বৈশাখ এলে মনে পড়ে সেই জলছত্রতলা

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৩৪ পিএম

খুলনার দক্ষিণে এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার বেড়ে ওঠা। এলাকাটা প্রত্যন্ত বলেই হয়তো আমরা এমন কিছু চর্চা দেখেছি যেগুলো নাগরিক বর্ষবরণে নেই। তার মধ্যে একটা হচ্ছে বৈশাখের জলছত্রতলা। 

আশির দশকে তখন আমাদের ওদিকে রাস্তাঘাটের অবস্থা ছিল খুব খারাপ। স্কুল ছিল অনেক দূরে। ঠা ঠা রোদে পাঁচ কিলোমিটার মতো হেঁটে স্কুলে যেতে হতো; ফেরার সময় আরও পাঁচ কিলোমিটার। হিন্দুপ্রধান এলাকাটিতে বৈশাখে পথিকের জন্য পানীয় জল বিতরণের চল ছিল। সারা বছরই অচেনা পথিকেরা গ্রামের মানুষের বাড়িতে জল চেয়ে খেতেন—এটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল অবশ্য। কারণ, টিউবয়েল ছিল অনেক দূরে দূরে।

বৈশাখে থাকত বিশেষ আয়োজন। তখন পথিকের জন্য রাস্তার পাশে জলছত্রতলা খোলা হতো। রোদে হেঁটে এসে সেখানে ঠান্ডা জল পাওয়া যেত। বিদ্যুৎ ছিল না। তাই ফ্রিজের বালাই ছিল না। জল রাখা হতো মাটির বড় মা’ঠে বা মুইঠ্যার মধ্যে। এতে জল ঠান্ডা থাকত। আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে যে জলছত্রতলাটা পড়ত, সেখানে মা’ঠেগুলো মাটিতে পোতা থাকত অর্ধেকটা। জল ঠান্ডা রাখার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। সেখানে জল খেতে গেলে সাথে দুটো বাতাসাও দিত। রোদের মধ্যে হেঁটে এসে ছাউনির তলায় বসে সেই জল মুখে দিলে বোঝা যেত জলের অপর নাম জীবন কেন। সাথে বাতাসা দুটো লাগত অমৃতের মতো। এত বছরের নাগরিক জীবনে সেই স্বাদ ভুলতে চলেছি। তবু বৈশাখ এলে সেই জলছত্রতলা ফিরে আসে। ফিরে আসে জল-বাতাসার সেই স্বাদ। বৈশাখের প্রথম দিনে পুজো-আচ্চার মাধ্যমে মাঙ্গলিক আচার সেরে শুরু হতো জলছত্রতলার যাত্রা। সিঁদূর আর তেল মিলিয়ে জলের পত্রের গায়ে স্বস্তিচিহ্ন আঁকা হতো। সামনে ঘটে থাকতে আম্রপল্লব (পাঁচটি পাতাসহ আমের ডালের মাথা)।

আরও কিছু চর্চা ছিল বছরের প্রথম মাসে। অনেক পরিবার এই মাসে মাছ-মাংস খেত না। এতে একদিকে একমাসের নিরামিষাশী জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে তাদের ধর্মীয় আচার পালন হতো। অন্যদিকে দেশীয় প্রজাতির মাছের ডিম পাড়ার সময়টাতে মাছ না ধরায় দেশি মাছের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা হতো। নিয়ম করে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিতে হতো না। লোকায়ত চর্চাগুলো এমনই।

এই মাসে বাড়ির তুলসীতলার তুলসী গাছের উপর বিশেষ কায়দায় জল দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন অনেকে। একটা মাটির ভাড়ে জল রাখা হতো তুলসী গাছের উপরে মাচা করে বা পাশের অন্য গাছে ঝুলিয়ে। ভাড়ের নিচে একটা ছিদ্র দিয়ে একটা পাটের দড়ি গাছটার গায়ে এসে পড়ত। দীর্ঘসময় ধরে দড়ি বেয়ে খুব অল্প অল্প জল পড়ত তুলসী গাছে।

নতুন বছরের প্রথম দিনের চেয়ে পুরোনো বছরের শেষ দিনটাও কম আকর্ষণীয় ছিল না। ওই দিন চৈত্রসংক্রান্তি। সব বাড়িতে না হলেও অনেক বাড়িতে সাধ্যমতো পিঠাপায়েস হতো। প্রতিবেশীরা পরস্পরের বাড়িতে পিঠা পাঠাতেন। তার আগে প্রতিবেশী নারীরা একে অপরের সহায়তায় ঢেঁকিতে চাল কুটে চালের গুঁড়া তৈরি করতেন। যদিও কৃষিপ্রধান সমাজে পৌষসংক্রান্তিটাই বড় করে উদ্‌যাপিত হতো। 

আমাদের ওখানে বছ‌রের শেষ দুদিন ও নতুন বছ‌রের প্রথম দিন ডালায়/ কুলায় ক‌রে ফুল‌ নি‌য়ে প্রথ‌মে গাছতলায় নি‌বেদন ও প‌রে সেগু‌লো জ‌লে ভা‌সি‌য়ে দেওয়ার চল ছিল। এটা‌কে ব‌লে ভা‌টিপূজা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কয়েকটি জেলাতেই শুধু এই পূজাটা হয়। শিমুল, মান্দার, আকন্দ, এক ধরনের ঘাসফুল, জবা—এসবের প্রাধান্য থাকত। সকালবেলায় সবার বাড়ি থেকে আনা ফুলে ভরা কুলাগুলো যখন গাছতলায় সাজিয়ে রাখা হতো, তখন চমৎকার এক দৃশ্যের সৃষ্টি হতো। গাছের কাণ্ডতে তেল-সিন্দুর লাগানো হতো। নারীরা উলুধ্বনি দিতেন।

এই সময়ের সবচেয়ে বড় আয়োজন ছিল চড়কপূজা। তার আগে হর-পার্বতী (শিব-দূর্গা) সেজে বাদ্যবাজনাসহ বাড়ি বাড়ি অষ্টকগান গেয়ে বেড়াত একেকটা দল। সাধ্যমতো তাদেরকে চাল বা টাকা দিতেন গৃহস্থ। ছোট ছেলেমেয়েরা এই গানের দলের সাথে গ্রামময় ঘুরত। শেষে চড়ক পূজার দিন মেলাও হতো সেখানে। খেজুরভাঙ্গা বলে একটা ব্যাপার ছিল। কাঁটাভর্তি খেজুর গাছে উঠে একজন বেশ তাণ্ডব নৃত্য করতেন। ব্যাপরটা ভয়ঙ্করই মনে হতো আমাদের কাছে। তারচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর ছিল মানুষের পিঠে বড় বড়শি বিঁধে খেলা দেখানো।

বছরের প্রথম দিন হালখাতা হতো। অনেকেই গ্রামের দোকানে নিয়মিত বাকিতে কেনাকাটা করতেন। এই দিন সেসব শোধ করার রেওয়াজ ছিল। যাদের কাছে দোকানদারের পাওনা নেই, তাদের অনেককেও আমন্ত্রণ জানানো হতো। দু–একবার অপেক্ষাকৃত বড় দোকানদারকে ময়রা এনে মিষ্টি বানিয়ে নিতে দেখেছি। অন্যরা থানা সদরের মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি আনিয়ে নিতেন। হালখাতায় গ্রামে তখন সাধারণত একটা সাদা মিষ্টি আর একটা লাল মিষ্টি খেতে দেওয়া ছিল কমন। বেশি খাবারদাবারের আয়োজন থাকত না।

সাধ্যে কুলালে মানুষ নতুন বছরে নতুন কাপড় কিনতেন। অবশ্যই দিন উদ্‌যাপনের জন্য বাহারি পোশাক নয়। সারা বছর পরনের যে কাপড়, তারই একটা করে কেনা হতো বছরের শুরুতে।

পান্তা-ইলিশের ব্যাপার ছিল না। বাড়িতে অন্যদিনের মতো খাবারদাবার হতো। বাড়তি থাকত পাঁচমিশালী শাক, শুক্তো, তিতার ডাল (উচ্ছে দিয়ে), আমডাল—এসব। সকালে স্নান করে, যারা নতুন কাপড় কিনতেন, তাঁরা সেগুলো পরে, অন্যরা পরিষ্কার কাপড় পরে, পূজা করতেন, বা অন্তত তুলসীতলায় প্রণাম করতেন। সাধারণত সেদিন মাংস খাওয়া হতো না; কিন্তু মাছ খাওয়া চলত।

এমন আরও কত কিছু ছিল। এখন মোটরসাইকেলে দশ-পনেরো মিনিটে খুলনা শহরে যাওয়া যায়। গ্রামের রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকান, আরও একটু এগোলে মিষ্টির দোকান, মাংসের দোকান। গ্রামের সামর্থ্যবানরা বৈশাখী পোশাকও কেনেন শহর থেকে। এসব ছিল না তখন। যা ছিল, তা হচ্ছে অল্পে উদ্বেলিত হওয়ার আনন্দ। তাইতো এত বছর পরও জলছত্রতলা মনে পড়ে, মনে পড়ে জল-বাতাসার সেই অপূর্ব স্বাদ।

লেখক: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা

মহাবিশ্বের পটভূমিতে জীবন এক ক্ষণস্থায়ী কাব্য; আর কিছু জীবন সেই ক্ষণস্থায়ীতাকে অতিক্রম করে হয়ে ওঠে কালের অনন্ত জিজ্ঞাসা। সেই বিরল অস্তিত্বের প্রতীক রূপে কবি সুফিয়া কামাল, নামটি কেবল একটি...
‘বাড়ির কাছে আরশী নগর, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’–এই পঙ্‌ক্তিটি যখন ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে ধ্বনিত হতো, তখন সেটা শুধু সুর নয়, ছিল আত্মার এক নিঃশব্দ আকুলতা। লালনের সহজিয়া দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে যিনি...
সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো...
সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুকে ঘিরে যে আলোচনার ঝড় উঠেছে, সেটি আমাদের সামনে সেই প্রশ্নকেই ফের উসকে দিয়েছে। তিনি একটি ‘খোলা চিঠি’ লিখে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি...
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই টানটান উত্তেজনা, শেষ মুহূর্তের নাটক, আর কোটি ভক্তের স্বপ্নপূরণ। কিন্তু এর উল্টো পিঠটাও বড্ড নিষ্ঠুর। সেমিফাইনালের মহারণ শেষে আজ রাত ৩টায় আমেরিকার মায়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী...
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ খেলতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে জাতীয় দলের দায়িত্বের...
গত বছরের ২৭ মে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। আরও গ্রেপ্তার হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ, শ্যুটার আরাফাত ও শরীফ। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর একের পর এক হত্যাকাণ্ডে...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর