তুলে আনার পর ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে রাখা হয়েছে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার বা এমডিসিতে। অনেকেই এটিকে ‘নরকের’ সঙ্গে তুলনা করেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কুখ্যাত এই কারাগারের পরিবেশের কারণে কিছু বিচারকও সেখানে দণ্ডপ্রাপ্তদের পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি মার্কিন সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে আনে। দক্ষিণ আমেরিকায় সাম্প্রতিক সময়ে এটি অন্যতম নজিরবিহীন এক অভিযান।
মাদুরোকে আটকের পর প্রথমে আকাশপথে ইউএসএস ইয়ু জিমা যুদ্ধজাহাজে, এরপর কিউবার গুয়ান্তানামো নৌঘাঁটিতে এবং সবশেষে নিউইয়র্কে আনা হয়। সোমবার তাকে নিউইয়র্কের একটি আদালতে তোলা হয়। এ সময় তার হাতে ছিল হাতকড়া, পরনে স্পোর্টস জ্যাকেট, মাথায় কালো টুপি এবং পায়ে মোজা পরা স্যান্ডেল। এরপর তাকে নেওয়া হয় এমডিসিতে। ধারণা করা হচ্ছে, এই কারাগারেই রাখা হবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে। তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও একই কারাগারে বন্দি করা হয়েছে।
এমডিসি সম্পর্কে যা জানা যায়
মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার বা এমডিসি কনক্রিট ও স্টিলের তৈরি একটি বিশাল বহুতল ভবন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাগারটি নিউইয়র্কের সমুদ্রবন্দর থেকে কয়েক মিটার দূরে এবং ফিফথ অ্যাভিনিউ ও সেন্ট্রাল পার্কসহ শহরের অন্যান্য পরিচিত স্থাপনা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
১৯৯০ সালের দিকে এই কারাগারটি চালু করা হয়েছিল। এটি পরিচালনা করছে ফেডারেল ব্যুরো অব প্রিজনস (বিওপি)। বিওপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ম্যানহাটন ও ব্রুকলিনের আদালতে বিচারাধীন নারী ও পুরুষ আসামিদের রাখাই ছিল এই কারাগারের মূল উদ্দেশ্য। অবশ্য স্বল্পমেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদেরও এখানে রাখা হয়।
২০২১ সালে ম্যানহাটনে সংস্থাটির পরিচালিত একই ধরনের একটি কারাগার বন্ধ করে দেওয়া হয় ২০১৯ সালের একটি আত্মহত্যার ঘটনার জেরে। বিবিসি বলছে, ওই কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় আত্মহত্যা করেন মার্কিন ব্যবসায়ী জেফ্রি এপস্টেইন।
এমডিসি দুটি ফেডারেল আদালতের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত। এর ভেতরে থাকা সংযুক্ত করিডোরের মাধ্যমে আসামিদের জনসম্মুখে আনা ছাড়াই আদালতে আনা-নেওয়া করা যায়। কারাগারের পুরো কমপ্লেক্সটি ইস্পাতের ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা। এর চতুর্দিকে রয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা। সম্প্রতি এই কারাগারের বাইরের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।
মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পিবিএস জানিয়েছে, কারাগারটির খোলা জায়গায় খেলাধুলার ব্যবস্থা, চিকিৎসা ইউনিট ও একটি লাইব্রেরি আছে। তবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দাবি, কারাগারের সেলগুলো মাত্র কয়েক মিটার লম্বা এবং বন্দিরা বেশির ভাগ সময় এসব সেলের ভেতরেই কাটান।
কেন নরক বলা হয়?
ধারণক্ষমতার বেশি বন্দি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সহিংসতা ব্রুকলিনের এমডিসিতে খুবই সাধারণ ব্যাপার। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কারাগারটির ধারণক্ষমতা ১ হাজার বন্দির হলেও ২০১৯ সালে এতে প্রায় ১ হাজার ৬০০ জনকে রাখা হয়েছিল। বিওপি বলছে, বর্তমানে এতে ১ হাজার ৩৩৬ জন বন্দি আছেন।
বিবিসি বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের আদালতের এক নথিতে জানানো হয়েছে, কয়েক বছর ধরেই কারাগারটি মাত্র ৫৫ শতাংশ জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ভবনটির ভৌত অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ২০১৯ সালে শীতের সময় বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে সেলগুলো উষ্ণ রাখার ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যায়। এতে কয়েক দিন বন্দিরা তীব্র ঠান্ডার মধ্যে থাকতে বাধ্য হন।
নিউইয়র্কের তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস সে সময় মন্তব্য করেন, ‘এমডিসির পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য ও অমানবিক। কারাবন্দি হওয়ার অর্থ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া নয়।’ কারাগারটির জরাজীর্ণ অবস্থার জন্য তিনি ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে মামলাও করেন।
আইনজীবী এডউইন করদেরোর মতো অনেকে এই কারাগারকে ‘পৃথিবীতে নরকের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০২৪ সালের জুনে করদেরোর এক মক্কেল ইউরিয়েল হোয়াইট অন্য বন্দিদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন। নিউইয়র্ক ফেডারেল ডিফেন্ডার্সের সাবেক পরিচালক ডেভিড প্যাটন বলেন, ‘কারাগারটি চিকিৎসা সেবার অভাব থেকে শুরু করে খাবারে কৃমির উপস্থিতি এবং কয়েদিদের মধ্যে সহিংসতাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত।’
এই কারাগারে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত চারজন বন্দি আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, বিচারক গ্যারি ব্রাউন ২০২৪ সালের আগস্টে জানান, কর ফাঁকির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ৭৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে তিনি এমডিসিতে পাঠাতে চান না, কারণ সেখানে অরাজকতার পরিবেশ অগ্রহণযোগ্য ও প্রাণঘাতী।
আলোচিত বন্দি
নিকোলাস মাদুরোই প্রথম কোনো লাতিন আমেরিকান রাজনীতিক নন যিনি এই কারাগারে বন্দি হলেন। হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ তিন বছরেরও বেশি সময় এখানে বন্দি ছিলেন। মেক্সিকোর সাবেক জননিরাপত্তা সচিব জেনারো গার্সিয়া লুনা, মাদক সম্রাট ‘এল চাপো’ গুজমান এবং সিনালোয়া কার্টেলের নেতা ইসমাইল ‘এল মায়ো’ জামবাডাও এখানে থেকেছেন।
এ ছাড়া অপরাধ জগতের জন গট্টি, র্যাপার শন ‘ডিডি’ কম্বস, জেফ্রি এপস্টেইনের সহযোগী ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল এবং এফটিএক্স-এর প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ব্যাংকম্যান-ফ্রাইডও এমডিসির আলোচিত বন্দিদের তালিকায় রয়েছেন।



