চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অভিঘাতে বদলে গেছে বিশ্ব। বদলে গেছে বাংলাদেশের সমাজচিত্র। চিরকালের বাংলা ও বাঙালির আমূল পরিবর্তনের প্রেরণা ও প্রেক্ষিত যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, তার বহু ধারায় বিস্তৃতি বা উপজাত আজ স্বীকৃত সত্য। বিজ্ঞানের এই অবাধ ও দরাজ বিকাশ, উত্তরণ ও ব্যাপ্তি প্রশংসনীয়। তবে তা সর্বত্রই অমিয় ও স্বপ্রশংস তা বলা যায় না। এটি ঋত যে, কোথাও সে দীপ্ত ও পূজিত। আবার কোথাও পীড়িত। অভিঘাতের অবিজ্ঞান সে সত্যকে প্রত্যক্ষ করে তুলেছে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অজস্র উপজাতের মধ্যে উল্লেখ্য হলো ইউটিউব, ইমো, ভাইবার, ফেসবুক ইত্যাদি। এগুলো বহুল ব্যবহৃত, প্রচারিত ও সমালোচিত উপজাত। মানুষ এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আনন্দে ও প্রয়োজনে। সানন্দে ব্যবহার করছে। এতে প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে। বিজ্ঞানের সহযাত্রী হিসেবে মানুষ প্রযুক্তিকে গ্রহণ করবে এটাই স্বাভাবিক। এর ব্যতিক্রমই অস্বাভাবিক। যারা এই অস্বাভাবিকতা করেন তাদেরকে প্রতিক্রিয়াশীল, অনগ্রসর ও অন্ধকারের মানুষ বলা হয়।
এ কথা সত্য যে, বিজ্ঞান সাধারণত কখনই সংস্কৃতি, সভ্যতা ও মানুষের প্রতিপক্ষ নয়। বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানবকল্যাণেই প্রয়োগ হয়েছে। এমনকি আবিষ্কার হয়েছেও মানবহিতার্থে। তবে দু-চারটে ব্যতিক্রমও আছে। ব্যতিক্রম কখনো সাধারণ নমুনা নয় বলে তা বিচার্য নয়। সে কারণে মানুষ ও মানুষের মঙ্গলে-কল্যাণে-ব্যবহৃত বিজ্ঞানের আবিষ্কার চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপজাত ইউটিউব, ফেসবুক ইত্যাদিও কোনোভাবে নেতিবাচক আবিষ্কার নয়।
কিন্তু আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা মানবকল্যাণের আবিষ্কার ইউটিউব, ফেইসবুককে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। কারণ এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি নানানভাবে বিপন্ন হয়ে উঠেছে। এই আবিষ্কারের জন্য নয় ব্যবহারকারীদের নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কারণে আমাদের সংস্কৃতি তার ঐতিহ্য, গৌরব ও সৌরভ হারাতে বসেছে। বিষয়টি আলোচনায় অকপট হওয়া বাঞ্ছনীয়।
বাঙালি সংস্কৃতি সহস্র দুয়ের প্রাত্যহিক শীলনের ফলাফল। পাল শাসনামলে একটু স্থিত হয় সংস্কৃতি। তখন বঙ্গ, বঙ্গাল, সমতট, হরিকেল প্রভৃতি রাজ্যজনপদের অধিবাসীরা নিজস্ব সংস্কৃতির পরম্পরায় নিজেদেরকে বাঙালি ভাবতে অভ্যস্ত হয়। তাই দেখা যায় চর্যাপদের কবি ভুসুকা পব নিজেকে বাঙ্গালি বলে দাবি করেন। চর্যাপদে বিধৃত সমাজ-সংস্কৃতির যে রূপ আমাদের সামনে ভেসে ওঠে তাই বাঙালি সংস্কৃতির প্রাথমিক রূপ। এই সংস্কতি গ্রহণ ও বর্জনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। কর্ণাটক সেনাদের দ্বারা পশ্চিম ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন ও মধ্যযুগের আরব-তুর্কি-পারস্য-আফগানদের আরব্য সংস্কৃতির আধিপত্য বাঙালি সংস্কৃতি আত্মীকরণ ও প্রতিরোধ করে এগিয়েছে। ব্রিটিশদের দ্বারা শাসিত হয়েও তাদের সংস্কৃতির অনেক কিছু আপন অঙ্গে মাখিয়ে নিয়েছে। পাকিস্তানি শাসনামলে তাদের সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করে বাঙালি সংস্কৃতি আপন অস্তিত্বের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিল ১৯৭১ সালে। সেই ঠিকানাকে অবলম্বন করে বাঙালির সংস্কৃতি চলছে।
বলা বাহুল্য যে, সংস্কৃতি রূপান্তরধর্মী। সংস্কৃতির রূপান্তর হয় স্থান, কাল, পাত্র আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে সে রূপান্তরকে অনিবার্য করে তোলে। কিন্তু কখনোই সে সংস্কৃতি সমূলে উৎপাটিত হয় না বা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে পড়ে না। আরেকটি কথা, সংস্কৃতি প্রধানত উত্তরাধিকারনন্ধ। পরম্পরায় তা সম্প্রসারিত হয়। সংস্কৃতি সকল সময় সমাজের অন্তর ও অন্তর বিরোধ মোকাবেলা করে এগোয়। সেই প্রত্ন বাংলায় যে বাঙালি সংস্কৃতির উন্মেষ হয়েছিল, সেই সংস্কৃতি যুগে যুগে দ্বান্দ্বিকতার ভেতর দিয়ে এগিয়েছে এবং নিজের অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়ে টিকে থেকেছে। মাঝে মাঝে কখনো দ্বান্দ্বিকতার তীব্রতায়, বৈরিতার প্রাবল্যে ও বিরুদ্ধতার নিষ্ঠুরতায় বাঙালির সংস্কৃতি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। বল্লাল সেন, বখতিয়ার খিলজি, মৈকলে, প্রমুখ বাঙালির সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে দিয়েছিল। কিন্তু বাঙালির সংস্কৃতি আপন বৈভবে-ঐশ্বর্যে-শক্তিতে তা প্রতিরোধ করে অগ্রসর হয়েছে।
পূর্বেই বলা হয়েছে, ইউটিউব, ফেসবুক ইত্যাদি যাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলা হচ্ছে তার ব্যবহারকারীদের নেতিবাচক কর্মফল বাঙালির সংস্কৃতিকে সংকটাপন্ন করে তুলছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র আজ গ্রাসিত। সে গ্রাস জাতির স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে ম্লান করে দিচ্ছে। কতিপয় দৃষ্টান্তে বোঝা যাবে বিষয়টি।
আজ প্রায় সব বয়সীর হাতে যে স্মার্ট মোবাইল ফোন, তার মধ্যে অধিকাংশই ফেসবুক ব্যবহারকারী। এই ব্যবহারকারীরা এতই ফেসবুকে আসক্ত যে, তারা তাদের নিজকর্মে ভীষণ মনোযোগী। গৃহিণী গৃহে, শিক্ষার্থী শিক্ষায়, চাকুরিজীবী চাকুরিতে, ব্যবসায়ী ব্যবসায়, ডাক্তার ডাক্তারিতে, উকিল ওকালতিতে অমনোযোগী। অর্থাৎ পেশাজীবী, কর্মজীবী, বৃত্তিজীবী ও বেকার সকলে ফেসবুক, ইউটিউব, ইমো, ভাইবার তীব্রভাবে আসক্ত ও মনোযোগী। তারা তাদের আপন কর্মে উদাসীন। এই আসক্ত প্রকৃত কর্মবিমুখ মানুষরা এই উপজাত প্রযুক্তির মাধ্যমে যা দেখছে আর উপজাত বণিকরা যা প্রস্তুত করে যেসব দেখাচ্ছে তার একটি বড় অংশ বাঙালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। নৈতিকতাহীন ও মূল্যবোধ বিচ্ছিন্ন সেসব দেখে-শুনে মানুষ যা ভাবছে ও করছে তা অনিবার্যভাবে বাঙালির সংস্কৃতিকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, বাঙালির সংস্কৃতি সূচনালগ্ন থেকেই মূল্যবোধ শাসিত। যে মূল্যবোধ নীতি, জ্ঞান ও সুন্দরের দ্বারা লালিত। বংশ পরম্পরায় চর্চিত যে মূল্যবোধ মানবিকতা ও শ্রেয়বোধ দ্বারা প্রাণিত। ইউটিউব, ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কর্তৃক প্রদর্শিত বহু বিষয় যা ব্যবহারকারীরা দেখছে এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাঙালির প্রচলিত মূল্যবোধগুলোকে আঘাত করে চূর্ণ-বিচূর্ণ করছে। পাশাপাশি সংস্কৃতিকে করছে বিপন্ন। বাংলাদেশে একটি প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে যারা বাঙালির চিরায়ত মূল্যবোধ বিচ্ছিন্ন। যারা শিষ্ঠতাকে উপেক্ষা করে শ্লীলতাকে এড়িয়ে নতুন ভাব ও মানসে পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কতিপয় কুরুচিপূর্ণ বিষয় চিত্র দ্বারা প্রভাবিত এ প্রজন্ম বাঙালির সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ হয়ে সংস্কৃতির সঙ্গে বৈরিতা করছে।
লাভ, লোভ, কাম ও মোহ এই চার তাড়না তাড়িত জনগোষ্ঠীর জন্মে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সাম্প্রতিক সময়ে এদের বিস্তৃতির অন্যতম প্রধান কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এ মাধ্যমে প্রদর্শিত বিষয়, চিত্র ও প্রলোভন মানুষকে লোভী করছে। মানুষ লাভ ছাড়া কিছু করতে চায় না। তারা কামান্ধ হয়ে ধর্ষক, লম্পট, ব্যভিচারী হচ্ছে। তারা মোহবিষ্ট হয়ে শ্রম-বিমুখ হয়ে পড়ছে। এই নতুন ধারার মানুষেরা হচ্ছে মধ্যবিত্ত। যারা বাঙালির সংস্কৃতির ধারকও বাহক ছিল। এই ধারক ও বাহক মধ্যবিত্ত এখন ইউটিউব, ফেসবুক আসক্ত। তারা প্রবলভাবে আত্মকেন্দ্রিক। তাদের আত্মকুন্ডায়ন প্রকৃত অর্থে বাঙালির সংস্কৃতির লালন ও পৃষ্ঠপোষকতাকে বিঘ্ন করে সংস্কৃতিকে মুমূর্ষ করে তুলেছে।
মহামতি কার্ল মার্কস বলেছেন, সামাজিক বাস্তবতা মানুষের চৈতন্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। কথাটি সত্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বলা যায়, ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যে সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করেছে তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মানবমানস বা চৈতন্য বাঙালির সংস্কৃতি বিকাশের অন্তরায়। তার বাঁধা ও বিঘ্নের বাঙালির সংস্কৃতি বিবর্ণ ও বিপন্ন।
এ কথা অস্বীকার করা হচ্ছে না যে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপজাত প্রযুক্তি ইউটিউব, ফেসবুক ইত্যাদি মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে অবদান রাখছে না। বরং তার অবদানকে সকৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করা হচ্ছে। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজে যেমন লুম্পেন পুঁজিপতি ও রাজনীতিক থাকে যারা লাভ ও লোভের বশবর্তী হয়ে সমাজ-সংস্কৃতি-মানুষকে ভুলে যায়। তারা পুঁজির ধর্মে মুনাফা লোভী হয়ে সভ্যতা-সংস্কৃতি ও মানব বিরুদ্ধ হয়। এই এরাই ইউটিউব, ফেসবুককে মানবকল্যাণ বিমুখ করে, মূল্যবোধ ধ্বংস করে বাঙালির সংস্কৃতিকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে তাদের ধিক। তবে প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাই।



