সরকারের দাবি, দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নাকি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সরবরাহেও কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু এরপরেও সারা দেশের তেলের পাম্পগুলোতে মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার সামনে এই দাবি ঠিক মিলছে না। কোথাও ৮ ঘণ্টা দাঁড়িয়েও মিলছে না তেল, কোথাও আবার পাম্পই বন্ধ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এত তেল যাচ্ছে কোথায়? এই ভিডিওতে আমরা সেটাই বোঝার চেষ্টা করব।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম মহানগরের ৪০ শতাংশ তেলের পাম্পই প্রায় বন্ধ। সিলেটেও পরিস্থিতি অনেকটা একই। বরিশাল ও রাজশাহীর পাম্প মালিকরা দাবি করছেন, তেল আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা ফুরিয়ে যাচ্ছে। আর ময়মনসিংহে আগে যেখানে সাত দিনে এক ট্যাংক তেল বিক্রি হতো, সেখানে এখন মাত্র ৬ ঘণ্টাতেই সব শেষ। ফলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না তেল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দাবি, বর্তমানে দেশে ডিজেল মজুদ আছে ১ লাখ ১৩ হাজার টনের বেশি, অকটেন আছে ৩১ হাজার টন এবং পেট্রল ১৮ হাজার টনের উপরে।
গত ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দেশের ইতিহাসে এখন সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুদ আছে। তিনি জানান, দেশে এপ্রিল ও মে মাসের পূর্ণ জ্বালানি সক্ষমতা আছে। সরকার এখন চেষ্টা করছে জুন মাসের জ্বালানি মজুদের।
জ্বালানি তেলের মধ্যে দেশে ডিজেলের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ডিজেলের কোনো ঘাটতি নেই। সমস্যা পেট্রল ও অকটেন নিয়ে। সাধারণত এই দুই ধরনের জ্বালানি ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে বেশি ব্যবহার করা হয়। বিপিসির এক পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, গত বছরের তুলনায় এ বছরের এপ্রিলে অকটেনের সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৯ টন।
বিশেষজ্ঞ ও পাম্প মালিকদের তথ্যে তেল সংকটের বেশ কয়েকটি কারণের কথা জানা যাচ্ছে।
প্রথমত, আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদা বা ‘প্যানিক বাইয়িং’। মানুষের ধারণা হয়েছে, তেল আর পাওয়া যাবে না। আর এ কারণে তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিনে রাখতে চায়। যেমন ধরা যাক, কেউ যদি আগে ২ লিটার তেল কিনত, এখন সে কিনছে ৫ থেকে ১০ লিটার। এতে স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহ ও জোগানে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয় যে কারণটি সামনে আসছে সেটি হলো অবৈধ মজুদ। পাম্পে তেলের জন্য হাহাকার থাকলেও কালোবাজারে কিন্তু বিক্রি থেমে নেই। পাম্পের আশপাশে, এমনকি অনেক এলাকায় মুদির দোকানেও মিলছে তেল। তবে এর জন্য গুনতে হচ্ছে দেড় গুণ বা দ্বিগুণ টাকা। গত কয়েক দিনে সরকারের অভিযানে এমন অসংখ্য মজুদের কথা জানা গেছে।
পাম্প মালিকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এ বছর রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু পাম্পে তেল সরবরাহের পরিমাণ বাড়েনি। ফলে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ওই তেল কম সময়েই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
চতুর্থ কারণ হিসেবে বলা যায় নীতিগত সীমাবদ্ধতার কথা। যেমন তেল নিয়ে নীতিনির্ধারকদের নানা বক্তব্যে জটিলতা বেড়েছে। যেমন বরাদ্দ বেঁধে দেওয়া বা ফুয়েল পাস চালু করেও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এ ধরনের সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের মধ্য থেকে আতঙ্ক যাচ্ছে না।
তবে মূল কথা হলো, এই পরিস্থিতির চড়া মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ যানজটে স্থবির হয়ে পড়ছে শহর। পণ্যবাহী ট্রাক সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর জরুরি সেবার যানবাহনগুলো তেল না পেয়ে জীবন-মরণ সংকটে পড়ছে।
সরকার ঘোষণা দিয়েছে, তারা অকটেনের সরবরাহ আরও বাড়াবে। কিন্তু নজরদারি না বাড়ালে বা কালোবাজারি বন্ধ না হলে তা কতটা কাজে আসবে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। আপনার এলাকার পাম্পগুলোর অবস্থা কী? কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন।


দেশে পেট্রোল-অকটেনের উৎপাদন কত? সংকটই বা কেন?
দেশের ইতিহাসে এখন সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত আছে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী
