প্রায় ছয় দশক পর তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। আগামী ১ মে থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্তকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ওপেকের জন্য এটি বড় কৌশলগত ধাক্কা।
কেন এই সিদ্ধান্ত
আমিরাত বলছে, এটি কোনো রাজনৈতিক নয়, বরং সম্পূর্ণ নীতিগত ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রী সুহাইল মোহাম্মদ আল-মাজরুই বলেন, ‘এটি বাজারের বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ কৌশল বিবেচনা করে নেওয়া সিদ্ধান্ত। আমরা উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও নমনীয় থাকতে চাই।’
সৌদি আরবের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না – এ নিয়ে প্রশ্নে তিনি আরও জানান, সিদ্ধান্তটি কোনো দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া হয়নি।
আমিরাত: তেল উৎপাদন সক্ষমতা কত, করে কত
বিশ্লেষকদের মতে, ইউএই দীর্ঘদিন ধরেই ওপেকের উৎপাদন কোটার সীমাবদ্ধতায় অসন্তুষ্ট ছিল এবং নিজের সক্ষমতার পুরো ব্যবহার করতে পারছিল না। এনার্জি প্রাইসেস-এর তথ্য অনুযায়ী, তেলের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পেছনে আমিরাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৩০০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে।
এতে আমিরাতের ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি-র (এডিএনওসি) তেল উৎপাদন সক্ষমতা দিনপ্রতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে এটিকে দিনপ্রতি ৫০ লাখ ব্যারেলে নিয়ে যেতে চায় আমিরাত।
কিন্তু ওপেক ও ওপেক প্লাসের সদস্য দেশগুলো দিনপ্রতি কত ব্যারেল তেল উৎপাদন করবে, সেটির নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেয় সংগঠনগুলো। আরব আমিরাত এখন দিনপ্রতি গড়ে ৩১-৩২ লাখ ব্যারেল উৎপাদন করে, ইরান যুদ্ধের সময়ে যা আরও কমেছে।
ওপেক ও ওপেক প্লাস কী
ওপেক হলো ১৯৬০ সালে গঠিত তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট। এর লক্ষ্য বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে দাম স্থিতিশীল রাখা। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩৬ শতাংশ তেল উৎপাদন এই জোটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং বৈশ্বিক মজুতের প্রায় ৮০ শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে।
ওপেক প্লাস হলো এর সম্প্রসারিত সংস্করণ, যেখানে রাশিয়াসহ অন্যান্য বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্ত।
আগে কোনো দেশ ওপেক ছেড়েছে
মধ্যপ্রাচ্যেরই দেশ কাতার ২০১৯ সালে ওপেক ছেড়েছে। কারণ হিসেবে দেখিয়েছিল – তারা গ্যাস উৎপাদনে মনোযোগ দিতে চায়। এর বাইরে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডর ২০২০ সালে আর্থিক জটিলতাকে কারণ দেখিয়ে ওপেক ছেড়ে যায়। আফ্রিকার দেশ গ্যাবন মেম্বারশিপ ফি নিয়ে ঝামেলায় ১৯৯৫ সালে ওপেক থেকে বেরিয়ে গেলেও ২০১৬ সালে আবার যোগ দেয়।
এর বাইরে ২০১৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করা হয়, কারণ তারা তেল রপ্তানিকারক দেশের বদলে নিট আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছিল। এর আগে ২০০৯ সালেও ইন্দোনেশিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছিল।
সৌদি আরবের জন্য বড় চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, ইউএই ছিল ওপেকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘স্পেয়ার ক্যাপাসিটি’ সম্পন্ন দেশ। অর্থাৎ বাজারে সরবরাহ বাড়ানো বা কমানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক জর্জ লিওন বলেন, ‘ইউএইয়ের বেরিয়ে যাওয়া ওপেকের জন্য বড় পরিবর্তন। এটি সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়াবে, কারণ এখন বাজার স্থিতিশীল রাখতে তাদের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ওপেক কাঠামোগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং বাজার আরও অস্থির হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের লাভ?
এই সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত লাভ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ওপেক কৃত্রিমভাবে তেলের দাম বাড়ায়। মার্কেটওয়াচ-এ জ্বালানি বিশ্লেষক বিশ্লেষক অ্যাশলি কেলটি বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলা যেহেতু এখন কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের পুতুলে পরিণত হয়েছে, এর মধ্যে এটা (আমিরাতের সিদ্ধান্ত) বোঝাচ্ছে যে - এই জোটের (ওপেক) আর আগের মতো প্রভাব নেই এবং যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই এখন বিশ্বের তেলের বাজারের উত্থান-পতন নির্ভর করবে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবিধাও এখন হাতেনাতে পাবে আমিরাত।’
তেলের বাজারে প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব দুই ধাপে দেখা যাবে।
স্বল্পমেয়াদে: ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল। ফলে ইতিমধ্যেই বাজারে সরবরাহ সংকট চলছে। তাই এখনই বড় পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম। আমিরাত নিজেরাই বলছে, তারা এই মুহূর্তে ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তেলের বাজারে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। কারণ হরমুজ বন্ধ থাকায় তেলের বাজার এমনিতেই অস্থির, তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো ভয়াবহ পরিস্থিতি পার করছে।
দীর্ঘমেয়াদে: আমিরাত নিজের মতো উৎপাদন বাড়ালে বৈশ্বিক সরবরাহ বাড়তে পারে, যা তেলের দাম কমাতে চাপ তৈরি করবে। তবে একই সঙ্গে বাজারে অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিশ্লেষক মাইকেল ব্রাউন বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে উৎপাদন বাড়ানো বাস্তবে কঠিন। তবে ভবিষ্যতে এটি বাজারে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।’
ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির প্রভাব
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ইরান যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের মধ্যেই ইউএইয়ের সিদ্ধান্ত এসেছে, ফলে স্বল্পমেয়াদে বড় প্রভাব না পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ কাঠামো বদলে যেতে পারে।
ওপেক কি দুর্বল হয়ে পড়ছে?
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছে, এটি ওপেকের জন্য বড় সতর্ক সংকেত। ডেভিড অক্সলে বলেন, ‘ওপেক দুর্বল হলে তেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে কমতে পারে, কিন্তু বাজারে অস্থিরতা বাড়বে।’
আর এনার্জি বিশ্লেষক সৌল কাভনিক বলেন, ‘এটি ওপেকের ভবিষ্যতের জন্য টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। সৌদি আরবকে এখন জোট ধরে রাখতে অনেক বেশি ভূমিকা নিতে হবে।’
আমিরাতকে দেখে আরও কিছু দেশ ওপেক ছাড়তে উৎসাহী হতে পারে বলেও অনুমান অনেক বিশ্লেষকের।
আমিরাতের লক্ষ্য কী
বিশ্লেষকদের মতে, ইউএই এখন তিনটি বড় লক্ষ্য সামনে রেখে এগোচ্ছে— উৎপাদন বাড়ানোর পূর্ণ স্বাধীনতা, বৈশ্বিক তেল বাজারে সরাসরি প্রভাব বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক।



