কথাটা সাকিব আল হাসান মজা করেই বলেছিলেন। হয়তো বিশ্বকাপযাত্রা শুরুর আগের তামিমকাণ্ড না ঘটলে কথাগুলো শুনতে আর অস্বস্তি লাগত না। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে হওয়া বিতর্ক, তামিম-সাকিবের পাল্টাপাল্টা তির ছোড়াছুড়ি এবং অবশ্যই মাঠের শোচনীয় পারফরম্যান্সের কারণে ওই কথাগুলোই অস্বস্তির সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তি জাগিয়েছিল বেশ।
বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিনের ঘটনা। সেদিনকার সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলার এক পর্যায়ে হতাশ না হওয়ার কথা বলেছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা সাকিব আল হাসান। সেমিফাইনালে খেলার লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘স্বপ্ন তো... এখনও ওই সম্ভাবনা আছে। আমরা (ভালো করতে) না পারলেও অন্যরা আমাদের সাহায্য করছে। ওইরকম যদি হতেই থাকে আর আমরা যদি নিজেদের একটু এগিয়ে নিতে পারি, স্বপ্ন সত্যিও হয়ে যেতে পারে। এখনও তো খুব ভালো সুযোগ আছে আমাদের। তো এত তাড়াতাড়ি হতাশ হবেন না। শেষ হলে হতাশ হয়েন। মন ভরে হতাশ হয়েন (হাসি)। কোনো সমস্যা নেই।’
হাসিমুখে বেশ কড়া জবাবই দিয়েছিলেন সাকিব। পান থেকে চুন খসলেই হায় হায় করা সমর্থগোষ্ঠীর এই দেশে সব সময় সবকিছু সহ্য করা কঠিন। যেভাবে এ দেশে তারকাদের অসামাজিকভাবে ট্রল করা হয় কখনো কখনো, তা প্রায় সময়ই সকল সভ্যতা-ভব্যতার সীমা অতিক্রম করে ফেলে। সাংবাদিকেরাও মাঝে মাঝে ক্লিকবেইটের ফাঁদে পড়ে এমন সব কাণ্ড করে বসেন, যার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
এমন পরিস্থিতিতে সাকিব আল হাসান কৌশলে ‘পাল্টা জবাব’ দিয়ে দেন ভালোই। যেকোনো ক্ষেত্রে ‘স্ট্রং ক্যারেক্টার’ থাকা ভালো। ওতে ক্ষতির চেয়ে লাভ হয় বরং। কিন্তু এবার সেই শক্তিশালী জবাবটি আর শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারল না। কারণ এখনও পর্যন্ত এক আফগানিস্তানের কাছে জেতা বাদে বাংলাদেশের জয়ের ঝুলিতে অন্য কোনো সংযোজন নেই। শেষ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের কাছেও হারতে হয়েছে আড়াই শর নিচে লক্ষ্য পেয়েও। এমনকি খেলায় হার-জিতের পেন্ডুলামটিকেও অস্থির করতে পারেননি বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। তার বদলে দ্বিতীয় ইনিংসের মাঝামাঝি যেতেই যেন শুরু হয়ে যায় পরাজিত হওয়ার ক্লান্তিকর অপেক্ষা।
এমন অবস্থা এর আগে বাংলাদেশ জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের ক্ষেত্রে অনেকবারই হয়েছে। বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে ২০০৩ সালের কথা স্মরণে আনা যেতেই পারে। সেবার কেনিয়া ও কানাডার কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ। ওই দুটো জয়ের আশাতেই দল সেবার বিশ্বকাপে গিয়েছিল বটে। কিন্তু পুরো দলের শরীরী ভাষা একপর্যায়ে এমন হয়ে গিয়েছিল যে, বোঝাই যাচ্ছিল টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে পারলেই বাঁচে পুরো দল। আর এবার তো বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম কোনো দল হিসেবে চারটি ভিন্ন সহযোগী দেশের কাছে হারের রেকর্ড হলো বাংলাদেশের।
খেলায় হার-জিত থাকেই। ভালো খেলাও না-ই হতে পারে। কিন্তু অসহায় আত্মসমর্পণ আসলে খুবই দৃষ্টিকটু। হার মেনে নেওয়ার অভ্যাস থাকলেও সমর্থকগোষ্ঠী কখনো পড়ে পড়ে মার খাওয়া মেনে নিতে পারে না। এটিও ঠিক যে, খেলার মাঠ কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। তাতে বিজয়ী হলেই যে পৃথিবীর সব প্রতিবন্ধকতা জয় করা যাবে, বিষয়টি তা নয়। বেশির ভাগ সমর্থক সেটি বোঝার পরও প্রিয় দলের জয় দেখতেই ব্যগ্র হয়ে ওঠেন। এটিই হয়তো প্রিয় দলের প্রতি তাদের ভালোবাসার প্রকাশ। তা কখনো কখনো অসহনীয় হলেও সেটিকে অগ্রাহ্য করা কঠিনই।
সমস্যা হলো বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষা। সামর্থ্য ও ইচ্ছা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই জয় আসে। সামর্থ্য কম থাকলেও শুধু ইচ্ছার জোরে অনেক অলঙ্ঘ্য পর্বত পার হওয়া যায়। কিন্তু কেন যেন আমাদের ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষায় পরাজয়ের ক্লান্তিই ফুটে উঠছে বেশি। আর এই জায়গাটিতেই হয়তো আফগানিস্তান বা নেদারল্যান্ডসের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছি আমরা। কারণ টানা হারে এই দল দুটি ক্লান্ত না হলেও আমরা হয়েছি। ফলে নতুন উদ্যম আর চোখে পড়ছে না তেমন।
যদিও একটি জয়ই পুরো বিষয়টাকে বদলে দিতে পারে। কিন্তু সেই জয়ের জন্য খেলার পূর্বশর্ত হিসেবে যে আগ্রাসী মনোভাবের প্রয়োজন হয়, তা তৈরিতে টিম ম্যানেজমেন্ট এখন পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যর্থ। সেই ব্যর্থতার দায় যেমন কোচ ও বোর্ডকর্তাদের ঘাড়ে পড়ে, তেমনি অধিনায়কের ঘাড়কেও ভারমুক্ত হতে দেয় না। অবশ্য সাকিব টুর্নামেন্ট শুরুর আগে বলেছিলেন যে, তারা সব বিতর্ক পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চান। এখন অবশ্য স্বীকার করে নিতেই হবে যে, সে জায়গাতে অধিনায়ক সাকিবও ব্যর্থই হয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, সাকিবের এই ব্যর্থতার পেছনে বিশ্বকাপযাত্রার একেবারেই আগ দিয়ে তাঁর নিজের দেওয়া ভিডিও সাক্ষাৎকারের ভূমিকা কতটুকু? তামিম ইকবালের ভিডিওবার্তার পাশাপাশি সেটিও কি দলে বিভক্তি তৈরি করেনি?
নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে ওপরের দুই প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই দলের ব্যর্থতার দায় অধিনায়ক সাকিবের ঘাড়েও জেঁকে বসে কিছুটা। এবং তখন ‘মন ভরে’ হতাশ হওয়া বিষয়ক তাঁর পরামর্শ শুনতেও তিতকুটে লাগে। কারণ ওই পরামর্শটি দিয়ে সাকিব আসলে ‘দেশের ক্রিকেটের ভালো চায় না’ শীর্ষক বিরোধীপক্ষের অস্তিত্বকেই আরও উসকে দেওয়ার কাজটি করেছেন। ঐক্যের বদলে বিভক্তিকে গুরুত্ব দিলে (তা দলের ভেতরে বা বাইরে, যেখানেই হোক), সেটি আর প্রকৃত নেতার বৈশিষ্ট্য থাকে না। ওতে লাভও খুব একটা হয় না, নিজেদের উন্নতিও হয় না।
সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে সাকিব হয়তো কয়েকটি হারেই নিরাশার সাগরে ডুবে যাওয়া সমর্থকগোষ্ঠীকেই একটা খোঁচা দিয়েছিলেন। এর আগে তারকা ব্যাটসম্যান লিটন দাসও সাংবাদিকদের হোটেল থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে সমালোচিত হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে এটি মনে হতেই পারে যে, ক্রিকেটাররা নিজেদের আসল কাজ ভুলে অন্য কাজে মনযোগ হয়তো একটু বেশি দিচ্ছেন! হয়তো হ্যাঁ, হয়তো না। তবে এসবের বদলে বরং ক্রিকেটাররা মাঠে উপযুক্ত পারফর্ম করলেই সব বিতর্ক চাপা দেওয়া সহজ হতো। আর কে না জানে, খেলোয়াড়দের জন্য কথার চাবুকের চেয়ে মাঠের পারফরম্যান্সই সব বিতর্ক মুছে ফেলার কার্যকরী ডাস্টার।
সে যাই হোক। চলমান বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের আরও তিনটি ম্যাচ বাকি। প্রতিপক্ষ সবাই বেশ শক্তিশালী দল। এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপে বাংলাদেশের যা পারফরম্যান্স, তাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে আশায় বুক বাঁধা একটু কঠিনই। তারপরও মাননীয় অধিনায়ক যেহেতু হতাশ হওয়ার দিনক্ষণ বেঁধে দেওয়ার দায়িত্বটি নিজের কাঁধে তুলেই নিয়েছেন, সেক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ নেওয়াই যায়।
তা সাকিব, এখনই কি মন ভরে হতাশ হব? নাকি হতাশ হওয়ার আরও উপাদান জমলে পরে একসাথে হব?
এই অভাগা সমর্থককে একটু দিকনির্দেশনা দেবেন, প্লিজ!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



