আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর রিমান্ড শুনানিতে হট্টগোল হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকীর বক্তব্যের প্রতিবাদ করায় পিটিয়ে আদালত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে আমুর আইনজীবী স্বপন রায় চৌধুরীকে।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শাহিন রেজার আদালতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে এসব ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, ‘আমু যেখানেই যেতেন, সেখান থেকেই সোনার নৌকা উপহার নিতেন।’
এ দিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের রমনা জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আরিফ আমুর ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তাঁর ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শুনানিতে ওমর ফারুক বলেন, ‘আমির হোসেন আমু ১৪ দলের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও সমন্বয়ক। তিনি কখনো চিন্তা করেননি মাথায় হেলমেট আর হাতে হাতকড়া পরে তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। ক্ষমতায় থাকার আমরণ ট্যাবলেট খেয়েছিলেন বলে মনে করতেন। কিন্তু বিধাতা তা মানেননি। তিনি সবকিছু ঠিক করে দেন।’
ওমর ফারুক দাবি করেন, ‘আমু স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবকে বুঝিয়ে বাকশাল কায়েম করে। দল থেকে সিরাজুল ইসলাম, আ স ম রবদের বের করতে আমু-তোফায়েলের ভূমিকা ছিল। তাঁদের কারণে স্বাধীনতার পর দেশে জনগণের মধ্যে বিভাজন বিরাজ করে। তাঁরা শেখ মুজিবকে স্বৈরাচার করতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। একদলীয় বাকশাল কায়েমের মূল হোতা আমু-তোফায়েল।’
ওমর ফারুক বলেন, ‘এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালে ক্ষমতার একটা পালাবদল চলে আসছিল। বাপকে (শেখ মুজিব) যেভাবে বিপথে নিয়েছে, মেয়েটাকেও (শেখ হাসিনা) সেভাবে নিয়েছে আমু-তোফায়েলরা। হাসিনাকে বুঝাত, যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন ক্ষমতায় থাকবেন। ফ্যাসিস্ট তৈরিতে তাঁদের (আমু-তোফায়েল) ভূমিকা রয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার লোক খুন, গুম হয়েছে। অনেকে দেশে থাকতে না পেরে মালয়েশিয়াসহ ইউরোপে চলে গেছে। দেশের স্বাধীনতা অন্যের কাছে বিকিয়ে দিয়েছে। দেশের রাজনীতি নষ্ট করার কৌশলীদের একজন আমু।’
রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তাঁরা গণভবনে মিটিং করে। যেকোনো মূল্যে আন্দোলন দমানোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। ফিলিস্তিনের গাজায় যেভাবে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়, আন্দোলনকারীদের ওপরও সেভাবে গুলি চালানো হয়। ৫ আগস্টের পর তাঁর এলাকা ঝালকাঠিতে নিপীড়িত জনতা অত্যাচারের ইতিহাস তুলে ধরেছে। নিপীড়িত মানুষ তাঁর বাড়িতে আগুন দেয়। সেখানে ৫ কোটি টাকা পাওয়া যায়। টাকার জাজিম বানিয়ে ঘুমাতেন আমু। যেখানে যেতেন সোনার নৌকা ছাড়া উপহার নিতেন না। দীর্ঘদিন পালিয়ে ছিলেন। তাঁর সহযোগীরাও পালিয়ে আছেন। হয়ত ধীরে ধীরে বের হয়ে আসবেন। এদের শাস্তি হোক। তাহলে আর ফ্যাসিস্টের জন্ম হবে না।’
পিটিয়ে আদালত ছাড়া করা হয়েছে আমুর আইনজীবীকে
রাষ্ট্রপক্ষে ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ড শুনানি করছিলেন, সেই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান আমুর আইনজীবী স্বপন রায় চৌধুরী। শুনানিতে আমুর আইনজীবী কথা বলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করে আদালত থেকে বের করে দেন একদল আইনজীবী।
এ সময় আদালতে কিছুটা বিশৃঙ্খল পরিবেশ দেখা যায়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পরিস্থিতি শান্ত করেন।
কথা বললেন আমু নিজেই
আইনজীবীকে পিটিয়ে বের করে দেওয়ার পর আদালত আমুর বক্তব্য শুনতে চান। তখন আমু কথা বলেন। আমু বলেন, ‘আমি ঢাকা বারের সদস্য, হাইকোর্ট বারের সদস্য। এখানকার পরিবেশ দেখে দুঃখিত। এই পরিবেশে কিছু বলা উচিত না। মামলা চলবে, ভবিষ্যতে আমি আমার বক্তব্য উপস্থাপন করব। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অনেক কথা বলেছেন। আমি একজন রাজনীতিবিদ। রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে গেলে দুই ঘণ্টা লেগে যাবে।’
আমু বলেন, ‘আমরা (আইনজীবী) একে অপরের ভাই-ভাই। মিলে-মিশে থাকা উচিত। আমরা একসাথে থাকব। কেন দ্বন্দ্বে জড়াব? আশা করছি, এ পরিবেশ থাকবে না।’
তখন বিএনপির আইনজীবীরা চিৎকার শুরু করেন। তাঁরা বলেন, ‘আমু ভয় দেখাচ্ছেন।’ তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তাঁদের শান্ত করেন।
পরে আমু বলেন, ‘আমরা যার যার পক্ষ অবলম্বন করব। নিজেরা নিজেরা কেন দ্বন্দ্বে জড়াব।’
এরপর ওমর ফারুক বলেন, ‘যখন তিনি ক্ষমতায় ছিলেন, তখন কি খবর নিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা বারের। আইনজীবীরা তো ভালোই ছিল। কিন্তু নির্বাচনের সময় সিল মেরে ভোট নিয়ে গেছে, আইনজীবীদের মারধর করেছে। তখন তিনি কী ভূমিকা নিয়েছিলেন।’
আমু বলেন, ‘প্রথমবার যখন গোলমাল হয়, আমি এর বিরোধিতা করি। ভোট দিতে আসিনি, বয়কট করেছি।’



