আমরা ইন্টারনেটে যা দেখি, তার কতটা আসলে সত্যি? একটি খবর মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার লাইক আর শেয়ার পাচ্ছে মানেই কি তা ধ্রুব সত্য? না। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সত্যের চেয়ে মিথ্যার গতি বেশি। আপনি হয়তো অজান্তেই কোনো এক তথ্যযুদ্ধের শিকারে পরিণত হচ্ছেন। বিখ্যাত গণমাধ্যমগুলোর হুবহু নকল করে হয়তো আপনার সামনে পরিবেশন করা হচ্ছে বিষাক্ত ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর। আর এই বিষ ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে এক অদৃশ্য বট বাহিনী। কিন্তু কীভাবে কাজ করে এই চক্র? কীভাবে চিনবেন এদের?
ফেক নিউজ কীভাবে বিপদ ডেকে আনে?
শুরুতেই জেনে নেওয়া প্রয়োজন, একটি ফেক নিউজ আপনার জীবনে কী বিপদ ডেকে আনতে পারে। ফেক নিউজ শুধু ভুল তথ্য নয়, এটি একটি পরিকল্পিত অস্ত্র। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই মিথ্যা খবরগুলো মূলত তিনটি ভয়ংকর উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়:
১. রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল বা বিরোধী পক্ষকে কোণঠাসা করা বা নির্বাচনের আগে জনমতকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়া।
২. ধর্মীয় ও সামাজিক বিদ্বেষ তৈরি করতে ভুল তথ্য দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেওয়া।
৩. কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করতে বা নামী প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা, যা গণমাধ্যম এবং পাঠক—উভয়ের জন্যই এক চরম হুমকি তৈরি করতে পারে।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ শবনম আযীমের মতে, যখন কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা ছড়ানো হয়, তখন মানুষ তা সহজে বিশ্বাস করে ফেলে। আর এটি সমাজের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনে।
বট বাহিনী কি রোবট নাকি মানুষ?
ফেক নিউজ ইন্টারনেটের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেয় বট বাহিনী। ‘বট’ শব্দটি এসেছে মূলত রোবট থেকে। এটি মূলত একটি সফটওয়্যার প্রোগ্রাম যা ইন্টারনেটে মানুষের মতো আচরণ করে। এরা মূলত দুই ধরনের হয়:
অটোমেটেড বট: এগুলো সম্পূর্ণ কম্পিউটারচালিত। নির্দিষ্ট কি-ওয়ার্ড দেখলেই এরা আগে থেকে সেট করা কমেন্ট পোস্ট করে দেয়। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বটগুলো মানুষের মতোই প্রাসঙ্গিক কমেন্ট লিখতে পারে। এগুলো আরও বেশি ভয়ংকর।
হিউম্যান ট্রল আর্মি: এরা আসলে মানুষ, যারা টাকা বা রাজনৈতিক স্বার্থে ১০ থেকে ২০টি ভুয়া আইডি নিয়ন্ত্রণ করে এবং নির্দেশপাওয়ামাত্র দলবেঁধে কোনো পোস্টের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বট বাহিনীর কাজের কৌশল
বট বাহিনী মূলত তিনটি কৌশলে আমাদের মস্তিষ্ক নিয়ে খেলা করে—ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট, চরিত্র হনন এবং ডিজিটাল অ্যাটাক। কোনো একটি পোস্টে শত শত পজিটিভ বা নেগেটিভ কমেন্ট দেখে সাধারণ মানুষ ভাবতে শুরু করে যে, ওটাই হয়তো সঠিক জনমত। আর এটিকেই বলা হয় ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের চরিত্র হননের জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে হাজার হাজার ভুয়া আইডি থেকে অপবাদ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ডিজিটাল অ্যাটাকের মাধ্যমে কোনো আইডি বা পেজ বন্ধ করতে হাজার হাজার ‘রিপোর্ট’ করা হয়; ফেসবুক বা মেটার ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার’।
কীভাবে চিনবেন এদের?
বট বাহিনী চেনা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে খেয়াল করলেই আপনি এদের উপস্থিতি বুঝতে পারবেন।
সময়জ্ঞান: খবর বা পোস্ট প্রকাশের ৫ সেকেন্ডের মধ্যে ১০০ কমেন্ট চলে এলে বুঝবেন এটি কোনো মানুষের কাজ নয়।
কপি-পেস্ট: যদি দেখেন ১০-১৫ জন আলাদা মানুষের কমেন্ট হুবহু এক, তবে নিশ্চিত সেটি বট।
প্রোফাইল পরীক্ষা: বট প্রোফাইলে সাধারণত ব্যক্তিগত ছবি থাকে না। ফুল, পাখি বা তারকার ছবিই বেশি থাকে। টাইমলাইনে নিজস্ব পোস্টের বদলে শুধু শেয়ার করা পোস্ট দেখা যায়।
ইন্টারনেটে কোনো তথ্যে লাইক বা কমেন্টের সংখ্যা দেখে উত্তেজিত হওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন—এটি কি সত্য, নাকি স্ক্রিপ্টেড প্রোপাগান্ডা? মনে রাখবেন, আপনার একটি ভুল শেয়ারে বিভ্রান্ত হতে পারে আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষটিও।



