জামায়াত প্রশ্নে এনসিপিতে আদর্শিক ভাঙন, জারা–তাজনূভার প্রস্থান কি বড় ধসের শুরু?

জারা–তাজনূভার প্রস্থান কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা। জামায়াত প্রশ্নে আপসের রাজনীতির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ। চিঠিতে যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তা শুধু ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এনসিপির ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ নিয়েই গভীর সংশয়। 

 

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০৮ পিএম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক দল ভাঙে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে, নেতৃত্বের কোন্দলে কিংবা মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে। কিন্তু জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিতে যা ঘটছে, তা ভিন্ন; এটি ক্ষমতার ভাগাভাগি নয়, এটি আদর্শিক আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোটের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে দল ছাড়লেন ডা. তাসনিম জারা ও ডা. তাজনূভা জাবীন। একই সঙ্গে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব বরাবর পাঠানো ৩০ নেতার স্বাক্ষরিত প্রতিবাদী চিঠি প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে এক অস্বস্তিকর সত্য। এনসিপির ভেতরে এখন গভীর বিশ্বাসের সংকট। এটি কোনো হঠাৎ বিচ্ছেদ নয়। এটি দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ।

জারা–তাজনূভার প্রস্থান কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা। জামায়াত প্রশ্নে আপসের রাজনীতির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ। চিঠিতে যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তা শুধু ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এনসিপির ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ নিয়েই গভীর সংশয়।

অভিযোগের কেন্দ্রে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা দলটির ঘোষিত প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আদর্শ না নির্বাচনি অঙ্কের রাজনীতি করবে এনসিপি?
এখানে প্রশ্নটি স্পষ্ট: এনসিপি কি আদর্শের রাজনীতি করবে, নাকি নির্বাচনি অঙ্কের রাজনীতি? জারা ও তাজনূভার বিদায় সেই প্রশ্নেরই জবাব; তারা আদর্শের পক্ষেই দাঁড়াতে চেয়েছেন।

৩০ নেতার চিঠিতে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে ‘অস্বচ্ছ’ ও ‘উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, জামায়াতের সঙ্গে জোট কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি একটি নৈতিক সংকট।

চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত তৃণমূলকে অন্ধকারে রেখে নেওয়া হয়েছে, যা দলীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থি। এখানেই উঠে আসে বড় প্রশ্ন, যে দল নিজস্ব ভেতরেই গণতান্ত্রিক অনুশীলন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, তারা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দেবে কীভাবে?

বিশেষ করে তরুণ ও শহুরে ভোটারদের কাছে এনসিপির গ্রহণযোগ্যতা এই সিদ্ধান্তে বড় ধাক্কা খেয়েছে। কারণ গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে যে নতুন বন্দোবস্তোর ঘোষণা দিয়েছিলেন তারুণ্যের নেতৃত্ব, তা বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। যারা ভেবেছিল এনসিপি পুরোনো রাজনীতির বাইরে কিছু করবে, তারা এখন প্রশ্ন করছে, তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?

এনসিপির জন্য সতর্ক সংকেত
এই ভাঙন নিছক সাংগঠনিক ক্ষতি নয়; এটি বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। বিশেষ করে তরুণ, প্রগতিশীল ও নাগরিক ভোটব্যাংকের কাছে এনসিপি যে ভিন্ন রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, জামায়াত প্রশ্নে আপস সেই প্রতিশ্রুতিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

জারা–তাজনূভার মতো পরিচিত মুখের প্রস্থান এবং একসঙ্গে ৩০ নেতার চিঠি, দুটোই ইঙ্গিত দেয়, দলটির ভেতরে অসন্তোষ এখন আর চাপা নেই। আর জামায়াতকে পছন্দ অপছন্দের ইস্যু ধরে তারই বিস্ফোরণ ঘটেছে মাত্র।  

বৃহত্তর রাজনীতিতে এর প্রভাব ও জামায়াতের দায় 
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত প্রশ্ন বরাবরই স্পর্শকাতর। মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বাস্তবতা, সব মিলিয়ে এই ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট না হলে রাজনৈতিক মূল্য চুকাতে হয়। এনসিপির ক্ষেত্রে সেই মূল্য এখনই পরিশোধ শুরু হয়েছে। সামনে আরও প্রস্থান হবে কি না, সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

দেশের রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া তারুণ্য নির্ভর ও অপরীমেয় প্রাণ প্রাচুর্যের সম্ভাবনাময় এনসিপি যদি শুধুই নির্বাচনি জোটের মারপ্যাঁচে হারিয়ে যায় তার দায় জামায়াতকে অবশ্যই নিতে হবে। কেননা, রাজনৈতিক পরিবারের নবীনদের অভিভাবকত্ব জ্যেষ্ঠদের উপরই বর্তায়।

এনসিপিরও উচিত হবে না তাৎক্ষণিক কোনো সুবিধার জন্য ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি অর্জনের সম্ভাবনাকে হাতছাড়া করা। বড়দের ছায়াতলে নয় বরং স্বাধীন পতাকাতলে নিজস্ব রাজনীতির ঝান্ডা উড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই এনসিপির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল অনিবার্য।  

শুধু নেতা নয়, কর্মী-সমর্থকদের কথাও এনসিপি নেতাদের মাথায় রাখতে হবে। রাজনীতির অনিবার্য ঝুঁকি কিন্তু এরইমধ্যে তারাও নিয়ে ফেলেছেন। আকাঙ্ক্ষা আর সম্ভাবনার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে তারা রাজনীতির মহাসমুদ্রে যে সাঁতার কাটা শুরু করেছেন তীরে উঠতে না পারলে তাদের কপালেও করুণ পরিণতি অনিবার্য।       

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই
এনসিপি কি একটি নীতি-ভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে, নাকি ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য আদর্শ বিসর্জন দেওয়া আরেকটি দল হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা নেবে?

এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, নির্বাচন জেতার কৌশল আর রাজনীতি করার নৈতিকতা এক জিনিস নয়। জামায়াত প্রশ্নে এনসিপির সিদ্ধান্ত দলটিকে সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আদর্শিক ভাঙনই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। জারা ও তাজনূভার বিদায় এবং ৩০ নেতার চিঠি সেই সতর্কবার্তাই দিয়ে গেল। রাজনীতিতে আপস করা যায়, কিন্তু ইতিহাস ও বিশ্বাসের সঙ্গে আপসের মূল্য খুবই চড়া হয়।  

লেখক: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রায় দুই বছর ভারতে অবস্থানের পর দেশে ফিরে তাঁর আত্মসমর্পণের...
চীনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ–সম্পৃক্ততা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সীমা ছাড়িয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সফর ছিল...
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে এবার আপনিও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন—এটি মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত এবং পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। জীবনের...
প্রতিশ্রুতি আছে, পরিকল্পনা নেই— বাস্তবায়ন তো দূরের কথা! জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান,...
রাজধানীর ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দ্রুতগামী অজ্ঞাত এক গাড়ির ধাক্কায় সেকান্দার আলী নামে এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
খাবার আর ওষুধসহ নানা খাতে ব্যয় বৃদ্ধিতে বিপাকে বগুড়ার মুরগির খামার ও হ্যাচারি ব্যবসায়ীরা। জেলার ৫ হাজারেরও বেশি খামার ও হ্যাচারি মধ্যে, গত ৩ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে সাড়ে ৪ হাজার প্রতিষ্ঠান। এতে বেকার...
১১ কর্মকর্তার দায়িত্ব একজনের হাতে!
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। অফিসের করণিক,...
খাগড়াছড়িতে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলার এলজিইডি নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি সড়কের ২১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহালছড়ির মুবাছড়ি ও পানছড়ির নালকাটায়...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর