হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হোস্টেল কক্ষ থেকে যাত্রা শুরু। সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ বৈশ্বিক যোগাযোগের সবচেয়ে প্রভাবশালী এক প্ল্যাটফর্ম। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা ফেসবুক ২২ বছরে পা দিয়েছে। দুই দশকের বেশি সময়ে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু মানুষের কথা বলার ধরনই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে সংবাদ, রাজনীতি, ব্যবসা ও বিনোদন, প্রায় সবকিছুর গতিপথ।
হোস্টেল রুম থেকে বিশ্বমঞ্চ
ফেসবুকের জন্ম হয়েছিল হার্ভার্ডের শিক্ষার্থী মার্ক জাকারবার্গ ও তাঁর কয়েকজন বন্ধুর হাত ধরে। প্রথমে নাম ছিল ‘দ্য ফেসবুক’। উদ্দেশ্য ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করা। অল্প সময়ের মধ্যেই হার্ভার্ড ছাড়িয়ে ইয়েল, স্ট্যানফোর্ডসহ যুক্তরাষ্ট্রের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে প্ল্যাটফর্মটি। এরপর ধাপে ধাপে সবার জন্য উন্মুক্ত হয় ফেসবুক। সেই বিস্তার থামেনি আর।
বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া প্ল্যাটফর্ম
ফেসবুকের সবচেয়ে বড় অবদান, ‘বন্ধুত্ব’ ধারণাটিকে ডিজিটাল রূপ দেওয়া। আগে যাদের সঙ্গে দেখা, সাক্ষাৎ সীমিত ছিল, ফেসবুক তাদের কাছাকাছি এনেছে। জন্মদিনের শুভেচ্ছা থেকে শুরু করে দূরের আত্মীয়ের খোঁজ, সবই এখন এক ক্লিক দূরে। ছবি, স্ট্যাটাস, মন্তব্য আর ‘লাইক’, এই সাধারণ টুলগুলোই ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
নিউজফিড থেকে রিলস
শুরুর দিকে ফেসবুক মানেই ছিল প্রোফাইল আর নিউজফিড। সময়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা ফিচার, ফটো অ্যালবাম, গ্রুপ, পেজ, ইভেন্ট। ২০১৬ সালে লাইভ ভিডিও ফিচার যুক্ত হয়ে কনটেন্টের ধরন বদলে দেয়। পরে স্টোরি, আর সাম্প্রতিক সময়ে রিলস, যা টিকটকের জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিতে আনা হয়েছে। এই বিবর্তন দেখায়, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে ফেসবুক কীভাবে নিজেকে নতুন করে সাজিয়েছে।
সংবাদ ও রাজনীতিতে প্রভাব
ফেসবুক কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, এটি এক বড় সংবাদ প্ল্যাটফর্মও বটে। অনেক মানুষের জন্য খবর জানার প্রথম উৎস এখন ফেসবুক। সংবাদমাধ্যমগুলো পাঠকের কাছে পৌঁছাতে ফেসবুককে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে রাজনীতিতেও এর প্রভাব গভীর। নির্বাচন, প্রচারণা, আন্দোলন, সবকিছুতেই ফেসবুক বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে এই প্রভাব নিয়ে বিতর্কও কম নয়।
বিতর্ক, গোপনীয়তা ও ভুয়া খবর
২২ বছরের পথচলায় ফেসবুককে ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই। ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষা, ডেটা অপব্যবহার, ভুয়া খবর ছড়ানো, এমন অভিযোগ বারবার উঠেছে। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি ফেসবুকের বিশ্বাসযোগ্যতায় বড় ধাক্কা দেয়। এরপর নানা নীতিমালা, অ্যালগরিদম পরিবর্তন আর কনটেন্ট মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমালোচনা পুরোপুরি থামেনি।
ব্যবসা ও বিজ্ঞাপনের নতুন দিগন্ত
ফেসবুক ছোট ব্যবসার জন্য খুলে দিয়েছে বিশাল বাজার। পেজ, গ্রুপ আর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এখন বড় অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছাতে পারছেন। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা এক নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। অনেকের জীবিকার উৎস এখন এই প্ল্যাটফর্ম।
মেটার পথে যাত্রা
২০২১ সালে ফেসবুকের মূল কোম্পানি নাম বদলে হয় মেটা। লক্ষ্য ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটি ও মেটাভার্স। যদিও ফেসবুক নামটি এখনো সবচেয়ে পরিচিত ব্র্যান্ড, তবু এই পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার। বাস্তব আর ভার্চ্যুয়াল জগতের মেলবন্ধন ঘটাতে মেটার এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে।
আমাদের দেশে ফেসবুকের প্রভাব
বাংলাদেশে ফেসবুকের ব্যবহার ব্যাপক। যোগাযোগ, সংবাদ, বিনোদন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আলোচনা, সবখানেই ফেসবুক উপস্থিত। অনেক তরুণের প্রথম ইন্টারনেট অভিজ্ঞতা ফেসবুক দিয়েই। একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচারের ঝুঁকিও এখানে বড় চ্যালেঞ্জ।
২২ বছরে পা দিয়ে ফেসবুক এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন প্রতিযোগিতা তীব্র। টিকটক, ইউটিউব, এক্সসহ নানা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। তরুণদের ধরে রাখা, বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরানো আর নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করেই ফেসবুককে এগোতে হবে।



