আপনি কি জানেন, গত দুই দশকে সিগারেট থেকে সরকারের কর রাজস্ব বেড়েছে ১১ গুণেরও বেশি! রাজস্ব বোর্ডের হিসাব বলছে, ২০০৬ সালে যেখানে সিগারেট থেকে আয় হতো ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, গত অর্থবছরে তা গিয়ে ঠেকেছে রেকর্ড ৪০ হাজার ৩১ কোটি টাকায়। সিগারেটের দাম বাড়ল, রাজস্বও বাড়ল; কিন্তু ধূমপায়ীর সংখ্যা কি কমানো গেছে? তাহলে সরকারের লক্ষ্য কি শুধু রাজস্ব, তামাকের ব্যবহার কমানোর আসল উদ্দেশ্যটি তবে ভেস্তে যাচ্ছে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
রাজস্ব বনাম বিশাল ক্ষতি
সরকার সিগারেট থেকে বছরে রাজস্ব পাচ্ছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই তামাকের পেছনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি কত, তা জানেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে মারাত্মক তথ্য। ২০২৪ সালে তামাকজনিত রোগ ও অকালমৃত্যুর কারণে বাংলাদেশে সরাসরি ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৭৩ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরাসরি চিকিৎসার পেছনে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা। আর অকালমৃত্যুর কারণে দেশের উৎপাদনশীলতা হারিয়েছে ৪২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।
আর যদি পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি—যেমন বন উজাড় বা দূষণের হিসাব যোগ করেন, তবে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৭,৫৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সরকার সিগারেট থেকে যা রাজস্ব পাচ্ছে, তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি টাকা দেশের অর্থনীতি থেকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
কেন কর বাড়িয়েও ধূমপান কমানো যাচ্ছে না?
তাহলে দাম বাড়ার পরও ধূমপান কমছে না কেন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল কারণ আমাদের জটিল চার স্তরের কর কাঠামো। বাংলাদেশে সিগারেট প্রিমিয়াম, উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন—এই চার স্তরে বিভক্ত। যখনই দাম বাড়ানো হয়, তখন ধূমপায়ীরা ধূমপান ছাড়ার বদলে প্রিমিয়াম বা উচ্চমূল্যের সিগারেট ছেড়ে কম দামি বা নিম্নস্তরের সিগারেটের দিকে চলে যান। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এটাকে বলছেন ‘ডাউনট্রেডিং’। ২০০৬-০৭ সালে উচ্চমূল্যের সিগারেটের বাজার ছিল ১৫ শতাংশ, এখন তা কমে হয়েছে মাত্র ২.৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে, কম দামি বা নিম্নস্তরের সিগারেটের বাজার অংশীদারত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশে।
বর্তমানে নিম্নস্তরের একটি সিগারেট মাত্র ৬ টাকায় পাওয়া যায়, অথচ একটি ডিমের দাম প্রায় ১২ টাকা। অর্থাৎ ডিমের চেয়ে সস্তা আমাদের দেশের সিগারেট। ফলে তরুণ বা কম আয়ের মানুষের পক্ষে ধূমপানে আসক্ত হওয়া বা অভ্যস্ত থাকা খুবই সহজ থেকে গেছে। তাছাড়া, কর ব্যবস্থার বাইরে থাকা সস্তা ও অননুমোদিত সিগারেটের একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে, যা মোট চাহিদার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পূরণ করে।
কর থেকে রাজস্ব বনাম কোম্পানির লাভ
দেশের তামাকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মূলত তিনটি প্রতিষ্ঠান—ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, জাপান টোব্যাকো এবং আবুল খায়ের টোব্যাকো। এদের মধ্যে শীর্ষে থাকা ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর নিট মুনাফা ২০০৯ সালে ছিল ২৫০ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ কর বাড়িয়ে সরকারের যেমন রাজস্ব বাড়ছে, কোম্পানিগুলোর মুনাফাও তরতর করে বাড়ছে। কিন্তু দিনশেষে ক্ষতিটা হচ্ছে কার? দেশের সাধারণ মানুষের এবং জনস্বাস্থ্যের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে প্রায় দুই লাখ মানুষ মারা যান।
নীতিগত দুর্বলতা ও সারচার্জের রহস্য
আপনারা হয়তো জানেন, ২০১৪ সাল থেকে সিগারেটের ওপর ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ চালু করা হয়েছিল। এখান থেকে প্রতি বছর ৪৫০ থেকে ৫৫০ কোটি টাকা আদায় হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এই টাকা কোনো আলাদা তহবিলে রাখা হয় না। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণে বা ক্যানসারের চিকিৎসায় এই টাকার কতটুকু খরচ হচ্ছে, তার কোনো স্পষ্ট হিসাব নেই। ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন তামাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমাতে। জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে সরকারি রাজস্ব অর্জন করা আইনি বা নৈতিক—কোনো দিক থেকেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সমাধান কী?
তাহলে এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার উপায় কী? বিশেষজ্ঞরা এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পরামর্শ দিচ্ছেন:
১. একক কর কাঠামো: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানাচ্ছেন সিগারেটের চারটি মূল্যস্তর কমিয়ে একটি বা দুটি স্তরে নিয়ে আসার জন্য।
২. নির্দিষ্ট আবগারি কর: মূল্যের ওপর কর না বসিয়ে উৎপাদনের পরিমাণের ওপর নির্দিষ্ট কর আরোপ করা।
৩. ছোটবেলা থেকেই সচেতনতা: শুধু দাম বাড়িয়ে আচরণ পরিবর্তন করা যায় না। শিশুদের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ধূমপানবিরোধী শিক্ষায় সচেতন করতে হবে।
সিগারেট থেকে আসা ৪০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হয়তো সরকারের বাজেটের লক্ষ্য পূরণ করছে, কিন্তু এর বিনিময়ে দেশ হারাচ্ছে ৭৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ এবং লাখ লাখ অমূল্য জীবন।



