দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার জঙ্গল থেকে নতুন এক প্রজাতির বুনো বিড়ালের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী কারেন্ট বায়োলজি-তে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন আবিষ্কৃত এই প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে লিওপার্ডাস টিলকাইও বা ‘টিলকায়া বিড়াল’।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, আবিষ্কার হওয়া প্রাণীটি আকারের দিক থেকে প্রায় সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের মতোই ছোট। শরীরে দাগ ও ডোরাকাটা প্যাটার্ন থাকায় এতদিন এটি অন্য বুনো বিড়ালের সাথে গুলিয়ে ফেলা হতো। তবে সাম্প্রতিক ডিএনএ বিশ্লেষণে ধরা পড়েছে যে, এটি সম্পূর্ণ নতুন এবং স্বতন্ত্র এক প্রজাতি।
বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া ছোট বুনো বিড়াল বা ‘টাইগার ক্যাট’-এর প্রজাতি এতদিন তিনটি বলে মনে করা হতো। তবে সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে এ জাতীয় বিড়ালের প্রজাতি অন্তত পাঁচটি। সিংহ, বাঘ বা চিতাবাঘের মতো বড় বিড়ালজাতীয় প্রাণীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশি প্রচার পেলেও, পরিবেশগত কারণে এসব ছোট বুনো বিড়ালও বিলুপ্তির মুখে রয়েছে।
নতুন এই প্রজাতি আবিষ্কারের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে ‘টিগ্রিনো’ নামের ১০ বছর বয়সী এক বিড়াল। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলিভিয়ার জঙ্গল থেকে সেটিকে কুড়িয়ে পেয়ে গৃহপালিত বিড়ালের ছানা ভেবে লালন-পালন শুরু করেন। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর আচরণে বুনো বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়। পরবর্তীতে সেটিকে বলিভিয়ার এক বন্যপ্রাণী উদ্ধারকেন্দ্রে পাঠানো হয়।
সেখানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কর্মরত বলিভীয় বিজ্ঞানী ড. পাওলা নোগালেস-আসকারুঞ্জ বিড়ালটির শারীরিক গঠনে কিছু অস্বাভাবিকতা দেখতে পান। এরপর তিনি বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাথে মিলে বিড়ালটির ডিএনএ পরীক্ষা শুরু করেন। জীবিত বিড়াল ও বিভিন্ন মিউজিয়ামে রাখা নমুনায় সংগৃহীত ডিএনএ বিশ্লেষণ করেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটি সম্পূর্ণ আলাদা এক প্রজাতি।
ড. নোগালেস-আসকারুঞ্জ বলেন, ‘বিশ্বের জন্য লিওপার্ডাস টিলকাইও নামের নতুন একটি প্রজাতি খুঁজে পাওয়া এক রোমাঞ্চকর সাফল্য। এখনো যে অনেক নতুন প্রজাতি মানুষের আড়ালে রয়ে গেছে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ। আর এর জন্য আমাদের আগ্নেয়গিরি, দুর্গম দ্বীপ বা সমুদ্রের গভীরে যেতে হয়নি।’
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে বিড়াল পরিবারের অধীন স্বীকৃত প্রজাতির সংখ্যা ৪১। গবেষকদের ধারণা, নতুন এই আবিষ্কার এবং টাইগার ক্যাটের নতুন প্রজাতি নিশ্চিত হওয়ার পর এই সংখ্যা বেড়ে ৪৪ থেকে ৪৫-এ পৌঁছাবে।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন রিসার্চ ইউনিটের সহ-গবেষক ড. ক্যারোলিন সার্টর জানান, প্রজাতি চিহ্নিত করাটা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রথম ধাপ। কারণ কোনো প্রাণী কোথায় থাকে বা তা কী প্রজাতি, সেটা নিশ্চিত না হয়ে তাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। বনভূমি ধ্বংস, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং বেআইনি শিকারের কারণে এই প্রজাতিটি মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
বর্তমানে নতুন এই প্রজাতির জানা থাকা একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে বলিভিয়ার ওই উদ্ধারকেন্দ্রের বিড়ালটিই রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, বলিভিয়ার ঘন উংগাস অঞ্চলে এবং আশেপাশে এই প্রজাতির আরও অনেক বুনো বিড়াল এখনো মুক্ত অবস্থায় বেঁচে রয়েছে।



