দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারার লোকালয়ে বন্যহাতির উৎপাত বেড়েই চলেছে। চলতি সপ্তাহে টানা চারদিন হাতির হানায় মারা গেছে একজন। আহত হয়েছে আরো দুজন। দেয়াং পাহাড় থেকে নেমে আসা হাতির হানায় গত ছয় বছরে মারা গেছে ১৫ জনের বেশি। স্থানীয়দের অভিযোগ, লোকালয়ে হাতি আসা বন্ধ নিয়ে নির্বিকার প্রসাশন। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপদ হাতির বসবাস এবং জানমালের ক্ষতিরোধে তারা নানা উদ্যোগ নিয়েছেন।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার টানেল রোডে ইদানিং হাতির চলাচল বেশ চোখে পড়ে। রাস্তায় চলাচল করছে গাড়ি, মানুষ। সাথে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মস্ত হাতিও। এমন দৃশ্য দেখার জন্য স্থানীয় অনেক মানুষ উন্মুখ যেমন থাকে তেমনি হাতিকে উত্যক্ত করতেও দেখা যায়।
স্থানীরা জানান, আগে আনোয়ারার ঐতিহাসিক দেয়াং পাহাড়ের আশেপাশের বৈরাগ ও কেইপিজেড এলাকায় হাতি গভীর রাতে বের হলেও বছরখানেক ধরে দেখা মিলছে সুর্যের আলোতেও। আবার গভীর রাতে হাতি হানা দিচ্ছে বৈরাগ, গুয়াপঞ্চক ও কেইপিজেড এলাকায়। সেখানে খাবার না পেয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে মানুষের ওপর। গত সোমবার রাতেও মারা গেছে একজন। স্থানীয়রা বলছেন, হাতির উৎপাতে তাদের এলাকা ছাড়ার দশা।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা বৈরাগ এলাকায় গত চারদিন টানা হাতির আক্রমণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বুধবার রাতেও উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মধ্য গুয়াপঞ্চক এলাকায় হাতির আক্রমণে আহত হয় আবদুর রহিম নামের এক ব্যক্তি। রহিম দেয়াঙ পাহাড়ের পাদদেশে একটি পোলট্রি খামার পরিচালনা করেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সন্ধ্যা সাতটার সময় বাড়ি থেকে পোলট্রি খামারে যাচ্ছিলেন আবদুর রহিম। ওই সময় পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি হাতির সামনে পড়লে হাতি শুঁড়ে তুলে আছাড় মারে তাঁকে। পরে রাত ১০টার দিকে তাঁর গোঙানির শব্দ শুনে লোকজন এগিয়ে এসে ঝোপের ভেতর থেকে উদ্ধার করে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
মঙ্গলবার রাতে কর্ণফুলী উপজেলার বড় উঠান ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মো. আকবর, সোমবার রাতে আনোয়ারা উপজেলার বটতলী আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকার হালিমা খাতুন নামের এক নারী এবং এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গুয়াপঞ্চক গ্রামের কৃষক মো. দুলাল হাতির আক্রমণে নিহত হন। এ নিয়ে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ের আশপাশের এলাকায় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ৬ বছরে হাতির আক্রমণে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় প্রসাশন বলছে, দেয়াঙ পাহাড়ে খাবার ও সুপেয় পানি পাওয়ায় চারটি হাতি অবস্থান নিয়েছে। মাঝে মধ্যে তারা লোকালয়ে নেমে আসে। অকারণে হাতি মানুষকে আক্রমণ করে না। হাতিকে উত্ত্যক্ত কিংবা বিরক্ত করা হলে তারা মারমুখী হয়। তবে, গুয়াওঞ্চক এলাকায় লোকজন অভিযোগ করেন বন বিভাগ হাতির আক্রমণ নিয়ে নির্বিকার।
স্থানীয় নুরুল ইসলাম জানান, ইদানীং রাতে হাতি পাড়ায় ঢুকে বাড়ীঘর ভাংগছে। সামনে কাউকে পেলে তার উপর আক্রমণ চালায়। হাতিকে স্থানীয়রা উত্যক্ত করে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাতির ভয়ে যেখানে সবাই তটস্থ থাকছে সেখানে উত্যক্ত করবে কিভাবে?
মো. সুমন নামের স্থানীয় যুবক জানান, তারা হাতির উপদ্রব থেকে বাঁচতে জেলা প্রসাশকসহ নানা জায়গায় চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু কোন পক্ষ থেকে কোন বিকার দেখেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বন বিভাগ জানায়, আনোয়ারা-কর্ণফুলী উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ে হাতির অভয়ারণ্য না থাকলেও বন্য হাতি বংশ পরম্পরায় এই পথ ধরে হাঁটাচলা করে। একবার হাতি যে জায়গা দিয়ে হাঁটাচলা করেছে, বারবার ওই জায়গা দিয়েই হাঁটাচলা করে। আর এতে বিঘ্ন ঘটলে হাতিরা মারমুখী হয়ে ওঠে। গাছপালা বেশি না থাকলেও একসময় দেয়াঙ পাহাড়ে হাতি স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলা করতে পারত। কিন্তু কেইপিজেডসহ নানা স্থাপনা গড়ে তোলায় এখন তা পারছে না।
২০২০ সালের দিকে বন বিভাগ ছয়টি স্বেচ্ছাসেবক দল করে, পাহাড় থেকে হাতি নামলে মানুষকে সজাগ করতে। কিন্তু সেই দলগুলোর কর্মতৎপরতা এখন নেই বলে জানান এলাকাবাসী।
আনোয়ারা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ইশতিয়াক ইমন জানান, জেলা প্রশাসকের সাথে বৈঠক শেষে একটা কুইক রেসপন্স টিম করা হয়েছে। যাদের দায়িত্ব হাতির যে কোন ঘটনায় তারা পাশে থাকবে। তিনি জানান, নানাভাবে এলাকায় প্রচারণা চালানো হচ্ছে যেন, হাতিকে বিরক্ত করা না হয়। তিনি আরো জানান, হাতিগুলোকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তারা বিবেচনায় রেখেছেন।
বন বিভাগ জানিয়েছে, একটি হাতি দৈনিক ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা এবং ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার হাঁটে। আর খাবার খায় প্রায় ১৫০ কেজি। সব মিলিয়ে হাতির জন্য বিশাল জায়গা প্রয়োজন হলেও তা এখন নেই। এর ফলে হাতি জানমালের ক্ষতি করছে। এলাকাবাসীও চাইছে হাতির ও মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো অভায়ারণ্যে হাতিকে সরিয়ে নেওয়া হোক।



