একসময় যে দেশটিকে বলা হতো অকেজো অস্ত্রের গুদাম, চার দশকের নিষেধাজ্ঞার পর তারা কীভাবে আজ বিশ্বের সামরিক ভারসাম্যই বদলে দিচ্ছে? ২০ হাজার ডলারের একটি ছোট যন্ত্র কীভাবে ২০ লাখ ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরাজিত করছে? চলুন জেনে নেওয়া যাক, ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির উত্থান এবং কীভাবে এটি বদলে দিয়েছে বিশ্বের ক্ষমতার ধারণা সম্পর্কে।
প্রয়োজন থেকে উদ্ভাবন
১৯৭৯ সালের আগে ইরান ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি। তাদের ছিল মার্কিন এফ-১৪ টমক্যাটের মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর পাল্টে যায় সব। আমেরিকান প্রকৌশলীরা দেশ ছাড়েন, বন্ধ হয়ে যায় খুচরা যন্ত্রাংশের সরবরাহ। শত শত কোটি ডলারের যুদ্ধবিমানগুলো পরিণত হয় অকেজো ধাতুতে।
ঠিক এই সময়ে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ। ইরাকের কাছে ছিল সোভিয়েত স্যাটেলাইট ডেটা এবং উন্নত যুদ্ধবিমান। অন্যদিকে ইরানের হাতে বলতে গেলে কিছুই ছিল না। এই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নিল এক অভাবনীয় উদ্ভাবন।
খেলনা থেকে মারণাস্ত্র
১৯৮১ সাল। ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছোট ওয়ার্কশপে একদল তরুণ প্রকৌশলী—বেসামরিক পাইলট ফারশিদ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র সাঈদ এবং স্বর্ণকার মাসুদ জাহিদী মিলে একটি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তাঁরা তৈরি করেন রিমোট কন্ট্রোলড ছোট বিমান। প্রথম যখন তাঁরা এটি সামরিক কর্মকর্তাদের দেখান, অনেকেই উপহাস করে বলেছিলেন— ‘এগুলো তো বাচ্চাদের খেলনা!’
কিন্তু ১৯৮৩ সালে সেই খেলনাই যখন ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে ইরাকি বাহিনীর পরিষ্কার ছবি তুলে নিয়ে এল, তখন সবার চোখ কপালে। জন্ম হলো ইরানের প্রথম ড্রোন ইউনিট— 'থান্ডার ব্যাটালিয়ন'।
গেম চেঞ্জার কৌশল
পশ্চিমাদের ধারণা ছিল, যুদ্ধ মানেই দামি এবং নিখুঁত অস্ত্র। কিন্তু ইরান এই সমীকরণই বদলে দিল। তাদের নীতি হলো— কোয়ান্টিটি ওভার কোয়ালিটি।
একটি ক্রুজ মিসাইলের দাম ২০ লাখ ডলার। কিন্তু একটি ইরানি ড্রোনের দাম মাত্র ২০ হাজার ডলার। এখন আপনি যদি একসাথে ১০০টি ড্রোন পাঠান, তবে আপনার খরচ মাত্র ২০ লাখ ডলার। কিন্তু শত্রুপক্ষকে সেই ১০০টি ড্রোন ধ্বংস করতে খরচ করতে হবে প্রায় ২০ কোটি ডলারের দামি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল! এই যে বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবধান, এটাই হলো ইরানি ড্রোনের আসল শক্তি। এটি কেবল ধ্বংস করে না, বরং শত্রুকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।
আরামকো থেকে ইউক্রেন
২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় হামলা বিশ্বকে বুঝিয়ে দেয়— দামি মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এই সস্তা ড্রোনের কাছে কত অসহায়! আর ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যখন কিয়েভের আকাশে ‘জেরেনিয়াম-২’ বা শাহেদ-১৩৬ দেখা গেল, তখন স্পষ্ট হলো যে ইরান এখন ড্রোন প্রযুক্তির অন্যতম বড় সরবরাহকারী। এমনকি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা দুবাই বা সিঙ্গাপুরের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে বেসামরিক চিপ সংগ্রহ করে এই মারণাস্ত্র তৈরি করে চলেছে।
১৯৮৮ সালে যে ড্রোন মাত্র ৫০ কিলোমিটার উড়তে পারত, ২০২৬ সালে এসে তা হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। ইরানের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে কেবল অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নয়, বরং কৌশল, ধৈর্য এবং ধারাবাহিকতাও যুদ্ধের ময়দানে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।



