বাবা বেঁচে আছেন, নাকি নেই, জানেন না সন্তান। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও, বাবার নামের পাশে ‘জীবিত’ না ‘মৃত’ কোনটা লিখবেন, সেই সিদ্ধান্তও নিতে পারছেন না তিনি। গত দেড় যুগে আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুমের শিকার পরিবারগুলোর বড় প্রশ্ন, কি ঘটেছিল তাদের প্রিয়জনের সঙ্গে? বিচার হবে কবে? তাই আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে নতুন করে সামনে এসেছে ক্ষমতার জবাবদিহিতা, সুষ্ঠু বিচার ও ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধের প্রশ্ন।
বাবা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই আনিশা ইসলাম ইনশার। নথিপত্রে বাবাকে মৃত নাকি জীবিত লিখবেন, বলতে পারছেন না কেউ?
ইনশা বলছিলেন, ‘আমার ভাই আমাকে বারবার বলছিল, আপু ছবিটা ওপরে তুলে ধরো। আঙ্কেলরা বাবাকে খুঁজে দেবে। এখন আর ও জিজ্ঞেস করেনা, বাবা কোথায়।’
মিরপুরের কাঠ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বাতেন গুম হন ২০১৯ সালে। ৭ বছর ধরে তার ফেরার অপেক্ষায় পরিবার।
ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরীন জাহান স্মৃতি বলেন, ‘তার খোঁজে আজকেও দাঁড়িয়েছি। আমরা চাই না পরের বছর আবার দাঁড়াতে। এটার একটা সমাধান হোক। গুমের বিচার করতে এই সরকার আমাদের মতো ভিক্টিম পরিবারের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’
আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম হয়ে আর ঘরে ফেরেননি এমন অন্তত ২৫১ ব্যক্তি। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বলছে, টানা দেড় যুগের আওয়ামী শাসনামলে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। তবে মোট গুমের সংখ্যা, জমাপড়া অভিযোগের চেয়ে অনেক বেশি বলে ধারণা তদন্ত কমিশনের।
দীর্ঘদিন আয়না ঘরে বন্দি থাকা জামায়তের সংসদ সদস্য আহমাদ বিন কাসেম আরমানের অভিযোগ, হাতেগোনা কয়েকটি মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। তাই এমন একটি আইন করতে হবে যাতে গুম নিরৎসাহিত হয়। আর মায়ের ডাকের সমন্বয়ক ও বিএনপির সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম অভিযোগ করেন, তাদের দেওয়া ১৫০টি অভিযোগের একটিরও তদন্ত শেষ হয়নি।
মায়ের ডাকের সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘ক্যাপাবিলিটি আর ক্যাপাসিটি অনুযায়ী আমার মনে হয় না আসল ডেটা বা ফলাফল আমরা পাইনি সেখান থেকে। ভুক্তভোগী হাজারও পরিবার; এদের জন্য আসলে প্রতিটা দিনই কষ্টের। একজন গুম হয়নি, মরে যেতে হয়েছে আমাদের সবাইকে। আমরা বেঁচে আছি এখনো ওই বিচারটা দেখার জন্য।
গুমের শিকার রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান বলেন, ‘এমন আইন তৈরি করতে হবে যেটা এ ধরনের গুমের কাজকে নিরুৎসাহীত করবে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা হবে। স্বচ্ছতার আওতায় নিয়ে আসা হবে। এমন একটি সংস্থা তৈরি হবে, যেখানে ভুক্তভোগীরা যেয়ে তাদের অধিকারের কথা বলতে পারবে।’
গুম প্রতিরোধে সম্প্রতি সংসদে উত্থাপিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ কে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘এখানে বলা হয়েছে অভিযোগ দায়ের করতে হবে মানবাধিকার কমিশনের বদলে পুলিশকে। কিন্তু পুলিশ তো গুমের ঘটনায় জড়িত হতে পারে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই তো গুম আইন। তাই তাদের কাছে অভিযোগ দায়ের করলে কতটা নিরপেক্ষ প্রতিকার পাওয়া যাবে সেটি নিয়ে তো প্রশ্ন থেকেই যায়।’
ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা ছাড়াও আওয়ামী লীগ আমলে অন্তত ২৫০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল। যাদের কেউই আর ফিরে আসেনি।



