
দড়াবাজি বললে হয়তো চোখ কপালে উঠবে। কিন্তু গ্রামবাংলার উৎসব-পার্বণে এটি এক পরিচিত নাম। সহজ করে বললে—সার্কাস, বা আধুনিক ভাষায় অ্যাক্রোবেটিক। বিনোদনের এই পুরনো অনুষঙ্গ এখন শুধু গ্রামেই নয়, দেখা মেলে এই প্রাণঘন ভিড়ের শহরেও। আর এই ধারাবাহিকতার পেছনে বড় কারণ—বাংলাদেশ সরকার।
গত এক যুগ ধরে দেশের প্রায় সব জেলায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি নিয়মিত আয়োজন করে আসছে এই খেলার প্রদর্শনী। কিন্তু এই মুন্সিয়ানার পেছনে রয়েছে এক বন্ধুদেশের অকুণ্ঠ সহায়তা—চীন।
বাংলাদেশ-চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর যখন উদ্যাপনমুখর, ঠিক তখনই নতুন করে আলোচনায় এলো এই অ্যাক্রোবেটিক।
কারণ, মাত্রই ২৫ জনের একটি দল চীন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরেছে ঢাকায়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে সে দেশ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিল্পীর সংখ্যা এখন প্রায় ৫০। তারা এখন রোলার রিং, জ্যাম রোপ, রাউন্ড ফায়ার ড্রাম ব্যালেন্স, দিয়াবো—এমন অন্তত ১২টি দড়াবাজির ধরন দেখান।
যেভাবে শুরু অ্যাক্রোবেটিকের পথচলা
১৯৯৪ সালে রাজবাড়ীতে শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের প্রথম অ্যাক্রোবেটিক ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন কোরিয়ান প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তখন গড়ে ওঠে মূল দলটি। সরকারি বরাদ্দ ছিল, নিয়মিত প্রশিক্ষণও চলত।
কিন্তু ২০০০ সালের শুরুর দিকে সেই ধারায় ধাক্কা লাগে। বন্ধ হয়ে যায় সরকারি-বেসরকারি আর্থিক সহায়তা। ফলে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমী শিল্পীরা জীবিকার তাগিদে দোকান বা কারখানায় কাজ শুরু করতে বাধ্য হন।
পরিস্থিতি পাল্টায় ২০১১ সালে। শিল্পকলা একাডেমি আবারও রাজবাড়ীর দলটিকে পুনরুজ্জীবিত করে, গঠন করে ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি অ্যাক্রোবেটিক ট্রুপ’। কিন্তু প্রশিক্ষণের ঘাটতি থেকেই যায়। প্রয়োজন ছিল আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা। ঠিক তখনই যোগ হয় চীনের সহযোগিতা—নতুন গল্পের শুরু সেখানেই।
যাত্রার সময়রেখা
প্রথম সফর
১০ শিক্ষার্থী • ১২ মাস • প্রশিক্ষক ১: সঞ্জয় কুমার ভৌমিক
দ্বিতীয় সফর
১০ শিক্ষার্থী • ১২ মাস • প্রশিক্ষক ১: জালাল উদ্দিন
তৃতীয় সফর
২৩ জন শিক্ষার্থী • ২ মাস • প্রশিক্ষক ২: জালাল উদ্দিন ও হাবিবুর রহমান বাবু
চতুর্থ সফর
২২ জন শিক্ষার্থী • ২ মাস • প্রশিক্ষক ২: জালাল উদ্দিন ও হাবিবুর রহমান বাবু
চৈনিক আলোয় নতুন অধ্যায়
নানা আর্থিক ও পরিবেশনার সহযোগিতা থাকলেও শিল্পীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, নিত্যনতুন কৌশল ও দক্ষতা বৃদ্ধি। যেন আন্তর্জাতিক অ্যাক্রোবেটিকের সঙ্গে এর একটা যোগসূত্র তৈরি হয়।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে চীনের বেইজিংয়ে যায় ১০ শিশু কিশোর ও ১ জন প্রশিক্ষক। টানা ১ বছর সেখানে চলে তাদের প্রশিক্ষণ। এর পরের বছর আরও ১০ শিশু কিশোর ও ১ জন প্রশিক্ষক যান চীনে। তারাও ১ বছর ধরে প্রশিক্ষণ নেয়। প্রশিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ই চীন থেকে পান প্রশিক্ষণ।
প্রথম ব্যাচের সদস্য আশিকুর রহমান তখন কিশোর। এখন তিনি পূর্ণাঙ্গ অ্যাক্রোবেটিক শিল্পী।
ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে তিনি বলেন, ‘বিশ্বে অ্যাক্রোবেটিক কত জনপ্রিয়, বাংলাদেশে অনেকে জানেই না। বিশেষ করে চীন তো বিশ্বসেরা দেশের একটি। সেখানকার মানুষরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে এটা দেখে। কিন্তু আমাদের দেশে তেমন একটা আগ্রহ এখনও তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সে কারণেই এ প্রশিক্ষণ নিতে চীনে যাওয়া। টানা এক বছর আমরা সেখানে প্রশিক্ষণ নিই। সপ্তাহে ৪ দিন আমাদের প্রশিক্ষণ হতো। বাকি দু দিন হাফ ডে ভাষা শিক্ষতাম ও অ্যাক্রোবেটিস প্রশিক্ষণ নিতাম। আমরা চায়না ভাষা ও তাদের সংস্কৃতি জানার চেষ্টা করতাম।’
তিনি জানান, দেশে ফিরে সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দিচ্ছেন সারা দেশে, জেলা থেকে জেলায়।
ট্রেনিংপ্রাপ্তদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা
| সফর | লোকসংখ্যা | সময় | তালিকা |
|---|---|---|---|
| ২০১৬-১৭ | ১১ | ১ বছর | ক্লিক করুন |
| ২০১৭-১৮ | ১১ | ১ বছর | ক্লিক করুন |
| ২০২৪ | ২৫ | ২ মাস | ক্লিক করুন |
| ২০২৫ | ২৪ | ২ মাস | ক্লিক করুন |
প্রথম দলে প্রশিক্ষক হিসেবে চীন গিয়েছিলেন সঞ্জয় কুমার ভৌমিক। তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অ্যাক্রোবেটিক প্রশিক্ষকও। এ প্রশিক্ষণ বৃত্তিগুলো সম্পর্কে তিনি বেশ ওয়াকিবহাল।
তিনি জানান, ‘এ পর্যন্ত চারটি দল চীনে গেছে। প্রথম দুটি ব্যাচ এক বছর করে প্রশিক্ষণ নিয়েছে—১১ জন করে মোট ২২ জন। পরের দুই ব্যাচ পেয়েছে দুই মাসের প্রশিক্ষণ। ২০২৪ সালে ২৩ জন শিক্ষার্থী ও ২ জন প্রশিক্ষক, ২০২৫ সালে ২২ শিক্ষার্থী ও ২ জন প্রশিক্ষক চীন গিয়েছেন। এরা সবাই এখন প্রশিক্ষক হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ করছেন।’
বন্ধুত্বের শিল্প-সেতু
এ সফরগুলোতে প্রশিক্ষক হিসেবে শিশুদের সঙ্গে বেশিরভাগ সময় গেছেন জামাল উদ্দিন নামের শিল্পকলার আরও এক প্রশিক্ষক। সবশেষ ১ অক্টোবর টিম নিয়ে দেশে ফিরেছেন।
জালাল উদ্দিন বলেন, ‘চীনের এ প্রশিক্ষণে মূলত শিশুদের চোখ খুলে দেয়। তারা এতটা ভালো প্রশিক্ষণ পায় যে, পরবর্তী সময়ে এ চর্চা কাজে লাগিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পারফর্ম করে। অনেকই এখন ভালো প্রশিক্ষকও।’
এই প্রশিক্ষক জানান, শুধু শিক্ষার্থীই নয়, প্রশিক্ষকের জন্য এই ট্যুরগুলো বেশ ভালো সুযোগ। এখন অবধি ৩জন প্রশিক্ষক চীনে গিয়েছেন।
জালাল উদ্দিন জানান, রাজবাড়ীতে প্রতিদিনই তিনি প্রশিক্ষণ দেন। এতে যেমন থাকেন পুরনোরা তেমনি প্রতি বছরই নতুন নতুন অ্যাক্রোবেটিক শিল্পী বেরিয়ে আসছে।
শুধু বাংলাদেশি শিশু-কিশোরই চীন দেশে যাচ্ছে তা নয়, কিছু সময় অন্তর অন্তর চায়নার অ্যাক্রোবেটিক টিমও বাংলাদেশে আসে। দুই দেশের এমন বন্ধুত্বপূর্ণ আদান প্রদান নিয়ে কথা হয় ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের কালকারাল সেক্রেটারির মি. সুনের সঙ্গে। মি. সুন ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘প্রতি বছর চীনা অ্যাক্রোবেটিক দল বাংলাদেশে আসে না, তবে বছরে দুই-তিনটি সাংস্কৃতিক দল আসে। তাদের মধ্যে প্রায়ই অ্যাক্রোবেটিক দলও থাকে। গত দশকে গড়ে প্রতি দুই-তিন বছরে একটি-দুটি অ্যাক্রোবেটিক দল বাংলাদেশে এসেছে। তারা প্রদর্শনী ছাড়াও প্রশিক্ষণমূলক কাজে অংশ নেয়।’
২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে দুটি বাংলাদেশি দল চায়নায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এ কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ ছিল। চাইনিজ শিল্পীরা আসলেও বাংলাদেশিরা প্রশিক্ষণ নিতে যাননি।
গত বছর নতুন করে শুরু হয় এই কার্যক্রম। ফলশ্রুতিতে গত দুই বছরে আরও দুটি দল প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরল।
নতুনভাবে শুরুর বিষয়ে মি. সুন বলেন, ‘১ দশক আগে দুটি দলকে প্রশিক্ষণ দিলেও এখন কিছু জটিলতা সামনে এসেছে। অনেকের বয়স হয়েছে, নারী শিল্পীরা বিয়ে করেছেন—তারা মঞ্চে উঠতে চান না। তাই সে সময়কার শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক আমাদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার কথা বলেন। তিনি বলছিলেন, ‘নতুন কিছু শিল্পী প্রয়োজন।’ বলেন যে, এ ক্ষেত্রে চীনের সহায়তা দরকার। প্রতি বছরই অল্প সময়ে জন্য হলেও যেন এটা (প্রশিক্ষণ) করা হয়। বন্ধু দেশ হিসেবে আমরা চেষ্টা করছি সহায়তা করতে।’
নতুন প্রজন্মের হাতে পুরনো শিল্প
২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের পর প্রায় এক দশক বন্ধ ছিল চীন সফর ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। পুনরায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুইটি নতুন দল পাঠানো হয়। তাদের হাতেই এখন এই প্রাচীন শিল্পের পুনর্জন্ম।
গ্রামের মেলা থেকে শহরের মঞ্চ পর্যন্ত, বাংলাদেশের অ্যাক্রোবেটিক এখন নতুন প্রাণ পেয়েছে। সেটাই ছড়িয়ে দেওয়ার বার্তা দিলেন শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক দীপক সুমন। জানালেন, আগামী জুনের মধ্যে ঢাকা শহরে ৫০টি শো ও সারাদেশে ১৫০টি শো করতে চান এই সব প্রশিক্ষিত শিল্পীদের নিয়ে। যেখানে দেশীয় আমেজে উঠে আসবে আন্তর্জাতিক মানের এই শিল্পচর্চা।


হয়ে গেল বাংলাদেশ-চীন সংগীত প্রতিযোগিতা
