নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের ৫টি ওয়ার্ডের ১১টি পাড়ায় টর্নেডো আঘাত করেছে। এতে অন্তত ৫ শতাধিক বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার গাছপালা ভেঙে পড়েছে। এছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। আজ রোববার সকালে এই ঝড় হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলা শহরের ডিসির মোড় এলাকায় রাস্তায় বড় গাছ ভেঙে পড়েছে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্ন ঘটেছে। বিভিন্ন জায়গা ঘরের ওয়াল ও চালা চাপা পড়ে অন্তত ৮টি গরু মারা গেছে। এছাড়া গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গুরুতর আহত গুলসান নামে এক মহিলাকে রংপুর মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা প্রদানসহ উদ্ধার কাজে একাধিক টিম কাজ করছে। এছাড়া ১০ হেক্টর জমির জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ১ হাজার পরিবার অন্ধকারে রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার সকাল ৯টায় ভারী বৃষ্টির সময় কিশোরগঞ্জ উপজেলার গাড়াগ্রাম ইউননিয়নের মাঝাপাড়ায় ঝড় আঘাত করে। মাঝাপাড়া হতে বাবুর পাড়া পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকায় ঝড়ের আঘাতে ৫টি ওয়ার্ডের মাঝাপাড়া, বানিয়াপাড়া, হাজীপাড়া, উত্তরপাড়া, পোদ্দারপাড়া, জিকরুল মেম্বারের পাড়া, বাবুপাড়া, চেয়ারম্যানের পাড়া, বৈরাগীপাড়া, মুন্সিপাড়া, কালিরথানসহ বেশ কয়েকটি পাড়ার ৫ শতাধিক পাঁকা ও কাচা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। ঝড়ের কবলে হাজার হাজার গাছ পালা ভেঙে পড়েছে। অসংখ্য গাছ পাঁকা রাস্তার ওপরে পড়ে থাকায় কিশোরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দুর্গত এলাকায় ঢুকতে হিমশিম খাচ্ছে। মানুষের চলাচলে ব্যাহত হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন লিডার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে রাস্তার ওপর পড়ে থাকা গাছ অপসারণ করা যাচ্ছে না। তারা চেয়ারম্যান ও মেম্বারসহ স্থানীয়দের সাহায্য নিচ্ছে কাঠুরিয়াদের এগিয়ে আসার জন্য।
এলাকাবাসী জানান, প্রায় ২ মিনিটের ঝড়ে গ্রামগুলো তছনছ হয়ে গেছে। বাড়ি ঘরের টিনগুলো উড়ে গাছে ও বাঁশ বাগানে ঝুলে আছে। ঝড়ের আঘাতে অন্তত ৫০ ব্যক্তি আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজন হলেন- ডিসির মোড়ের আলতাবের ছেলে তাইফুল (৩০), একই এলাকার আব্দুলের ছেলে তাসিন (২৫), হাছানের ছেলে রয়েল (৩০), মফিজারের স্ত্রী গুলছান (৪০) ও আব্দুল মান্নানের ছেলে আতিক (২২)। আহতরা কিশোরগঞ্জ হাসপাতালসহ হাসপাতালের মেডিকেল টিমে চিকিৎসা নেয়। অন্যদিকে ৮টি গুরু মারা যাওয়াসহ অসংখ্য গবাদীপশু আহত হয়েছে। গবাদীপশুগুলোর প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য কিশোরগঞ্জ প্রাণী সম্পদ দপ্তরের একটি টিম কাজ করছে।
এদিকে রাস্তার ওপর গাছপালা পড়ে থাকার কারণে গাড়াগ্রাম ডিসির মোড় পার হয়ে ভেতরে ঢুকতে পারছে না উদ্ধারকারী দল। সবজি, ধান ও কলার প্রায় ১০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ে পল্লী বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে যাওয়াসহ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রায় ১ হাজার গ্রাহক অন্ধকারে রয়েছে।
স্থানীয় ইউপি মেম্বার মোফাজ্জল বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডেই প্রায় ২ শতাধিক ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। অনেক গাছ উপরে পড়েছে। খোলা আকাশের নিচে অনেকে আছে। ৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ১ শত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ডিসির মোড় মুন্সিপাড়ার আব্দুল বাকির একটি, চেয়ারম্যানপাড়ায় ওয়াল ভেঙে ফরহাদের ৩টি গুরু মারা যাওয়াসহ প্রায় ৮টি গরু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।’
গাড়াগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান মো. জোনাব আলী জানান, গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের ৫টি ওয়ার্ডেও অন্তত ১২টি পাড়ায় টর্নেডোয় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি নিরূপণ ও উদ্ধার কাজ চলছে। খোলা আকাশের নিচে অনেকে বসবাস করছে। টর্নেডোয় ঘরবাড়ি উড়ে যাওয়াসহ পাঁকা বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডা. নীল রতন দেব জানান, আবাসিক মেডিকেল অফিসারের নেতৃত্বে চিকিৎসা টিম পাঠানো হয়েছে। অন্তত ৫০ জনকে চিকিৎসা প্রদানসহ গুলছান নামে একজন গুরুতর আহত হওয়ায় রংপুর মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার লোকমান আলম বলেন, টর্নেডোয় ৩ হেক্টর কলা, সবজি খেত ২ হেক্টর ও ৫ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ অফিস কিশোরগঞ্জের এজিএম রোমান ইসলাম বলেন, টর্নেটোয় তার ছিঁড়ে যাওয়াসহ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। গাড়াগ্রামে ১ হাজার পরিবার অন্ধকারে রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে কাজ করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রীতম সাহা বলেন, ‘টর্নেডোর খবর পেয়ে সেখানে কয়েকটি মেডিকেল টিম, প্রাণিসম্পদ বিভাগের টিম, কৃষি বিভাগের টিম এবং উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস টিম পাঠানো হয়েছে। একজন গুরুতর আহতকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অনেক প্রাণীর ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ঘরবাড়ি তছনছ হওয়াসহ ব্যাপক ক্ষতির খবর পেয়েছি। উদ্ধার কাজসহ ক্ষতি নিরূপণে কাজ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনো খাবার সরবরাহ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিক উপজেলা প্রশাসনসহ সকল বিভাগ টর্নেডো এলাকায় কাজ করছে।’



