জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রধান বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি ও মৃত্তিকাব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুর পুষ্টি ও স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই সংকট মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, বহুখাতভিত্তিক, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু অভিযোজন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার।
শনিবার রাজশাহীর সিটি কনভেনশন হল ইউরিচ-এ অনুষ্ঠিত ‘উচ্চপর্যায়ের নীতি সংলাপ: জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ—বরেন্দ্র অঞ্চল বাঁচান’ সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য হাবিবা মাহমুদা, সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এবং সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়া সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, গবেষক, বিশেষজ্ঞ, উন্নয়নকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা সংলাপে অংশগ্রহণ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি এখন মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং মানবাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বহুমাত্রিক সংকট।
তিনি বলেন, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়া, নদী-খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাধারের সংকট, মাটির আর্দ্রতা হ্রাস এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুধু কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে না, কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, ফসলহানির ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দরিদ্র কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের ঝুঁকিও বাড়ছে।
জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরে ড. হায়দার বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের জলবায়ু সংকটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
দীর্ঘস্থায়ী খরা ও পানির সংকট নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা কমিয়ে দেয় এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখাকে কঠিন করে তোলে। অন্যদিকে অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ কৃষক, কৃষিশ্রমিক, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, কৃষি উৎপাদন ও পারিবারিক আয় কমে গেলে দরিদ্র পরিবারগুলোর খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য হ্রাস পায়। এর ফলে গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের অপুষ্টি, শিশুদের অপুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তিনি এ অঞ্চলে শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃ ও শিশু পুষ্টিসেবা, তাপপ্রবাহজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং কমিউনিটিভিত্তিক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ড. হায়দার বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিগত অঙ্গীকার করেছে।
তিনি বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পানি সংকট নিরসনে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্য ভূমিকা, নদী-খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং পৃষ্ঠস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহারকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং পানির প্রাপ্যতা ও সংরক্ষণের ধরনে পরিবর্তন ঘটছে, যা বিভিন্ন সংক্রামক ও বাহকবাহিত রোগের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে সরকারের কমিউনিটিভিত্তিক ডেঙ্গু নির্মূল উদ্যোগের সঙ্গে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সংলাপে ড. হায়দার বরেন্দ্র অঞ্চলের জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ছয়টি অগ্রাধিকারভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
১. বিশেষ বরেন্দ্র জলবায়ু অভিযোজন নীতিমালা: বরেন্দ্র অঞ্চলের ভৌগোলিক, মৃত্তিকা, কৃষি, পানিসম্পদ ও জনস্বাস্থ্যগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পৃথক আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন।
২. সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ, পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, নদী-খাল-বিল-পুকুর পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ নিশ্চিত করা।
৩. জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও কৃষক সুরক্ষা: খরাসহিষ্ণু ও কম পানিনির্ভর ফসল সম্প্রসারণ, আধুনিক সেচপ্রযুক্তি, কৃষকদের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা এবং ফসলহানির ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি বীমার সম্ভাবনা বিবেচনা।
৪. নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সুরক্ষা: নিরাপদ পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃ ও শিশু পুষ্টিসেবা, তাপপ্রবাহ মোকাবিলা এবং জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করা।
৫. গবেষণা, তথ্যব্যবস্থা ও আগাম সতর্কতা: খরা, তাপপ্রবাহ, ভূগর্ভস্থ পানি, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি পর্যবেক্ষণের জন্য সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৬. জলবায়ু অর্থায়ন ও জবাবদিহি: জাতীয় বাজেটে বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থায়ন সংগ্রহ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায্য অর্থায়ন, নিরাপদ পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার অধিকার এবং নীতিনির্ধারণে স্থানীয় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তরবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি, ক্ষয়ক্ষতি এবং ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়নের দাবি তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে বরেন্দ্রের মতো বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য কার্যকর অভিযোজন কর্মসূচি গ্রহণও জরুরি।
তিনি নীতি সংলাপের আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের প্রতি আহ্বান জানান, এই সংলাপ যেন কেবল আলোচনা ও সুপারিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং এখান থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য একটি বাস্তবায়নযোগ্য, অর্থায়নযোগ্য ও ফলাফলভিত্তিক সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।


