ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে রাখার চেষ্টা করে আসছিলেন ইউরোপীয় নেতারা, এর মধ্যে গ্রিনল্যান্ডের দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের লোভাতুর চোখ ইউরোপের নেতাদের দ্বিমুখী ঝামেলা আর গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, ট্রাম্প যদি সত্যিই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নেওয়ার একতরফা পথে হাঁটেন – তা সেটা অস্ত্রের প্রয়োগে হোক বা কিনে নিয়ে, তাহলে ইউরোপের কি প্রতিরোধের ক্ষমতা আছে? থাকলে কতটা? বিবিসি এ নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথে অগ্রগতি আনতে মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্যারিসে বৈঠকে বসেন ইউরোপীয় দেশগুলোর নেতৃত্বে গঠিত তথাকথিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’। সেখানে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধিরাও। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের পরিকল্পনা প্রায় ৯০ শতাংশ এগিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় নেতারা কেউই যুক্তরাষ্ট্রকে নাখোশ করার ঝুঁকি নিতে চাননি।
কিন্তু প্যারিসের ওই বৈঠকের আড়ালে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা হয়ে থেকে যাচ্ছে — গ্রিনল্যান্ড। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড আয়তনে জার্মানির প্রায় ছয় গুণ। এটি আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত হলেও ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড। ট্রাম্প বহুবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন এবং তিনি দ্বীপটি চান।
বৈঠকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন উপস্থিত ছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো — দুই ক্ষেত্রেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলো ডেনমার্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও তারা ট্রাম্পকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে অনিচ্ছুক। তবু ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেনের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে থাকায় ইউক্রেন আলোচনা চলাকালেই ছয়টি ইউরোপীয় দেশ একটি যৌথ বিবৃতি দেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রিনল্যান্ড–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের। তবে এই অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য ‘বিভিন্ন বিকল্প’ বিবেচনায় আছে — এর মধ্যে দ্বীপটি কেনার বিষয়টিও রয়েছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটের উপস্থাপিত ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। এই বক্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের জন্য স্পষ্টতই হুমকি।
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ নতুন নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদে ইউরোপে অনেকেই এটিকে গুরুত্ব না দিয়ে ঠাট্টা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু কদিন আগে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত সামরিক অভিযান এবং সেখানকার প্রেসিডেন্টকে আটক করার ঘটনার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, ট্রাম্পের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এখানেই ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি সামনে আসে। একদিকে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত রাখতে মরিয়া। অন্যদিকে সেই যুক্তরাষ্ট্রই একটি সার্বভৌম ইউরোপীয় দেশের ভূখণ্ড — গ্রিনল্যান্ড — নিয়ে প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে। বিষয়টি আরও জটিল কারণ ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ন্যাটোর সদস্য।
ডেনমার্কের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি একতরফাভাবে গ্রিনল্যান্ড দখলের পথে এগোয়, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ যে ট্রান্সআটলান্টিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এসেছে, তার ভিত্তিই নড়ে যাবে। ট্রাম্প ন্যাটোর খুব বড় একটা সমর্থনকারী নন — এ কথা ইউরোপীয় নেতারা আগেই জানেন।
গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ইতোমধ্যে একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যা স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে স্থাপিত হয়েছিল। একসময় সেখানে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা থাকলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে কয়েক শ-তে। ডেনমার্ক সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষায় নৌযান, ড্রোন ও বিমানসহ প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। তবু ট্রাম্প প্রশাসন ডেনমার্কের এই উদ্যোগকে যথেষ্ট বলে মানছে না।
রোববার ট্রাম্প আবারও বলেন, গ্রিনল্যান্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে রুশ ও চীনা উপস্থিতি বাড়ছে। ডেনমার্ক এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, দ্বীপটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সক্ষম।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর নর্ডিক দেশগুলো দ্রুত ডেনমার্কের পাশে দাঁড়ালেও শুরুতে নীরব ছিল ইউরোপের তিন মোড়ল - লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিন। পরে যুক্তরাজ্য ও জার্মানি স্পষ্ট করে জানায়, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের। কিন্তু মজার ব্যাপারটা হলো, যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমালোচনা নেই! এতে ইউরোপের ভেতরের দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট ইউরোপের মৌলিক দুর্বলতাই সামনে আনছে। নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ সক্ষমতা — সব ক্ষেত্রেই ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ন্যাটো সূত্রগুলো বলছে, ওয়াশিংটন যদি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইউরোপীয় দেশগুলো বাস্তবে কী করবে — সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ইউরোপকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, বড় শক্তির রাজনীতিতে একক কণ্ঠে কথা বলতে না পারলে তাদের প্রভাব ক্রমেই কমে যাবে। ট্রাম্পের হুমকি আপাতত কথার মধ্যেই থাকুক বা বাস্তবে রূপ নিক — এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া থেকে ইউরোপ আর পালাতে পারবে না।



