দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড না ভাঙলেও চলতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নাম উচ্চ তাপমাত্রার কারণে বারবার শিরোনামে এসেছে। এপ্রিল ও মে মাসে চুয়াডাঙা, ঈশ্বরদী, ঢাকার মতো এলাকা বারবার অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে খবর হয়েছে। ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে ওঠানামা করেছে তাপমাত্রা। গরমে নাভিশ্বাস উঠেছে মানুষের। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এ হাল। হিট স্ট্রোকে মানুষের মৃত্যু একরকম সাধারণ খবরে পরিণত হয়েছিল। এখনো গরমের এ ধক কমেনি। প্রশ্ন হলো, মানুষ আসলে কতটা গরম সহ্য করতে পারে?
অতিরিক্ত গরমে বিশ্বের নানা দেশের মানুষের আক্ষরিক অর্থেই নাভিশ্বাস উঠছে। ইতালির মানুষ তো ইউরোপের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া তাপপ্রবাহের কারণে গোটা সময়কেই চিহ্নিত করেছে ‘নারকীয় সপ্তাহ’ নামে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। সেখানে হাসপাতালে রোগীদের শরীরের তাপমাত্রা সহনীয় মাত্রায় রাখতে বরফভর্তি বডি-ব্যাগ ব্যবহার করতে হচ্ছে। আর যুক্তরাজ্য এরই মধ্যে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ জুন প্রত্যক্ষ করেছে। অবস্থা এমনই যে, জাতিসংঘ এরই মধ্যে সতর্ক করে বলেছে, ‘আমরা বৈশ্বিক স্ফুটানাঙ্কের’ যুগে বাস করছি। অর্থাৎ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দিয়ে আর বিষয়টির মাত্রা বোঝানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বেশ জোর দিয়েই বলছেন, আমরা এত দিন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যত রকমের শঙ্কায় ভুগছিলাম, তা এখন বাস্তবে প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছি। ফলে এটা জানা খুবই জরুরি যে, এই পরিবর্তিত জলবায়ু ও আবহাওয়ার প্রভাব মানব শরীর ওপর কেমনভাবে এবং কতটা পড়ে। মানুষের সহনীয় তাপমাত্রা আসলে কত?
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি রেডিও ফোরের উপস্থাপক জেমস গ্যালাঘার নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, তিনি এমনিতেই গরমে ঘামতে থাকেন। বিষয়টি আর দশজন মানুষের মতোই তাঁর জন্যও অস্বস্তিকর। কিন্তু এ অবস্থাতেই তাঁকে ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের অধ্যাপক ডেমিয়েন বেইলি আমন্ত্রণ জানান এ সম্পর্কিত একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে। পরীক্ষাটি শুরু হয় ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে। তারপর ক্রমে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে উষ্ণ দিনের তাপমাত্রা ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে ঠেকে।
পরীক্ষাকালে উচ্চ তাপমাত্রায় ওঠার আগেই অধ্যাপক বেইলি জেমসকে সতর্ক করেন এই বলে যে, এতে তাঁর শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হবে। একইসঙ্গে তাঁর শরীরবৃত্তিয় অনেক কিছুই সময়ের সাথে বদলাতে শুরু করবে। পরীক্ষাটি করা হয়েছিল অধ্যাপক বেইলির আওতাধীন একটি কক্ষে, যেখানে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, চাপ, অক্সিজেন মাত্রা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জেমস গ্যালাঘার বলছেন, ওই কক্ষে তাঁর একসময় মনে হয়েছিল যেন তিনি ওভেনের ভেতরে রয়েছেন।
এই পুরো সময়ে জেমসের শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে শুরু করে, হার্টবিট, মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন, শরীর থেকে বের হওয়া ঘামের পরিমাণ, ওজন হারানোর মাত্রা ইত্যাদি সবকিছু শনাক্ত করা হয়। একইসাথে স্মরণশক্তির ওপর তাপমাত্রার প্রভাব নির্ণয়ে আরেকটি পরিক্ষা করা হয়। ৩০টি শব্দ দিয়ে অধ্যাপক বেইলি তা মনে রাখার জন্য বলেন। এভাবে সম্ভাব্য সব পন্থায় শরীরের ওপর তাপমাত্রার প্রভাব শনাক্তের চেষ্টা করা হয়।
পরীক্ষাটি সম্পর্কে অধ্যাপক বেইলি বিবিসিকে বলেন, আমরা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে সব ধরনের পরীক্ষা আবার করি। সে সময় দেখা যায়, ওই তাপমাত্রা তেমন অস্বস্তিকর নয়। যদিও সে অবস্থায় নমুনাটি কাজ বা কোনো ধরনের ব্যয়াম করতে ঠিক আগ্রহী থাকে না। শারীরিক যে পরিবর্তনটি এ সময় লক্ষ্যণীয় হয়েছিল তা হলো, জেমস লাল হয়ে উঠেছিল। কারণ, এত উচ্চ তাপমাত্রার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শরীরের ত্বকের কাছে থাকা রক্তনালীগুলো এ সময় সক্রিয় হয়েছিল, বাইরের পরিবেশের কাছাকাছি থেকে তাপ হারানোর একটা উপায় খুঁজতে। আর ঘাম তো ছিলই, যাতে শরীর এই উচ্চ তাপমাত্রায় নিজেকে ঠান্ডা করে নিতে পারে।
এর পর ওই কক্ষের তাপমাত্রা আরও ৫ ডিগ্রি বাড়িয়ে ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তোলা হয়। সে অবস্থায় স্বেচ্ছাসেবক জেমসের অবস্থা এক কথায় শোচনীয় হয়ে পড়ে। জেমসের ভাষ্যমতে, প্রভাবটি আর রৈখিক না থেকে জ্যামিতিক আকার নেয়। পরিস্থিতি এমন হয় যে, দ্রুত শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে জেমসকে ওই কক্ষের বাইরে নিয়ে আসা হয়।
ওই পরীক্ষাকালে জেমস তাঁর শরীরের মোট জলীয় অংশের এক-তৃতীয়াংশই হারিয়ে ফেলেছিলেন। আর ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সময় হার্টবিট বেড়ে গিয়েছিল লক্ষ্যণীয় মাত্রায়। ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তুলনায় সে সময় জেমসের হৃদযন্ত্র বাড়তি এক লিটার করে রক্ত শরীরের সঞ্চালন করছিল। আর হৃদযন্ত্রের ওপর এই বাড়তি চাপের কারণেই গরম বাড়লে হার্ট অ্যাটাকের হার বেড়ে যায়।
অধ্যাপক বেইলি বলছেন, উচ্চ তাপমাত্রায় মানুষের শরীরে একসাথে অনেকগুলো ঘটনা ঘটতে থাকে একসাথে। শরীরের তাপমাত্রা একটা সীমার মধ্যে রাখতে শরীরের ত্বকের নিচে থাকা রক্তনালীগুলোতে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায়। এতে ঘাটতি হয় মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনের। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে স্মরণশক্তিতে। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু মনে করতে না পারার প্রবণতা এতে বেড়ে যায়।
গরমের সাথে বাংলাদেশের মতো দেশে আর্দ্রতা একটি বড় ফ্যাক্টর। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ যত বাড়ে, ততই আর্দ্রতা বাড়ে। উচ্চ তাপমাত্রার সাথে উচ্চ আর্দ্রতাও যদি থাকে তাহলে ভীষণ অস্বস্তি তৈরি হয় শরীরে। বাংলাদেশে বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম ও এর আশপাশের সময়ে এ ধরনের অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। এটা হয় কারণ, এ সময় শরীরের নিজের ঠান্ডা হওয়ার ক্ষমতা কমতে থাকে। প্রচুর ঘাম হলেও সেই ঘাম শুকায় না। অর্থাৎ, শরীর ঠান্ডা করতে যে ঘাম হলো, তা বাতাসে জলীয় বাস্প বেশি থাকায় আর বাষ্পিভূত হতে পারছে না। ফলে শরীরের ঘাম তৈরি করার উদ্দেশ্য আর সফল হচ্ছে না।
আর্দ্রতা আসলে বিরাট ভূমিকা রাখে এ ক্ষেত্রে। আমরা প্রায়ই বলতে শুনি যে, তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি, কিন্তু অনুভূত হচ্ছে ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। এই গত এপ্রিল-মে মাসেই বাংলাদেশে এমন কথা প্রায়ই শোনা গেছে। এখানেই আছে আর্দ্রতার খেলা।
নিজেদের করা এমনই এক পরীক্ষার বর্ণনা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রেচেল কোটল জানান, উচ্চ তাপমাত্রার সাথে উচ্চ আর্দ্রতার জুড়ি ভয়ঙ্কর। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শরীর নিজেকে ঠান্ডা করতে রীতিমতো যুদ্ধ করে। একপর্যায়ে সে আর তা পারে না। ফলে এমনকি দেশের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হতে শুরু করতে পারে। আর্দ্রতা অতিরিক্ত বেশি থাকলে এমনকি তুলনামূলক অল্প তাপমাত্রাতেও এমন বিপদ ঘটতে পারে। একই ভাষ্য পাওয়া গেছে ২০২০ সালে সায়েন্স অ্যাডভান্সে প্রকাশিত এক নিবন্ধেও।
সারা বিশ্বের বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, এখন তাপপ্রবাহ ঘনঘন হচ্ছে। এটাই একমাত্র বিপদ নয়। সাথে দেখা যাচ্ছে এমন তাপপ্রবাহের সময় আর্দ্রতাও বাড়ছে আগের তুলনায় বেশি। ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরেই এ ধরনের উচ্চ আর্দ্রতাযুক্ত তাপপ্রবাহ হয়েছে।
এ বিষয়ে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী কলিন রেমন্ড লাইভ সায়েন্সকে বলেন, ‘আর্দ্রতা অনেক বড় বিষয়। ধরুন বাতাসে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৩০ শতাংশ, সে ক্ষেত্রে হয়তো তাপ সেভাবে অনুভূত হবে না। এমন আবহাওয়ায় উচ্চ তাপমাত্রাও সহনীয় হতে পারে। কিন্তু ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাও অসহনীয় হয়ে উঠবে যদি আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭৫ শতাংশের বেশি হয়।’
কেন এমনটা হয়? শুধু তাপমাত্রা বা শুধু আপেক্ষিক আর্দ্রতা মাপলে বিষয়টি ঠিক বোঝা যাবে না। তাপমাত্রা শুধু চারপাশের তাপমাত্রার কথাই বলে। আর আপেক্ষিক আর্দ্রতাও তাই। কিন্তু এ দুটির যোগে যে তাপমাত্রা তাই বলে দেয় যে ওই আবহাওয়া আসলে মানুষের সহনীয় পর্যায়ে আছে কিনা।
একটু ব্যাখ্যা করা যাক। বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা যদি ১০০ শতাংশ হয়, তাহলে শরীর থেকে তাপ বের করে দেওয়ার আর কোনো উপায় থাকবে না। এটিই হচ্ছে পরম বিন্দু। তাপমাত্রা আসলে কত অনুভূত হবে, তা নির্ণয় করা হয় ওয়েট বাল্ব মেথডে। এ প্রক্রিয়ায় একটি থার্মোমিটারকে ভেজা কাপড়ে জড়িয়ে তাপমাত্রা মাপা হয়। অর্থাৎ, বিদ্যমান তাপমাত্রা বাতাসে ১০০ শতাংশ জলীয় বাষ্পে মাপা হলে কেমন অনুভূত হবে, তা নির্ণয় করা হয়। এই তাপমাত্রা যখন ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়ে যায়, তখনই হয় বড় বিপত্তি।
কারণ, মানব শরীরের গঠনই এমন যে, তাকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতে থাকতে হয়। শরীরের নিজের তাপমাত্রা যখন ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি যায়, ততই মানুষের মাথা ফাঁকা লাগতে শুরু করে। একেবারে বাজে পরিস্থিতি হলো-জ্ঞান হারিয়ে ফেলা। শরীরের মূল তাপমাত্রা অতি উচ্চ হলে শরীরের টিস্যুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে হৃদযন্ত্র বা মস্তিষ্কে থাকা টিস্যুর ক্ষতি। এ কারণেই অতি উচ্চ তাপমাত্রায় হিটস্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের মতো খবর চারদিক থেকে আসতে থাকে। ফলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো রোগ যাদের রয়েছে, তাদের এ সময়ে বেশি সতর্ক থাকা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
করণীয় কী:
উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাযুক্ত আবহাওয়ার সময় কিছু বিষয় মেনে চলার পরামর্শ বরাবরই দেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা পালনের সুপারিশ করে-
তাপপ্রবাহের সময় বাইরের কাজ এড়িয়ে চলা
দিনের অধিকাংশ সময় কোনো ছায়াযুক্ত স্থানে, পারলে ঘরে থাকা
ঢিলেঢালা পোশাক পরা
অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা
ঘর যতটা পারা যায় ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা করা
প্রচুর পানি পান করা
ডাব বা তরল খাবার গ্রহণ
গরম দিনে ব্যায়াম না করা
সব মিলিয়ে ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের অধ্যাপক বেইলির পরামর্শ হলো-তাপপ্রবাহের সময় যতটা পারা যায় রোদ এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ, এমন আবহাওয়ায় রোদে একদিন পুড়লে শরীরের তাপীয় ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা কমে, যা দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। একইসঙ্গে গরমের সাথে শরীরের সন্ধি স্থাপনের চেষ্টাও করতে হবে। বাস্তবতা যেহেতু এমন, সেহেতু গরমে টিকে থাকার অভ্যাসটা করতে হবে, যাতে হঠাৎ করে আসা তাপপ্রবাহের সময় শরীর ভেঙে না পড়ে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো-এই যাবতীয় বিরূপ পরিস্থিতির যে মূল কারণ, সেই জলবায়ু পরিবর্তন রোখার জন্য, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করা। জীবাশ্ম জ্বালানি, প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারের মতো অবস্থান থেকে ব্যক্তিপর্যায়েই যতটা সম্ভব সরে আসা।



