এক দিন বা দুই দিন নয়, টানা ৩২ দিন যেন এক ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে কেটেছে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের নাবিকদের। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে অনেকটা বিচ্ছিন্ন নাবিকেরা প্রতিক্ষণেই গুণেছেন মৃত্যুর প্রহর। ভারী অস্ত্রের মুখে জলদস্যুদের অব্যাহত হুমকির ভেতর কাটানো দুঃসহ সেই স্মৃতি পিছু ছাড়েনি মুক্তির পরও। আজ মঙ্গলবার দেশের মাটিতে নেমে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও মানসিক ট্রমা থেকে বের হতে পারেননি তাঁরা।
দেশে ফিরে নাবিকেরা জানিয়েছেন, অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটিকে কব্জায় নিয়েছিল দস্যুরা। জাহাজের ব্রিজে উঠেই চার জলদস্যু ভারি অস্ত্র নিয়ে প্রথমেই জিম্মি করেছিল জাহাজের সেকেন্ড অফিসারকে। মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে অন্য নাবিকদের ডেকে পাঠানো হয় বেতার যন্ত্রে। জাহাজের ক্রু-লিস্ট ধরে যাচাই করে সবাইকে ব্রিজেই আটকে রাখে টানা দুইদিন। এসময় সাহরি ও ইফতারে দস্যুদের দেওয়া সামান্য খাবারই ছিল ভরসা।
এর ভেতর আশপাশে অন্যকোন জাহাজ এলেই নাবিকদের দাঁড় করিয়ে মেরে ফেলার অব্যাহত হুমকি দিয়েছে দস্যুরা। বাইরের জগতে কী চলছে, তা শুধু কল্পনাই করে গেছেন নাবিকরা।
এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের সেকেন্ড অফিসার মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘শুরুতে দস্যুরা ব্রিজে উঠে আমার মাথায় অস্ত্র তাক করে। তারপর আমাকে বলে ক্যাপ্টেনকে ডেকে আনো। আমি ওয়াকিটকিতে ক্যাপ্টেনকে ডেকে আমাকে জিম্মি করার কথা জানাই। উনি আসলে তাঁর দিকেও অস্ত্র তাক করে ক্রু লিস্ট চায় দস্যুরা। লিস্ট ধরে সবাইকে ডেকে আনার কথা বলে। তারপর ক্যাপ্টেন সবাইকে ব্রিজে আসতে বললে দস্যুরা হেট কাউন্ট করে।’
নাবিকেরা জানান, নিজেদের নিরাপদ জোনে গিয়ে ধীরে ধীরে নাবিকদের সঙ্গে কিছুটা নমনীয় হয় দস্যুরা। কিন্তু বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারে ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। লুকিয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিজের জীবন হাতে নিতে হয়েছে তাঁদের।
এদিকে মালিকপক্ষের সাথে দস্যুদের যোগাযোগের ব্যাপারেও অন্ধকারে ছিল নাবিকেরা। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান যেদিন হলো, সেই মুক্তির পর দ্রুত দস্যু কবলিত এলাকা পার হওয়াটাও ছিল ভীষণ দুশ্চিন্তার।
এ প্রসঙ্গে জাহাজের সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্ত হওয়ার পর দ্রুত জলদস্যু প্রবণ এলাকা থেকে বের হয়ে আসাটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা দ্রুত গতি বাড়িয়ে বের হয়ে আসার চেষ্টা করেছি।’
পুরো সময়জুড়ে সরকার, বিমা, আর্ন্তজাতিক নিরাপত্তা বাহিনী, বিভিন্ন মেরিটাইম সংস্থার সাথে নিবিড় যোগাযোগ করতে হয়েছে জাহাজটির মালিকপক্ষকে। দস্যুদের সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষেত্রেও নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক খেয়াল রাখতে হয়েছে।
এস আর শিপিংয়ের প্রধান নির্বাহী মেহেরুল করিম জানান, জিম্মি দশার পর থেকে বিভিন্ন পক্ষের সাথে আলোচনা করতে হয়েছে। এটা খুব কঠিন কাজ ছিল। সবশেষে সব ক্রু নিরাপদে আসতে পেরেছে, সেটাই বড় বিষয়।
২০১০ সালেও কবির গ্রুপের আরেকটি জাহাজ সোমালীয় দস্যুদের কবলে পড়েছিল। সেটি উদ্ধার করতে সময় লেগেছিল ১০০ দিন।
আরও পড়ুন:
- অডিওবার্তায় নাবিক–‘সাহরির জন্য সামান্য খাবার দিয়েছে’
- গারাকাড উপকূলের আরও কাছে ছিনতাই হওয়া বাংলাদেশি জাহাজ
- জলদস্যুর কবলে পড়া বাংলাদেশি জাহাজের অবস্থান শনাক্ত
- নোয়াখালীর সালেহ আহমদকে ফেরত চায় পরিবার
- জলদস্যুদের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ হয়নি: বিএমএমওএ
- নাবিক সাইদুজ্জামানের মায়ের নির্ঘুম চোখে শুধুই সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি
- জলদস্যুদের হাতে বন্দি তারেকুল মা-বাবার আহাজারি
- একমাস আগে বাবা মারা যায় নাবিক আইয়ুবের, ছেলের চিন্তায় মায়ের আর্তনাদ



