জলবায়ু পরিবর্তন: উষ্ণতা ঠেকাতে সঠিক পথেই এগোচ্ছে বিশ্ব

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:২৫ পিএম

দাবদাহ, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, যুদ্ধসহ নানা দুর্যোগে ভরা একটি বছর ছিল ২০২৩। এটি বিশ্বের উষ্ণতম বছরের তকমা পেয়েছে। এ বছরের দুটি দিনের তাপমাত্রা শিল্প বিপ্লবের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এসব হতাশাজনক সূচক সত্ত্বেও বছরটিতে আশাব্যঞ্জক আগামীর বীজ রোপিত হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের একটা অংশ। তাঁরা মনে করছেন, এ বছর জ্বীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ‘টিপিং পয়েন্ট’ বা চূড়ায় পৌঁছেছে। ফলে ২০২৪ সাল থেকে তা ক্রমশ কমতে থাকবে।

তেল, কয়লা ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিই কার্বন ডাই অক্সাইডের প্রধান উৎস। আর কার্বন ডাই অক্সাইডই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) ১৫ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বে কয়লার চাহিদা পূববর্তী বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এ বছর বিশ্বে ৮৫০ কোটি টন কয়লা ব্যবহার করা হয়েছে, যা রেকর্ড। কিন্তু আশার কথা হলো, ২০২৪ সাল থেকে কয়লার ব্যবহার কমানোর ঘোষণা দিয়েছে চীন, আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের এক গবেষণায় বলা হয়, প্রতি বছর বিশ্বে যে পরিমাণ কয়লা ব্যবহার করা হয়, তার প্রায় অর্ধেকই করে চীন। ফলে এককভাবে চীনের বার্ষিক কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ আমেরিকা, ভারত ও রাশিয়ার সামষ্টিক নিঃসরণের চেয়ে বেশি।

কার্বন ডাই অক্সাইডই বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। ছবি: রয়টার্সকিন্তু ২০২৩ সালে চীনে কয়লার ব্যবহার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছে। তাই ২০২৪ সাল থেকে দেশটিতে জ্বালানিটির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। কারণ, দেশটি তার ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদার জন্য জ্বীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বায়ু ও সৌর বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। বিদায়ী বছরে চীন পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে।

অন্যদিকে আইইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে আমেরিকা ও ইইউতে কয়লার ব্যবহার ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বিশ্বের শীর্ষ চার নম্বর কয়লা ব্যবহারকারী দেশ রাশিয়া নতুন বছরে জ্বালানিটির ব্যবহার কতটা কমাবে, তা নিয়ে পূর্বাভাস করতে পারেনি আইইএ। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান থাকলে নতুন বছরেও কয়লার ব্যবহার অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকবে দেশটিতে।

কপ-২৮ সম্মেলনে বেশ আশাব্যঞ্জক ঘোষণা এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ছবি: রয়টার্স২০১৫ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২১) বৈশ্বিক উষ্ণতা ঠেকাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্মত হয়েছিল জাতিসংঘের সব দেশ, যা প্যারিস চুক্তি নামে পরিচিত। চুক্তিটির মূল কথা, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি মানুষ ও অন্য প্রাণীকুলের সহ্য ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হলে চলতি শতাব্দীর মধ্যে তা শিল্প বিপ্লবের (১৭৬০-১৮৪০) আগের তুলনায় কোনোভাবেই ২ ডিগ্রির বেশি বাড়তে দেওয়া যাবে না। সবচেয়ে ভালো হয়, তা যদি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে আটকে রাখা যায়। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে হবে। আর ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হবে।

২০২৩ সালের শুরুতে আইইএর একটি প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়, ২০৩০ সালের আগেই তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপকহারে কমবে। প্যারিসভিত্তিক আন্তঃসরকারি আইইএ জ্বালানি বিষয়ক নীতিমালা বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী ও গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৪ সালে যাত্রা করা প্রতিষ্ঠানটি এর আগে কখনো এতটা ইতিবাচক পূর্বাভাস দেয়নি।

সংস্থাটির আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়বে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে কপ বা আন্তর্জাতিক জোটগুলো কোনো শক্তিশালী নীতি গ্রহণ করতে না পারলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এতটা বাড়বে। আর শক্তিশালী নীতিমালা গ্রহণ করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এ সময়ে আরও বাড়তে পারে।

বিদায়ী বছরের শুরুর দিকে মার্কিন জলবায়ুবিষয়ক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইম্বারের’ এক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ২০২২ সালে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। আর বায়ু বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।

কার্বন নিঃসরণ ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাড়তে থাকবে। ছবি: রয়টার্সসংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আবুধাবিতে সদ্যসমাপ্ত কপ-২৮ থেকে যেসব ঘোষণা এসেছে, তাও বেশ আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। জলবায়ু সম্মেলনের ইতিহাসে এবারই প্রথম জীবাশ্ম জ্বালানিকে উষ্ণতা বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই ঘোষণাপত্রে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ক্রমশ সরে আসতে সুপারিশ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার তিনগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এবারের সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট সুলতান আল-জাবেরের ভাষায়, ‘চলতি দশকটা আমাদের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ দশকে আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরিয়ে আনতে হবে। অত্যন্ত ন্যায্য, পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খলভাবে তা করতে হবে। এটা যথাযথভাবে করা গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা যাবে।

আলোচনায় এখন পর্যন্ত যেসব স্বস্তিদায়ক তথ্য ও মতামত উল্লেখ করা হয়েছে, তার বিপরীত তথ্য ও যুক্তিতর্কগুলোও বেশ শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ আমেরিকার জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) এবং জ্বালানি সম্পদ রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের সাম্প্রতিক কিছু পূর্বাভাসের কথা বলা যায়।

চলতি বছরের শুরুতে ইআইএর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে কার্বন নিঃসরণ ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাড়তে থাকবে। অর্থাৎ, ২০৫০ সালের পরে গিয়েই বিদ্যুত খাত কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারবে। অথচ প্যারিস চুক্তিতে ২০৫০ সালের মধ্যে কর্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতিমালা গ্রহণ করছে কপ।

অন্যদিকে ওপেকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা ২০৪৫ সাল পর্যন্ত বাড়তে থাকবে। তবে তা সাম্প্রতিক সময়ের চেয়ে কম হারে বাড়বে।

ওপেকের পূর্বাভাস সম্পর্কে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থেই ওপেকের মতো সংগঠনগুলো জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়াবে বলে প্রচার করছে। কারণ, ওপেকভুক্ত দেশগুলোর প্রধান চালিকাশক্তি এখন পর্যন্ত তেল ও গ্যাস। তাই তারা জ্বালানি তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে, এমন একটি প্রপাগাণ্ডা চলাতে থাকে।

জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কতটা কমবে, তা আন্তর্জাতিক মহল ও সরকারগুলোর নীতিমালার ওপর নির্ভর করছে। ছবি: রয়টার্সযা হোক, চলতি দশকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কতটা কমবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার কতটা বাড়বে, তা আন্তর্জাতিক মহল ও সরকারগুলোর সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জার্মানভিত্তিক জলবায়ুবিষয়ক সংগঠন ক্লাইমেট অ্যানালাইটিকসের শীর্ষ গবেষক ক্লেয়ার ফাইসন গার্ডিয়ানকে বলেছেন, কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার চলতি প্রবণতা কোন দিকে যাচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে। বর্তমান প্রবণতাকে ধরে রাখতে সরকারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। শক্তিশালী নীতিমালা ও তার বাস্তবায়ন না থাকলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ অসম্ভব।

তথ্যসূত্র: গার্ডিয়ান, রয়টার্স, আল জাজিরা, সিবিএস নিউজ

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে গত বুধবার সকালে যে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে, তার নেপথ্যে একটি হিমবাহের আকস্মিক ধসকেই প্রাথমিকভাবে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে বিজ্ঞানীদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন আর শুধু ‘কী...
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের তিন বছর এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। আর বিবদমান এসব গোষ্ঠীকে একাধিক আন্তর্জাতিক শক্তি সহায়তা দিচ্ছে বলেও...
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার এক বছর পরই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যা এখনও চলমান। জো বাইডেনের প্রশাসনের যাত্রা শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে এ পর্যন্ত ১৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের...
২০১৪ সালে ক্ষমতায় বসেই নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’। অর্থাৎ, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করাই তাঁর মূলনীতি। আজ ১০ বছর পর দেখা যাচ্ছে, ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশীদের সম্পর্কের...
অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাসে নির্বাচিত সরকারকে বিপদে ফেলার সব ছক তৈরি করে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) ও গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। আজ শুক্রবার নিজের...
নিরাপত্তার অভাব, অব্যবস্থাপনা আর অনিয়মসহ নানা ভোগান্তির কারণে গাজীপুরের সাফারি পার্ক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন দর্শনার্থীরা। পার্ক কর্তৃপক্ষ বলছে, অব্যবস্থাপনা দূর করতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
হিমবাহধসে নেপালে সৃষ্ট ভয়াবহ ঢলের ৯ দিন পর একটি সুড়ঙ্গ থেকে দুই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আজ শুক্রবার ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে ওই দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়। তাদের একজন...
নেপাল-তিব্বতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানির রেশ কাটতে না কাটতেই ফের কেঁপে উঠল হিমালয়। তিব্বতে বৃহস্পতিবার অনুভূত হলো জোরালো ভূমিকম্প।
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর