প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৩, ০২:২৮ পিএমআপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ১১:১৩ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলা মাতামাতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ইলন মাস্কদের মতো প্রযুক্তি খাতের নেতৃস্থানীয়দের। ছবি: সংগৃহীত
চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন বিশ্ব মাতাচ্ছে। সময়ে সময়ে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমাগত উন্নত সংস্করণ। আর তা নিয়ে মেতে থাকছে এই ছোট্ট গ্রহের মানুষেরা। অথচ এই মাতামাতি নিয়েই আপত্তি ইলন মাস্ক-স্টিভ ওজনিয়াকদের মতো প্রযুক্তি খাতের নেতৃস্থানীয়দের। কিন্তু কেন চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমনে মাথায় হাত মান্যবরদের? শুধুই কি নিজেদের তেমন পণ্য এখনো তৈরি হয়নি বলে? নাকি মনুষ্যজাতির আশু দুর্যোগের শঙ্কা?
ওপরের এতগুলো প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়। সুতরাং লেখা কিছুটা দীর্ঘ হবে, সেই আশঙ্কা আপনারা করতেই পারেন। তবে সুনির্দিষ্ট উত্তরে যাওয়ার আগে চলুন এসব প্রশ্নের উদ্ভবের পটভূমি একটু জেনে নেওয়া যাক।
শুরুতেই আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রসঙ্গ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো যেকোনো কম্পিউটিং মেশিনের এমন এক ধরনের দক্ষতা, যা বিপুল পরিমাণের তথ্য থেকে শিখতে পারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এবং এই বিপুল তথ্যের ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের মতো করেই যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে অবলীলায়। গত শতক থেকে শুরু হওয়া তথ্য-প্রযুক্তি খাতের অভাবিত উন্নতির যে পরিক্রমা, তাতে মানুষের আগ্রহ অনেকটাই কেন্দ্রিভূত রোবটিকস ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে। রোবটিকসে সাফল্য একেবারে কম আসেনি। এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পালা। হুট করেই চ্যাটজিপিটি এই খাতে অভাবনীয় পালাবদলের আগমনী বার্তা শুনিয়েছে। এবং একজন না-মানুষের মানুষের মতো কথোপকথনেই যারপরনাই মুগ্ধ বিশ্ববাসী। প্রাথমিক সংস্করণের পর জিপিটি ফোরও এরই মধ্যে মুক্তি পেয়ে গেছে। আর তাতেই জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে সতকর্তার লাল বাতি।
গত মার্চ মাসে প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতের হাজারের বেশি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর করা একটি খোলা চিঠি বিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই চিঠিতে সই করেছেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী, টেসলা ও টুইটারের মালিক ইলন মাস্ক এবং ট্রিলিয়ন ডলারের টেকজায়ান্ট অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ওজনিয়াকের মতো ব্যক্তিরা। তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কর্মপরিসর ক্রমশ বাড়ছে এবং এই বৃদ্ধির হার অত্যন্ত দ্রুত গতির। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রবৃদ্ধি যে হারে হচ্ছে, তাতে এর স্রষ্টাদের পক্ষেই একে নিয়ন্ত্রণ করা বা এ সম্পর্কে পূর্বানুমান করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেসব প্রযুক্তিবিদ তৈরি করছেন, তাঁরা কখনোই এটি দাবি করতে পারেননি যে, তাঁরা একে হাতের তালুর মতো চেনেন। এবং এসব কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আশীর্বাদের বদলে ক্রমে অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি অন্তত ছয় মাসের জন্য ধীর করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন খোলা চিঠি লেখা হাজারের বেশি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তাঁদের মূল প্রস্তাব হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে ধীরে চলো নীতি নেওয়া। যাতে করে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার খুঁটিনাটি আরও বিস্তৃতভাবে বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হতে পারে।
এই চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। এক পক্ষ চাইছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের গতি ধীর করে দিতে। আর অন্য পক্ষ বলছে, নতুন প্রযুক্তিতে ভীত হওয়া মানেই পিছিয়ে যাওয়া। অতীতেও এমনটা দেখা গেছে এবং তাতে আখেরে লাভ কিছুই হয়নি। সুতরাং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমাগত উন্নয়নের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই।
দুই পক্ষের যুক্তিগুলোই এবার খুঁটিয়ে দেখা যাক।
যাঁরা এআই-এর শনৈ শনৈ উন্নতিতে ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখছেন, তাঁদের প্রধান যুক্তি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনো মানুষ আয়ত্ত করতে পারেনি। প্রত্যেক ধাপেই এত বেশি এগোচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে এর খুঁটিনাটি ভালো করে বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান চ্যাটজিপিটি (ওপেনএআই), বিং (মাইক্রোসফট) বা বার্ডের (গুগল) মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করছে, তারাও এটি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছে। অর্থাৎ, এমন একটি পণ্য তৈরি হচ্ছে যার লাগাম মানুষের হাতে নেই। আর এখানটাতেই সংশয়বাদীদের মূল আপত্তি। তাঁদের বক্তব্য হলো, যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবাধ ব্যবহারে কোনো শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবস্থা নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করে এবং বাজে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন কী হবে? তাই সবার আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ‘কিল সুইচ’ মানুষের হাতে থাকতে হবে।
গত শতক থেকে শুরু হওয়া গবেষণার হাত ধরে রোবোটিকসে অনেক উন্নতি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ভাবনা ও আচরণকে প্রভাবিত করে ভুল পথে চালিত করার শঙ্কাও আছে। এরই মধ্যে জানা গেছে, সবজান্তা চ্যাটজিপিটিও ভুল তথ্য সরবরাহ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও আস্থা তুঙ্গে থাকার ফাঁকফোকরে এভাবে ভুল তথ্য ও গুজব ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাতে পুরো পৃথিবীর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্টের আশঙ্কাও আছে। এমনকি কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করা, নানা ধরনের ফিশিং ইত্যাদি ধরনের অপরাধের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নৈতিকতার স্থান এখনো আছে ন্যূনতম পর্যায়ে। চাহিবামাত্র যেকোনো তথ্য সেটি সরবরাহ করে যাচ্ছে। নির্মাতারা যদিও বলছেন, কিছু ফিল্টারিং চালু আছে, তবে তার নিরাপত্তা নিয়ে এখনো পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হওয়া যায়নি। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হলো, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে মডেল দেখা যাচ্ছে, তা শতভাগ নির্ভুল থাকার নিশ্চয়তা দেয় না।
আবার ইউরোপ বা চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত আইনি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো বেশ খানিকটা প্রতিষ্ঠিত হলেও মার্কিন মুলুক সেখানে ঢের পিছিয়ে। সমালোচকেরা বলছেন, এই কারণেও মূলত সাম্প্রতিক এই খোলা চিঠির আত্মপ্রকাশ। মার্কিনিরা চাইছে নিজেদের প্রস্তুত হওয়ার সময় নিতে। যেহেতু এখনো পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির দৌড়ে প্রকাশ্যে এগিয়ে আছে পশ্চিমারাই, তাই এর আইনি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরিতে নিজেদের পিছিয়ে থাকার অসংগতিটাকে মার্কিনিরা শুধরে নিতে চাইছে।
আর এই জায়গাতেই দ্বিতীয় পক্ষটি বলছে, চাইলেও কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চীনাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যাবে? তাঁদের যুক্তি, কখনোই নতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এভাবে সময় বেঁধে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এতে গোপনে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়বে এবং সেটি শুধু চীন নয়, বরং পশ্চিমাদের বিভিন্ন শাখা-উপশাখারও মধ্যেও চলবে। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি আরও বেশি হবে এবং প্রযুক্তি খাতে সৃষ্টি হবে এক চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। এর চেয়ে বর্তমানের স্বাভাবিক গতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতি চালাতে থাকলে সেটি দিয়ে বিশ্বের বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উপকার করা যাবে।
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস যেমন বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সহায়তা করা যাবে। একই সঙ্গে তাঁর যুক্তি হলো, এআই নতুন নতুন ওষুধ তৈরিতে বিজ্ঞানীদের দারুণভাবে সহায়তা করতে পারবে। এতে আখেরে মানুষেরই লাভ হবে। আবার ই-মেইল পড়া বা মিটিংয়ের সময়সূচি ঠিক করার মতো বেশ কিছু আয়াসসাধ্য কাজের দায়িত্ব নিয়ে নিতে পারবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফলে মানুষের পক্ষে আরও সৃষ্টিশীল কাজের জন্য সময় বের করা সহজ হয়ে যাবে। এমনকি মানবসমাজের আরও মানবিক হয়ে ওঠার সুযোগও মিলবে।
একটি বিষয় খেয়াল করলে দেখা যাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ছয় মাসের জন্য যাঁরা লাগাম পরাতে চাইছেন, তাঁদের মোড়লদের কাছে এই পণ্যটি আদতে নেই। আবার যাঁরা লাগাম পরাতে চাইছেন না (এই পক্ষের প্রভাবশালী সদস্য বিশেষ করে গুগল, মাইক্রোসফট বা ওপেনএআই), তাঁরা এরই মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত পণ্য বাজারে ছেড়ে দিয়েছেন। এ থেকে পাঠকেরা ‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’ ঘরানার প্রবাদ আওড়ালে দোষের কিছু নেই। নাচের তাল-ছন্দ আয়ত্ত করতে না পারাটা তাদের আপত্তির অন্যতম কারণ হতেই পারে। কারণ, পুঁজিবাদী এই বিশ্বে বর্তমানে বাণিজ্যের মূল হাল প্রযুক্তি খাতের হাতে এবং এই খাতের বর্তমানের ‘হট প্রডাক্ট’ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সুতরাং এর বাণিজ্যে যারা এগিয়ে থাকবে, তারাই হবে ভবিষ্যতের নেতা।
ইলন মাস্ক। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আশঙ্কার পুরোটাই যে জল্পনা, তা মোটেই নয়। এতক্ষণের আলোচনায় দুই পক্ষের যুক্তি নিশ্চয়ই সবার বোধগম্য হয়েছে। আসল কথা হলো, কোনো পক্ষই পুরোপুরি অযৌক্তিকভাবে নিজেদের দাবি উপস্থাপন করেনি। যত যাই বলুন না কেন, টারমিনেটর সিরিজের ছবি পর্দায় দেখলে যতটা রোমাঞ্চ বোধ হয়, সেই একই বাস্তবতা নিজের জীবনে দেখলে নিশ্চয়ই বন্দুকের নল বা পরমাণু বোমার আগুনের মুখে দাঁড়িয়ে ওই ঠোঁটে হাসি ফুটবে না, তাই না?
আর ঠিক এই ধাঁধাঁতে এসেই আটকে যাচ্ছে সব সিদ্ধান্ত। বলতে সংশয় নেই যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন প্রশ্নে পুরো মানবজাতির সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই আজ দ্বিধান্বিত। সবাই এক মঞ্চে এসে কোনো সম্মিলিত সিদ্ধান্তে শেষমেষ পৌঁছাতে আদৌ পারে কিনা, সেটিই এখন দেখার! নইলে হয়তো আজকের সাই-ফাই মুভিতে দেখানো মানবজাতির সংকটই হয়ে যাবে আরও ৫০ বা ১০০ বছর পরের নিদারুণ বাস্তবতা। লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেস্কটপে ফেসবুক ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেয়। প্রায় ২ ঘণ্টা পর স্বাভাবিক হয়েছে কার্যক্রম, তবে মোবাইল অ্যাপে সচল ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি।
চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কনফারেন্স (ডাব্লিউএআইসি) ২০২৬’-এ অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। সম্মেলনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও...
দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ভিভোর নতুন স্মার্টফোন ভিভো ওয়াই৫০০। বড় ব্যাটারি, উচ্চ রিফ্রেশ রেটের ডিসপ্লে এবং এআইভিত্তিক ক্যামেরা সুবিধা নিয়ে এসেছে ডিভাইসটি। তাদের ফোনটিতে রয়েছে এই...
দেশের রাস্তায় এক হাজারের বেশি নিউ এনার্জি ভেহিকেল (এনইভি) চলার মাইলফলক অর্জন করেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি। এ উপলক্ষে রাজধানীর রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে ‘ড্রিভেন বাই...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজন জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের মূল হোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৯। সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জে র্যাব-৯-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র্যাব কর্মকর্তারা।
বেলুচিস্তানের খোজদার জেলার জিদিতে চালানো এক অভিযানে ১৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। বেলুচিস্তান পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০...
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতিতে ইলন মাস্কদের কেন মাথায় হাত?
চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন বিশ্ব মাতাচ্ছে। সময়ে সময়ে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমাগত উন্নত সংস্করণ। আর তা নিয়ে মেতে থাকছে এই ছোট্ট গ্রহের মানুষেরা। অথচ এই মাতামাতি নিয়েই আপত্তি ইলন মাস্ক-স্টিভ ওজনিয়াকদের মতো প্রযুক্তি খাতের নেতৃস্থানীয়দের। কিন্তু কেন চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমনে মাথায় হাত মান্যবরদের? শুধুই কি নিজেদের তেমন পণ্য এখনো তৈরি হয়নি বলে? নাকি মনুষ্যজাতির আশু দুর্যোগের শঙ্কা?
ওপরের এতগুলো প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়। সুতরাং লেখা কিছুটা দীর্ঘ হবে, সেই আশঙ্কা আপনারা করতেই পারেন। তবে সুনির্দিষ্ট উত্তরে যাওয়ার আগে চলুন এসব প্রশ্নের উদ্ভবের পটভূমি একটু জেনে নেওয়া যাক।
শুরুতেই আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রসঙ্গ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো যেকোনো কম্পিউটিং মেশিনের এমন এক ধরনের দক্ষতা, যা বিপুল পরিমাণের তথ্য থেকে শিখতে পারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এবং এই বিপুল তথ্যের ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের মতো করেই যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে অবলীলায়। গত শতক থেকে শুরু হওয়া তথ্য-প্রযুক্তি খাতের অভাবিত উন্নতির যে পরিক্রমা, তাতে মানুষের আগ্রহ অনেকটাই কেন্দ্রিভূত রোবটিকস ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে। রোবটিকসে সাফল্য একেবারে কম আসেনি। এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পালা। হুট করেই চ্যাটজিপিটি এই খাতে অভাবনীয় পালাবদলের আগমনী বার্তা শুনিয়েছে। এবং একজন না-মানুষের মানুষের মতো কথোপকথনেই যারপরনাই মুগ্ধ বিশ্ববাসী। প্রাথমিক সংস্করণের পর জিপিটি ফোরও এরই মধ্যে মুক্তি পেয়ে গেছে। আর তাতেই জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে সতকর্তার লাল বাতি।
গত মার্চ মাসে প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতের হাজারের বেশি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর করা একটি খোলা চিঠি বিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই চিঠিতে সই করেছেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী, টেসলা ও টুইটারের মালিক ইলন মাস্ক এবং ট্রিলিয়ন ডলারের টেকজায়ান্ট অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ওজনিয়াকের মতো ব্যক্তিরা। তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কর্মপরিসর ক্রমশ বাড়ছে এবং এই বৃদ্ধির হার অত্যন্ত দ্রুত গতির। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রবৃদ্ধি যে হারে হচ্ছে, তাতে এর স্রষ্টাদের পক্ষেই একে নিয়ন্ত্রণ করা বা এ সম্পর্কে পূর্বানুমান করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেসব প্রযুক্তিবিদ তৈরি করছেন, তাঁরা কখনোই এটি দাবি করতে পারেননি যে, তাঁরা একে হাতের তালুর মতো চেনেন। এবং এসব কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আশীর্বাদের বদলে ক্রমে অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি অন্তত ছয় মাসের জন্য ধীর করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন খোলা চিঠি লেখা হাজারের বেশি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তাঁদের মূল প্রস্তাব হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে ধীরে চলো নীতি নেওয়া। যাতে করে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার খুঁটিনাটি আরও বিস্তৃতভাবে বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হতে পারে।
এই চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। এক পক্ষ চাইছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের গতি ধীর করে দিতে। আর অন্য পক্ষ বলছে, নতুন প্রযুক্তিতে ভীত হওয়া মানেই পিছিয়ে যাওয়া। অতীতেও এমনটা দেখা গেছে এবং তাতে আখেরে লাভ কিছুই হয়নি। সুতরাং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমাগত উন্নয়নের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই।
দুই পক্ষের যুক্তিগুলোই এবার খুঁটিয়ে দেখা যাক।
যাঁরা এআই-এর শনৈ শনৈ উন্নতিতে ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখছেন, তাঁদের প্রধান যুক্তি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনো মানুষ আয়ত্ত করতে পারেনি। প্রত্যেক ধাপেই এত বেশি এগোচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে এর খুঁটিনাটি ভালো করে বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান চ্যাটজিপিটি (ওপেনএআই), বিং (মাইক্রোসফট) বা বার্ডের (গুগল) মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করছে, তারাও এটি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছে। অর্থাৎ, এমন একটি পণ্য তৈরি হচ্ছে যার লাগাম মানুষের হাতে নেই। আর এখানটাতেই সংশয়বাদীদের মূল আপত্তি। তাঁদের বক্তব্য হলো, যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবাধ ব্যবহারে কোনো শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবস্থা নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করে এবং বাজে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন কী হবে? তাই সবার আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ‘কিল সুইচ’ মানুষের হাতে থাকতে হবে।
গত শতক থেকে শুরু হওয়া গবেষণার হাত ধরে রোবোটিকসে অনেক উন্নতি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ভাবনা ও আচরণকে প্রভাবিত করে ভুল পথে চালিত করার শঙ্কাও আছে। এরই মধ্যে জানা গেছে, সবজান্তা চ্যাটজিপিটিও ভুল তথ্য সরবরাহ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও আস্থা তুঙ্গে থাকার ফাঁকফোকরে এভাবে ভুল তথ্য ও গুজব ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাতে পুরো পৃথিবীর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্টের আশঙ্কাও আছে। এমনকি কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করা, নানা ধরনের ফিশিং ইত্যাদি ধরনের অপরাধের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নৈতিকতার স্থান এখনো আছে ন্যূনতম পর্যায়ে। চাহিবামাত্র যেকোনো তথ্য সেটি সরবরাহ করে যাচ্ছে। নির্মাতারা যদিও বলছেন, কিছু ফিল্টারিং চালু আছে, তবে তার নিরাপত্তা নিয়ে এখনো পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হওয়া যায়নি। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হলো, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে মডেল দেখা যাচ্ছে, তা শতভাগ নির্ভুল থাকার নিশ্চয়তা দেয় না।
আবার ইউরোপ বা চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত আইনি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো বেশ খানিকটা প্রতিষ্ঠিত হলেও মার্কিন মুলুক সেখানে ঢের পিছিয়ে। সমালোচকেরা বলছেন, এই কারণেও মূলত সাম্প্রতিক এই খোলা চিঠির আত্মপ্রকাশ। মার্কিনিরা চাইছে নিজেদের প্রস্তুত হওয়ার সময় নিতে। যেহেতু এখনো পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির দৌড়ে প্রকাশ্যে এগিয়ে আছে পশ্চিমারাই, তাই এর আইনি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরিতে নিজেদের পিছিয়ে থাকার অসংগতিটাকে মার্কিনিরা শুধরে নিতে চাইছে।
আর এই জায়গাতেই দ্বিতীয় পক্ষটি বলছে, চাইলেও কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চীনাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যাবে? তাঁদের যুক্তি, কখনোই নতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এভাবে সময় বেঁধে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এতে গোপনে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়বে এবং সেটি শুধু চীন নয়, বরং পশ্চিমাদের বিভিন্ন শাখা-উপশাখারও মধ্যেও চলবে। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি আরও বেশি হবে এবং প্রযুক্তি খাতে সৃষ্টি হবে এক চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। এর চেয়ে বর্তমানের স্বাভাবিক গতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতি চালাতে থাকলে সেটি দিয়ে বিশ্বের বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উপকার করা যাবে।
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস যেমন বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সহায়তা করা যাবে। একই সঙ্গে তাঁর যুক্তি হলো, এআই নতুন নতুন ওষুধ তৈরিতে বিজ্ঞানীদের দারুণভাবে সহায়তা করতে পারবে। এতে আখেরে মানুষেরই লাভ হবে। আবার ই-মেইল পড়া বা মিটিংয়ের সময়সূচি ঠিক করার মতো বেশ কিছু আয়াসসাধ্য কাজের দায়িত্ব নিয়ে নিতে পারবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফলে মানুষের পক্ষে আরও সৃষ্টিশীল কাজের জন্য সময় বের করা সহজ হয়ে যাবে। এমনকি মানবসমাজের আরও মানবিক হয়ে ওঠার সুযোগও মিলবে।
একটি বিষয় খেয়াল করলে দেখা যাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ছয় মাসের জন্য যাঁরা লাগাম পরাতে চাইছেন, তাঁদের মোড়লদের কাছে এই পণ্যটি আদতে নেই। আবার যাঁরা লাগাম পরাতে চাইছেন না (এই পক্ষের প্রভাবশালী সদস্য বিশেষ করে গুগল, মাইক্রোসফট বা ওপেনএআই), তাঁরা এরই মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত পণ্য বাজারে ছেড়ে দিয়েছেন। এ থেকে পাঠকেরা ‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’ ঘরানার প্রবাদ আওড়ালে দোষের কিছু নেই। নাচের তাল-ছন্দ আয়ত্ত করতে না পারাটা তাদের আপত্তির অন্যতম কারণ হতেই পারে। কারণ, পুঁজিবাদী এই বিশ্বে বর্তমানে বাণিজ্যের মূল হাল প্রযুক্তি খাতের হাতে এবং এই খাতের বর্তমানের ‘হট প্রডাক্ট’ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সুতরাং এর বাণিজ্যে যারা এগিয়ে থাকবে, তারাই হবে ভবিষ্যতের নেতা।
ইলন মাস্ক। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আশঙ্কার পুরোটাই যে জল্পনা, তা মোটেই নয়। এতক্ষণের আলোচনায় দুই পক্ষের যুক্তি নিশ্চয়ই সবার বোধগম্য হয়েছে। আসল কথা হলো, কোনো পক্ষই পুরোপুরি অযৌক্তিকভাবে নিজেদের দাবি উপস্থাপন করেনি। যত যাই বলুন না কেন, টারমিনেটর সিরিজের ছবি পর্দায় দেখলে যতটা রোমাঞ্চ বোধ হয়, সেই একই বাস্তবতা নিজের জীবনে দেখলে নিশ্চয়ই বন্দুকের নল বা পরমাণু বোমার আগুনের মুখে দাঁড়িয়ে ওই ঠোঁটে হাসি ফুটবে না, তাই না?
আর ঠিক এই ধাঁধাঁতে এসেই আটকে যাচ্ছে সব সিদ্ধান্ত। বলতে সংশয় নেই যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন প্রশ্নে পুরো মানবজাতির সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই আজ দ্বিধান্বিত। সবাই এক মঞ্চে এসে কোনো সম্মিলিত সিদ্ধান্তে শেষমেষ পৌঁছাতে আদৌ পারে কিনা, সেটিই এখন দেখার! নইলে হয়তো আজকের সাই-ফাই মুভিতে দেখানো মানবজাতির সংকটই হয়ে যাবে আরও ৫০ বা ১০০ বছর পরের নিদারুণ বাস্তবতা।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন