সড়কে আইন না মানা এবং ট্র্যাফিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এই দুই সমস্যা এখন নিত্যদিনের চিত্র। অবৈধ যানবাহন চালানো, সিটবেল্ট বা হেলমেট ছাড়া চলা, অতিরিক্ত গতি, ট্র্যাফিক সিগন্যাল ভঙ্গ, মাদকাসক্ত অবস্থায় ড্রাইভিং এসব আচরণ শুধু দুর্ঘটনা ঘটায় না, বরং হাজারো মানুষের জীবন কেড়ে নেয়।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের গত জুলাই মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৪৩টি, নিহত ৪১৮ জন এবং আহত ৮৫৬ জন। এর মধ্যে ১৩১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১০৯ জন, যা মোট নিহতের ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ২৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। নিহতের মধ্যে নারী ৭২ (১৭ দশমিক ২২ শতাংশ), শিশু ৫৩ (১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ)। দুর্ঘটনায় ৯২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২২ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৬ জন, অর্থাৎ ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৬ হাজার ৩৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৫৪৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬০৮ জন। এছাড়া ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। এসব দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ১৫১ জন আহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং মোট আহতের ২৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
এসব দুর্ঘটনার বড় একটি অংশ সরাসরি ট্র্যাফিক আইন অমান্য করার ফলে ঘটে। কিন্তু যারা আইন প্রয়োগের দায়িত্বে আছেন, যেমন ট্র্যাফিক পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের মধ্য থেকেও মাঝে মাঝে বেআইনি আচরণের অভিযোগ আসে। সড়কে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার, অযৌক্তিক জরিমানা, ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া এবং হয়রানি এসব ঘটনা জনগণের আইনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়।
সড়ক আইন না মানার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী–
- ট্র্যাফিক সিগন্যাল ভঙ্গ – জরিমানা ৫০০ টাকা বা সর্বোচ্চ ৭ দিনের কারাদণ্ড।
- হেলমেট বা সিটবেল্ট না পরলে – জরিমানা ১ হাজার টাকা।
- অতিরিক্ত গতি – জরিমানা ১,০০০–৫,০০০ টাকা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল।
- মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো – সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানা
- অবৈধ যানবাহন চালালে – ৬ মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানা।
এই শাস্তির উদ্দেশ্য শুধু অপরাধ দমন নয়, বরং দুর্ঘটনা কমিয়ে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা।
পুলিশি হয়রানি: ক্ষমতার অপব্যবহার
যদিও ট্র্যাফিক পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কাজ করে, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তারা নিজ ক্ষমতা অতিক্রম করে বেআইনি আচরণ করে থাকে। যেমন—
- অকারণ গাড়ি আটকানো।
- মিথ্যা অভিযোগে জরিমানা চাপানো।
- ‘মুক্তিপণ’ আদায়ের চেষ্টা।
- যাত্রী বা চালকের সাথে অশোভন আচরণ বা অপমান।
- অপরাধী হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া।
এসব আচরণ আইন প্রয়োগের ন্যায়বিচারমূলক চেতনার পরিপন্থি এবং সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন।
পুলিশি হয়রানির শিকার হলে করণীয় হলো–
১. প্রমাণ সংগ্রহ
- ঘটনার তারিখ, সময় ও স্থান নোট করুন।
- সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের নাম, ব্যাজ নম্বর বা পরিচয় সংগ্রহ করুন।
- সম্ভব হলে ছবি বা ভিডিও নিন।
- প্রত্যক্ষদর্শীর নাম ও যোগাযোগ নিন।
২. থানায় লিখিত অভিযোগ (FIR)
- স্থানীয় থানায় সরাসরি গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করুন।
- অভিযোগ গ্রহণ না করলে পুলিশ সুপার বা ডিআইজি অফিসে লিখিত আবেদন করুন।
৩. মানবাধিকার সংস্থায় অভিযোগ
- বাংলাদেশ পুলিশ হিউম্যান রাইটস সেল।
- জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।
- স্থানীয় এনজিও বা আইন সহায়তা সংস্থা।
৪. মামলা দায়ের
- প্রশাসনিক বা ফৌজদারি মামলা করতে পারেন।
- ক্ষতিপূরণের জন্য সিভিল মামলা দায়েরের সুযোগ আছে।
মামলা করার ধাপ
১. প্রাথমিক অভিযোগ (FIR) – থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিন।
২. আইনজীবীর সহায়তা নিন – মামলার খসড়া প্রস্তুত করুন।
৩. প্রমাণ পেশ করুন – ভিডিও, ছবি, সাক্ষীর বিবৃতি আদালতে উপস্থাপন করুন।
৪. মামলার অগ্রগতি মনিটর করুন – আইনজীবীর মাধ্যমে নিয়মিত শুনানিতে অংশগ্রহণ করুন।
উল্লেখযোগ্য উদাহরণ
২০২২ সালে ঢাকায় এক মোটরসাইকেল চালককে লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও ট্র্যাফিক পুলিশ আটকিয়ে জরিমানা করে। ভুক্তভোগী প্রমাণসহ মামলা করেন এবং আদালত পুলিশ সদস্যকে ব্যক্তিগত জরিমানা ও শাস্তি প্রদান করে। এই মামলা দেখায়—প্রমাণ থাকলে আইন সাধারণ নাগরিকের পক্ষেও কাজ করে।
আইনজীবীদের মতামত
অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির (ঢাকা জেলা আদালত) ট্র্যাফিক আইন ভঙ্গের শাস্তি জরুরি, কিন্তু পুলিশি হয়রানি রোধে সুপারভিশন আরও কড়া হওয়া দরকার। বিশেষ করে ট্র্যাফিক চেকপোস্টে সিসিটিভি রেকর্ড বাধ্যতামূলক করা উচিত।
অ্যাডভোকেট শারমিন জাহান (সুপ্রিম কোর্ট) পুলিশি হয়রানির মামলা প্রমাণ করা অনেক সময় কঠিন হয়, কারণ সাধারণ মানুষ প্রমাণ সংগ্রহে আগ্রহী থাকে না। তবে প্রযুক্তি ব্যবহার করলে প্রমাণ সহজ হবে।
অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল হক জানান, অভিযোগ পেলে আদালত দ্রুত শুনানি দিলে হয়রানিকারী সদস্যরা ভয় পাবে। প্রশাসনিক শাস্তির পাশাপাশি ফৌজদারি শাস্তি প্রয়োগও জরুরি।
সচেতনতার গুরুত্ব
- ট্র্যাফিক আইন মেনে চলা নিজের নিরাপত্তার জন্য জরুরি।
- পুলিশি হয়রানির শিকার হলে ভয় না পেয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
- সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘটনা প্রচার করলে জনমত তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে এই সমস্যা কমে।
- ড্রাইভার, যাত্রী, পথচারী—সবাইকে আইন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
সড়ক আইন লঙ্ঘন ও পুলিশি হয়রানি দুটোই সমানভাবে সমাজের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব, সড়কে আইন মেনে চলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। আইন সম্পর্কে সচেতনতা ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা গেলে, আমরা একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক সড়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারব। আইন মানুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান আইনই আপনার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা।
লেখক: শিক্ষানবিশ আইনজীবী



