এ দেশের তরুণদের মনে এত সুখ কোথা থেকে আসে?

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:০২ পিএম

না না, এ দেশের তরুণদের মনে থাকা সুখ নিয়ে এই অধমের কোনো অ্যালার্জি নেই। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থা যখন জানাচ্ছে যে, এ দেশের মানুষদের মধ্যে তরুণরাই সবচেয়ে বেশি সুখী, তখন একটা ধন্ধ তৈরি হচ্ছে। কারণ জাতীয় সংস্থার জরিপে দেখা যাচ্ছে এমন একটি চিত্র, যার সঙ্গে তরুণদের সুখী থাকার কার্যকারণ মেলানো অত্যন্ত কঠিন। অন্তত বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সম্ভব নয়। তাহলে আমাদের দেশের তরুণদের মনে এত সুখ কোথা থেকে আসছে?

প্রথমেই ধন্ধে পড়ার কারণগুলো সবিস্তারে জেনে নেওয়া যাক। কিছুদিন আগেই বিশ্বের সুখী দেশগুলোর তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষ ১০০–এর মধ্যে নেই বাংলাদেশ। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৩’ অনুযায়ী, এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৩ দেশের মধ্যে ১২৯। ২০২৩ সালের একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৮। অর্থাৎ, নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে এ দেশের মানুষের সুখ কমছে এবং সেটি বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণেই কমছে। বড় বিষয় হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষই সবচেয়ে বেশি অসুখী। তালিকায় থাকা নেপাল (৯৩), পাকিস্তান (১০৮), ভারত (১২৬), মিয়ানমার (১১৮) ও শ্রীলঙ্কা (১২৮)—সবাই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে।

তবে এখানে একটা আকর্ষণীয় তথ্য আছে। ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৩’  অনুযায়ী বাংলাদেশে যতটুকুই সুখ পাওয়া গেছে, তার বয়সভিত্তিক ভাগ করলে দেখা যাচ্ছে, এ দেশের তরুণেরা মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে সুখী। আর সবচেয়ে অসুখী হলো আপারমিডল বা মধ্যবয়সের কিছুটা ওপরের জনগোষ্ঠী। অর্থাৎ, এ দেশের তরুণদের মনে সুখের ঘটি উপচেই পড়ছে বলা যায়।

অন্যদিকে গত মাসেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশ করে ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ২০২৩’–এর প্রতিবেদন। তাতে বলা হয়েছে, শিক্ষা, কর্ম কিংবা প্রশিক্ষণে নেই—এমন তরুণের আছে প্রায় ৪০ শতাংশ। গত বছর এটি ছিল আরও বেশি। অর্থাৎ, এ দেশের স্রেফ বসে থাকা তরুণের সংখ্যাটি প্রতি ১০০ জনে ৪০ জন। এর ৬০ শতাংশই আবার তরুণী। তার মানে হলো, এ দেশের অনেক তরুণ–তরুণীই উৎপাদনমুখী বা উপার্জনমুখী নয়। এমনকি সেটি হওয়ার কোনো চেষ্টাতেও তারা নিয়োজিত নয়।

এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে নিজের বেকার থাকার সময়ের স্মৃতিচারণ করা যেতে পারে। ওই সময়টায় মূলত পরিবার থেকে পাঠানো অর্থেই ঢাকা নামক মহানগরে টিকে থাকার চেষ্টা করতে হয়েছে। সেই অর্থের পরিমাণ খুব বেশি ছিল না, তবে খাওয়া–পরা জুটে যেত বা জোটাতে হতোই। ওই সময়টায় আর যাই হোক, মনে সুখের আতিশয্য ছিল বলে মনে পড়ে না। কিন্তু ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৩ বলছে, এ দেশের তরুণদের এখন তেমনটাই হচ্ছে।

অভিযোগ করে বলতেই পারেন যে, বিষয়টির অতি সরলীকরণ হচ্ছে! তাহলে চলুন সুখের পরিমাপ আরেকটু গভীরে গিয়ে করা যাক। সুখ আসলে কীভাবে মাপে? জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্ক প্রতি বছর এই সুখ পরিমাপক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে থাকে। এ প্রতিবেদনে সবচেয়ে সুখী দেশ নির্ধারণের জন্য ৬টি সূচক যাচাই করা হয়। এই সূচকগুলো হলো: মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), সামাজিক সহায়তা, আয়ু, স্বাধীনতা, বদান্যতা ও দুর্নীতি নিয়ে মনোভাব। অর্থাৎ, এই ৬টি সূচকেই বাংলাদেশের মানুষের সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টিকে আমলে নেওয়া হয়। এসব খাতে এ দেশের গড় মানুষের অসন্তুষ্টিও স্পষ্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানে। কিন্তু অসুখীদের মধ্যে যারা ব্যতিক্রম, সেই তরুণেরা এদিক থেকে ভিন্ন মনোভাব পোষণ করছে কি? কর্মহীন থাকলেও কি তবে মনে শান্তির সুবাতাস বয়? নাকি আজকের তরুণেরা এসব নিয়ে ভাবেই না? নইলে তরুণেরা এত সুখী থাকছে কীভাবে আসলে?

আজকের এই লেখায় আমরা শিরোনামের প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি ঠিকই, কিন্তু সঠিক উত্তর পাওয়া আসলে অসম্ভব। কারণ, এ সংক্রান্ত তথ্য–উপাত্ত ও গবেষণার বড়ই অভাব। জাতিসংঘের প্রতিবেদন যদি সঠিক বলে ধরে নিই এবং একইসাথে দেশের জাতীয় পর্যায়ে পাওয়া তথ্য–উপাত্তকেও সঠিক বলে মেনে নিই, তবে বলতেই হয় সামগ্রিক চিত্রটি যেকোনো বোধবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিককে বিভ্রান্ত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যে তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ কর্মহীন (আক্ষরিক অর্থেই), তাদের মনে সুখের আবাস হলো কীভাবে? আর যদি তা হয়েই থাকে, তবে সেটির ইতিবাচক বিষয়টিকে কি আমরা কাজে লাগাতে পারছি?

অবশ্য এ–সংক্রান্ত গবেষণা বা জরিপ তেমন একটা দেখাই যায় না আমাদের দেশে। তরুণদের ক্ষেত্রে সেটি আরও প্রকট। এমনিতেই এ দেশে যেকোনো কিছুর গভীরে যাওয়ার প্রবণতা কম। এই যেমন ধরুন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কথাই। তারা জরিপে দেখালেন কর্ম, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণে না থাকা তরুণের পরিমাণের বিষয়টি। কিন্তু কী কী কারণে এটি হয়েছে বা হচ্ছে, এই অবসর সময়টায় তরুণেরা আসলে কী করছে, তাদের পরিকল্পনা কী—এই সকল প্রশ্নের উত্তর জানা হলো না। অন্তত এসব তথ্য জানা গেলে বোঝা যেত দেশের তরুণ সম্প্রদায়ের ভাবগতিক। হয়তো তারা কীসে বুঁদ থেকে সুখ পাচ্ছেন, সেটিও বোঝা যেত।

বুঁদ হয়ে থাকার প্রসঙ্গ এলে, আজকের সময়ে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বিষয়টি। এ দেশের নানা বয়সের অনেক মানুষই এখন মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে একপ্রকার বুঁদ হয়েই আছে। রাস্তায় হাঁটতে গেলে প্রায়ই কারও না কারও সাথে আপনার টক্কর লাগবেই। লাগার পর বুঝবেন মাথা নিচু করে ফোন টিপতেই টিপতেই তিনি আর সামনে থাকা আপনাকে ঠাওর করতে পারেননি। শুধু হাঁটা কেন, গণপরিবহণ, পার্ক, বাজার বা ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও এমন প্রবণতা পাবেন। ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ২০২৩’–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ দেশের ১৫ বছরের বেশি বয়সী জনসংখ্যার ৭৪ শতাংশই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। আবার এই বয়সসীমার জনসংখ্যার ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি। কিন্তু এর মধ্যে তরুণ জনগোষ্ঠীর পরিমাণ কতটা, তা কিন্তু প্রতিবেদনে নিখুঁতভাবে নেই। সেই উপাত্ত পেলেও কিন্তু ওপরে তোলা প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না মিললেও এক ধরনের আন্তঃসম্পর্কের চিত্র পাওয়া যেত। কারণ আমরা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি যে, কীভাবে চারপাশে থাকা তরুণ–তরুণীরা ক্রমে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমভিত্তিক হয়ে উঠছে। সেটি যেমন টিকটক–ইউটিউবে ভিডিও বানিয়ে হচ্ছে, তেমনি পাড়ার মোড়ের এক কোণায় গোল হয়ে জটলা বেঁধে ফোনে লুডু খেলার মাধ্যমেও হচ্ছে। ওই জটলা যে কেবলই খেলার আনন্দে হচ্ছে এবং তাতে কোনো অর্থযোগ নেই, সেটি আমি–আপনি কেউই হলফ করে বলতে পারব না। এর বাইরে আরও সবিস্তারে খুঁড়তে বসলে হয়তো কেঁচোর বদলে কেউটেও বেরিয়ে আসতে পারে!

সবশেষে, মোদ্দা কথা হলো, আমাদের দেশের তরুণদের ভাবনা ও পরিকল্পনা জানা অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন সভা–সেমিনারে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলি। মনে রাখতে হবে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে সফল হতে হলে এই তরুণদের ওপর ভরসা রাখা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু যাদের মনের খবরই আপনি জানেন না, তাদের কাঁধে এত গুরুদায়িত্ব তুলে বা চাপিয়ে দিয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন তো?

এর চেয়ে বরং আসুন তরুণদের বোঝার ও জানার চেষ্টাটা অন্তত করি। কীসে তাদের সুখ, কীসে অসুখ—তার সুলুক সন্ধান করি। নইলে শেষে আমও যাবে, ছালাও যাবে!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কত সরকার এসেছে, কত জ্ঞানী মন্ত্রী ও আমলা দায়িত্ব পালন করেছেন শিক্ষাকে শিক্ষণীয় করতে। কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয়...
সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো...
সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুকে ঘিরে যে আলোচনার ঝড় উঠেছে, সেটি আমাদের সামনে সেই প্রশ্নকেই ফের উসকে দিয়েছে। তিনি একটি ‘খোলা চিঠি’ লিখে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি...
নারীদের ছাড়া এ দেশে কোনো আন্দোলন হয়নি। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও নারীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, লড়েছেন। কিন্তু তারপর? রাজনীতিতে আসা নারীকে লক্ষ্যবস্তু করে কুরুচিকর সব বক্তব্য দেওয়া কি...
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করার অন্যতম কুশিলব মেজর মোজাফফর। এরপর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় গোপনে দাফনের মূল পরিকল্পনাও তার;...
রাজধানীর ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দ্রুতগামী অজ্ঞাত এক গাড়ির ধাক্কায় সেকান্দার আলী নামে এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
খাবার আর ওষুধসহ নানা খাতে ব্যয় বৃদ্ধিতে বিপাকে বগুড়ার মুরগির খামার ও হ্যাচারি ব্যবসায়ীরা। জেলার ৫ হাজারেরও বেশি খামার ও হ্যাচারি মধ্যে, গত ৩ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে সাড়ে ৪ হাজার প্রতিষ্ঠান। এতে বেকার...
১১ কর্মকর্তার দায়িত্ব একজনের হাতে!
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। অফিসের করণিক,...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর