বছরখানেক চুপ থাকার পর পাহাড়ে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। বান্দরবানে তিনটি ব্যাংকে ডাকাতির পর থানচি থানা ও আলীকদমে যৌথবাহিনীর চেকপোস্টে আক্রমণের পর আবারও আলোচনায় নিষিদ্ধ এ গোষ্ঠীটি। তবে এই ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিক বলে মনে করছেন না নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। তাঁদের ধারণা, এতে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আরও ধারণা করছেন, গোষ্ঠীটির ভেতরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বও তৈরি হয়েছে। পাহাড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথেষ্ট উদ্যোগ ছিলো না বলেও দাবি তাঁদের। এজন্য সরকারকে আরও কৌশলী হওয়ার পরামর্শ বিশ্লেষকদের।
জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যদের প্রশিক্ষণ ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনায় আসে কেএনএফ। সে ঘটনার পর ২০২২ সালের শেষদিক থেকে অনেকটা নীরব হয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এমনকি শান্তি আলোচনায় দাবি-দাওয়া নিয়েও আলোচনায় বসে তারা।
এ বিষয়ে চূড়ান্ত রুপরেখা তৈরিতে আগামী ১৬ এপ্রিল আবারও আলোচনার কথা ছিলো। এর মাঝেই ব্যাংক ডাকাতিতে সশস্ত্র অবস্থান জানান দেয় কেএনএফ।
গত মঙ্গলবার রাতে তারাবি নামাজের সময় বান্দরবানের রুমা শাখা সোনালী ব্যাংক ও আশেপাশের এলাকা ঘিরে ফেলে শতাধিক সশস্ত্র দুর্বৃত্ত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মসজিদ থেকে ব্যাংক ম্যানেজার নেজাম উদ্দিনকে ধরে নিয়ে ব্যাংকের ভেতরে মারধর করে তারা। পরে তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
এ সময় ব্যাংকের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ১০ পুলিশ ও ৪ আনসার সদস্যকে নিরস্ত্র করে ৮টি চাইনিজ অটোমেটিক রাইফেল, ২টি এসএমজি, ৪টি শটগান ও ৪১৫ রাউন্ড গুলি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় ২ পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ঘটনার ১৬ ঘণ্টা পর থানচিতে আরও দুটি ব্যাংকে ডাকাতি হয়।
বৃহস্পতিবার রাতে অপহৃত সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা নেজাম উদ্দিনকে রুমা বাজার থেকে উদ্ধার করে র্যাব। এর পরপরই থানচি থানা থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনেন স্থানীয়রা। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এই গোলাগুলি চলে।
স্থানীয়রা বলছেন, থানচি থানার পাশে প্রথম গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। পরে তা থানচি বাজারের কাছে চলে আসে। স্থানীয়দের ধারণা সশস্ত্র গোষ্ঠি কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) প্রায় ২ শতাধিক নারী ও পুরুষ পোশাকধারীদের সঙ্গে পুলিশের গুলি বিনিময় হয়। এ সময় পুলিশ প্রায় ৫০০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। পরে রাত সাড়ে ৯টার পর গোলাগুলি কমে আসে।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই আলীকদমের ২৬ মাইল ডিম পাহাড় এলাকায় যৌথবাহিনীর চেক পোস্টে হামলা হয়। সবগুলো ঘটনার সঙ্গেই কেএনএফ জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলোচনা চলাকালে এমন হামলায় গোষ্ঠীটির নেতৃত্বের দ্বন্দ এবং তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনের বিষয়টি সামনে চলে আসছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘এ থেকে এটাও হয়ত প্রতীয়মান হচ্ছে বা চিন্তা করার অবকাশ সৃষ্টি করছে যে, এখানে বাহিরের কারো ইন্ধন আছে কি না, এই আলোচনাকে ভণ্ডুল করে দেওয়ার জন্য এগুলো আমাদের দেখতে হবে।’
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, এই সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগের অভাব ছিলো। এখন নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঢেলে সাজানোর পরামর্শ তাঁদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনিস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘তারা কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে কাঠামোগত পরিবর্তন করেছে। সেই কাঠামোতে কখনো নিয়ন্ত্রণের বিষয় থাকে। কখনো এদেরকে সঠিক বিষয়টি বুঝিয়ে ডির্যাডিকালাইজড করার, মুল জায়গায় বা স্বাভাবিক জায়গায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা থাকে।’
দুর্গম অঞ্চলে কেএনএফকে নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের সচেতনা বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) হিসেবে যাত্রা শুরু করে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। কিন্তু এনজিও থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়ে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের ৬টি উপজেলায় অস্থিতিশীল এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে এই গোষ্ঠীটি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানকেন্দ্রিক বম, পাঙ্খোয়া, লুসাই, খুমী, ম্রো, খিয়াং–এই ছয়টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নে কুকি চিন ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (কেএনডিএর) যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে। পরে ২০১৬ সালে কেএনএফ নামে এই গোষ্ঠীটি সশস্ত্র হয়ে ওঠে।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তথ্য বলছে, কেএনএফের আলাদা উইং কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) রাঙামাটির বিলাইছড়ির বড়থলি ইউনিয়ন এবং বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড় ঘিরে রুমা, থানছি, লামা, আলীকদম ও রোয়াংছড়ি নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য তৈরির উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করে।
এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে শুরু থেকেই আলোচনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং এক সময়ের জনসংহতি সমিতির ছাত্র সংগঠন পিসিপির কেন্দ্রীয় নেতা নাথান বম। মূলত তাঁর নেতৃত্বে বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সীমান্ত ও সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগিয়ে অস্ত্র সংগ্রহ এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কেএনএ। এরই মধ্যে পাহাড়ের অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় নাথান বমের। ২০১৮ সালে তিনি বান্দরবান থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীও হন।
২০২১ সালে নাথাম বমের নেতৃত্বাধীন এই গোষ্ঠীর পাহাড়ে টাকার বিনিময়ে জঙ্গিদের সহায়তার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ৪ সেনা সদস্য এবং কেএনএফের অন্তত ১৬ সশস্ত্র সদস্য নিহত হন।
বর্তমানে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রায় পাঁচ শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।


এনজিও থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠী কেএনএফ
বান্দরবানের থানচি বাজারে ব্যাপক গোলাগুলি
গভীর রাতে ডিম পাহাড়ে যৌথবাহিনীর চেকপোস্টে হামলা
রুমায় অপহৃত ব্যাংক ম্যানেজার উদ্ধার
থানচি থানায় আক্রমণ করেছিল সন্ত্রাসীরা 
