আমাদের দেশের এক সংসদ সদস্যের বক্তব্য নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে। তিনি বলে দিয়েছেন, নির্বাচনে হওয়া খরচ তুলতে ‘একটু অনিয়ম’ তিনি করবেনই! এদিকে এই ‘একটু অনিয়ম’–এর ডামাডোলের আগেই বৈশ্বিক প্রতিবেদন জানিয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের সুখ কমছে। তবে কি এসব ‘একটু অনিয়ম’ই জনতার অসুখী হওয়ার কারণ?
আগে দুই সংবাদের বিস্তারিত জানা যাক। দেশের মানুষের সুখ কমার দিকেই চলুন শুরুতে নজর দিই। কারণ দুনিয়ার মানুষ সুখে থাকার জন্যই জীবনের সব কাজ করে। সেই সুখই যদি কমে যায়, তখন অবস্থাটি সঙিন মনে হতে বাধ্য। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষ ১০০–এর মধ্যে নেই বাংলাদেশ। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৩’ অনুযায়ী, এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৩ দেশের মধ্যে ১২৯। ২০২৩ সালের একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৮। অর্থাৎ, নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে এ দেশের মানুষের সুখ কমছে এবং সেটি বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণেই কমছে। বড় বিষয় হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষই সবচেয়ে বেশি অসুখী। তালিকায় থাকা নেপাল (৯৩), পাকিস্তান (১০৮), ভারত (১২৬), মিয়ানমার (১১৮) ও শ্রীলঙ্কা (১২৮)—সবাই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে।
সুখ আসলে মাপে কীভাবে? জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্ক প্রতি বছর এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে থাকে। এ প্রতিবেদনে সবচেয়ে সুখী দেশ নির্ধারণের জন্য ৬টি সূচক যাচাই করা হয়। এই সূচকগুলো হলো: মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), সামাজিক সহায়তা, আয়ু, স্বাধীনতা, বদান্যতা ও দুর্নীতি নিয়ে মনোভাব। অর্থাৎ, এই ৬টি সূচকেই বাংলাদেশের মানুষের অসন্তুষ্টি স্পষ্ট।
এর মধ্যে দুর্নীতি নিয়ে মনোভাব স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় অংশ দখল করে আছে। আমাদের দেশে দুর্নীতির বিষয়টি পুরোপুরি ওপেন সিক্রেট ব্যাপার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো দুর্নীতিই স্বাভাবিক চিত্র, বরং তার ব্যত্যয়ই কিছুটা অস্বাভাবিক। এ দেশে বসবাসকারী যে কোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেই এর ‘সচিত্র’ প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। পত্র–পত্রিকা দেখলেও পাবেন। এই তো, সদ্যই প্রকাশিত এক সংবাদে জানা গেল, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মাইজখাপন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী আব্দুল কাদির মিয়া অফিসে বসে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে ঘুষ নেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ঐ ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের আক্তার হোসেন বয়াতির ছেলে মুক্তার হোসেনের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা গুনে নিয়ে পকেটে রাখেন ভূমি অফিসের সহকারী আব্দুল কাদির মিয়া। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর অবশ্য আব্দুল কাদিরকে কারণ দর্শানোর চিঠি (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসী ও সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, এই অফিস সহকারী অতিরিক্ত টাকা না দিলে কাজ তো দূরের কথা, সেবা নিতে আসা লোকদের সঙ্গে কথাও বলেন না!
ঘটনাটি ঘটেছে এক প্রত্যন্ত ইউনিয়নে। তাহলে পুরো দেশে এর পরিমাণ ও মাত্রা কোন পরিমাণে সেটি অনুমান করতেও ভয় হয়। শুধু যে সরকারি খাতেই দুর্নীতি হয়, তা তো নয়। হয় বেসরকারি খাতেও। সব মিলিয়ে দুর্নীতি হলো এদেশে কাজ সমাধার সোনার কাঠি, রূপার কাঠি। এটি হলেই কাজ হয়ে যায় ত্বড়িৎ গতিতে, আর এর অনুপস্থিতিতে বিষম হয় বজ্র আঁটুনি!

ঠিক এমন পরিস্থিতিতেই যখন একজন জনপ্রতিনিধি প্রকাশ্যে ‘একটু অনিয়ম’ করার কথা প্রসন্ন বদনে বলেন, তখন জনতার বিষন্ন হওয়া ছাড়া আর উপায় কী! ভিডিওচিত্রটি দেখলে বুঝবেন, একেবারেই আটপৌরে ঢঙে ‘একটু অনিয়ম’ করার কথা বলেছেন তিনি। যেন অনিয়ম এদেশে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আমজনতার কেউ এই ঢঙ করতেই পারেন, কিন্তু একজন সংসদ সদস্য যখন সেটি করেন, তখন আর তা সাধারণ থাকে না। এর অর্থ হলো, সাধারণ জনগণের দুর্নীতিবিষয়ক অসুখী মনোভাবের মাত্রাকে আরও গাঢ় করে দিলেন তিনি। এই তিনি হলেন নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সম্প্রতি মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এই এমপি। তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে যে টাকা খরচ করেছেন তা তুলতে ‘একটু অনিয়ম করবেন’। যদিও এ নিয়ে শোরগোল শুরু হওয়ার পর এমপির দাবি, এমন বক্তব্য ‘মজা’ করে দিয়েছেন!
আর এমপি’র এমন মজা এখন জনগণের অসুখী হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ এ ধরনের মজা করে সংসদ সদস্যরাই দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করছেন, একে মেনে নিতে জনতাকে বাধ্য করছেন। দুর্নীতির শিকার হলে জনতা তাদের নির্বাচিত যে প্রতিনিধির কাছে গিয়ে অনুযোগ–অভিযোগ করবেন, তারাই যদি ‘একটু অনিয়ম’কে বৈধতা দিয়ে বসেন, তবে সেই ‘একটু’ যে পেছনে পেছনে ‘অনেক’ হয়ে যাবে না, তার নিশ্চয়তা কি?
তাই এ দেশের মানুষের সুখ বাড়াতে হলে ‘একটু অনিয়ম’কেও ঠেকানো ছাড়া উপায় নেই। কারণ কথায় আছে, ‘সোয়া মণ দুধ নষ্ট করে এক ফোঁটা গোচোনা।’ অর্থাৎ, মণকে মণ দুধ নষ্ট করতে এক ফোঁটা চোনা, মানে গরুর এক ফোঁটা মূত্রই যথেষ্ট। কিছু বিষয় আসলে এমনই। সেক্ষেত্রে অল্প বিচ্যুতিও পুরো সাম্যাবস্থাকেই বিনষ্ট করে। এখন কোন পথে যাব, সেটিই হলো বিবেচ্য।
আসুন তবে আগামী বছরের এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করা যাক। তখনও নিশ্চয়ই সুখ সূচকের প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। তাতে এদেশের মানুষের সুখ কমার পরিমাণ যদি বর্তমান হারেই থাকে, তবে ধরে নিতেই হবে যে—এ দেশে গোচোনাই বেশি!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভশন


নির্বাচনের খরচ তুলতে ‘একটু অনিয়ম করবেন’ এমপি
প্রকাশ্যে ঘুষ নেন ভূমি অফিসের সহকারী, ভিডিও ভাইরাল
