির সুর এমন ছিল না।
সবশেষ গত ১৯ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি সত্যিকার অর্থেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চান, তাহলে তাঁর সঙ্গে সমঝোতায় যেতে রাজি আছেন তিনি। এসব কিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ আগামী বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়ছে।
কর্মী ও গোলাবারুদের ঘাটতির মধ্যে এবং গ্রীষ্মকালীন পাল্টা আক্রমণের পরও অগ্রগতি না হওয়ায় জেলেনস্কি গত ৮ ফেব্রুয়ারি জেনারেল ভ্যালেরি জালুঝনিকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেন জেলেনস্কি। এর পরিবর্তে জেনারেল ওলেক্সান্ডার সিরস্কিকে সেনাপ্রধানের পদে বসান। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সহায়তা পেতে থাকে ইউক্রেন। গত আগস্টে রাশিয়ায় বড় আক্রমণ শুরু করে ইউক্রেন। ওই সময় ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে একটি বিস্ময়করভাবে অনুপ্রবেশ শুরু করে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর সবচেয়ে বড় বিদেশি হামলা বলে জানা গেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ইউক্রেন আক্রমণের মধ্য দিয়ে কিছু রুশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত সেপ্টেম্বরে, রাশিয়া সেসব অঞ্চলে পাল্টা অভিযান শুরু করে।
গত অক্টোবরের শেষে ইউক্রেনে সেনা পাঠায় উত্তর কোরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, প্রায় ১০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করছে। এ নিয়ে পিয়ংইংয়ের সেনাদের হুমকিও দেয় মার্কিন কর্মকর্তারা। এর মধ্যেই আসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এতে পরাজয় হয় বাইডেনের। মার্কিন নির্বাচনে পরাজয়ের পরই রাশিয়ায় আমেরিকার দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে বসে জেলেনস্কি। পরে রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়াবে।
নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিতের পর অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির জন্য সম্মতিতে পৌঁছাতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে এই যুদ্ধের ইতি টানা তাঁর সক্রিয় প্রচেষ্টার অংশ। যদিও ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে বসতে এখনো কয়েক সপ্তাহ বাকি রয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে বের করে আনার বিষয়টি তিনি বিবেচনা করবেন। এ দুই হুমকি নিয়ে ইউক্রেন, ন্যাটো জোটের মিত্ররা ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা মহলের অনেককে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
লন্ডনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের মার্কিন কর্মসূচির পরিচালক লেসলি ভিনজামুরি বলেন, ‘আমাদের ট্রাম্পের ফেস ভ্যালুকে মূল্যায়ন করতে হবে। ট্রাম্প ধরে নিয়েছেন যে, তিনি খুব দ্রুত একটি চুক্তি করতে পারেন। তিনি সম্ভবত ইউক্রেনকে সহায়তা বন্ধ করে দেবেন। ট্রাম্প পুতিনের সঙ্গে এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেন, যা জেলেনস্কিকে অনেক কিছু স্বীকার করে নিতে বাধ্য করতে পারে।’
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, সিএনএন, বিবিসি, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট


ইউক্রেনে হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে রাশিয়া
বড়দিনে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলাকে ‘অমানবিক’ বললেন জেলেনস্কি
