নাইজেরিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার এগুসি স্যুপ। এগুসি মেলন সিড (শসা বা তরমুজ জাতীয় ফলের বীজ) থেকে তৈরি হয় ঘন, সুগন্ধযুক্ত এই খাবারটি। সম্প্রতি এই এগুসি মেলনের কিছু বীজ মহাকাশ ঘুরে এসেছে। কক্ষপথে ৭ দিন প্রদক্ষিণ করার পর অবশেষে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বীজগুলোকে। মহাকাশীয় পরিবেশ এই বীজগুলোর ওপর কতটা প্রভাব ফেলে তা জানতেই এগুলোকে পাঠানো হয়েছিল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস)।
চলতি মাসের শুরুতে ফ্লোরিডায় অবস্থিত নাসা’র কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপিত একটি মহাকাশযানে (ক্যাপসুলে) করে এই এগুসি বীজগুলোকে পাঠানো হয়েছিল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। এই গবেষণা মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, মহাকাশের পরিবশে এই বীজগুলোর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা।
এই গবেষণার জন্য এগুসি মেলনের বীজগুলোকে বাছাই করেছেন নাইজেরিয়ার লাগোস-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘স্পেস ইন আফ্রিকা’-এর প্রতিষ্ঠাতা, নাইজেরিয়ান উদ্যোক্তা টেমাইডায়ো ওনিওসুন।
গবেষণাটির উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে মানুষ যখন চাঁদে বা মঙ্গলে বসবাস করবে এবং খাবার উৎপাদন করার কথা ভাববে, তখন আফ্রিকার স্থানীয় খাবারগুলোও যেন সেই তালিকায় থাকে।…সুতরাং, ৫০ বছর পরেও যদি আফ্রিকানরা চাঁদে বসবাস করে, আমরা চাই তারা যেন এগুসি উৎপাদন ও চাষ করতে পারে।’
উল্লেখ্য, মানবদেহে প্রোটিনের দারুন একটি উৎস হতে পারে এগুসি মেলনের বীজ। ভবিষ্যতে মহাকাশে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানকালে একে সম্ভাব্য খাবারের একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গত ১ আগস্ট ক্রু-১১ মহাকাশযানের মাধ্যমে বিশ্বের বেশ কিছু অঞ্চলের বীজ বিশেষায়িত টেস্ট টিউবে ভরে নিয়ে যাওয়া হয় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। কোস্টারিকা, গুয়াতেমালা, আর্মেনিয়া ও পাকিস্তানের প্রচলিত, স্থানীয় কিছু বীজের পাশাপাশি ছিল নাইজেরিয়া তথা পশ্চিম আফ্রিকার সুপরিচিত এগুসি মেলনের বীজও।
এই গবেষণা প্রকল্পের অন্যতম গবেষক ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডার বিজ্ঞানী ওয়াগনার ভেনড্রাম বলেছেন যে, বর্তমানে মহাকাশে বহুল-ব্যবহৃত অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত, হিমায়িত শুকনো খাবারের তুলনায় ভবিষ্যতে নভোচারীদের জন্য আরও উন্নত মানের, বিভিন্ন ধরনের খাবারের প্রয়োজন হবে।
ভেনড্রাম আরও জানান, ‘নিজের হাতে লেটুস, টমেটো বা তরমুজ মহাকাশে চাষ করতে পারা শুধু তাদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, প্রক্রিয়াজাত খাবারের চেয়ে তাজা ফল খাওয়ার মনস্তাত্ত্বিক ইতিবাচক প্রভাবও রয়েছে।’
দক্ষিণ-পশ্চিম নাইজেরিয়ার ওয়ো রাজ্যের বাজার থেকে মহাকাশে পাঠানো এগুসি বীজগুলোকে বাছাই করেছিলেন টেমাইডায়ো ওনিওসুন নিজেই। এ বিষয়ে তিনি জানান যে, এগুসি বীজগুলোকে শুধু এগুলোর পুষ্টিগুণের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন করা হয়নি, বরং এর সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী গুরুত্বও বিবেচনা করা হয়েছে।
ওনিওসুন বলেন, ‘নাইজেরিয়ার সবাই এগুসি খায়, এমনকি পশ্চিম আফ্রিকার কিছু দেশের অধিবাসী এবং বিদেশে থাকা আফ্রিকানরাও এটি খায়। তাই এই গবেষণা মিশনের বিষয়বস্তুর সাথে তারা সহজেই একাত্ম হতে পারবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এগুসি এমন একটি বীজ যা আমাদের (আফ্রিকানদের) গল্প বলে।’
মহাকাশ থেকে ফিরে আসা বীজগুলোকে এখন গবেষকদের কাছে পাঠানো হচ্ছে,, যাতে করে এগুলোর ওপর মহাকাশীয় পরিবেশের প্রভাব পরীক্ষানিরীক্ষা করতে পারেন তাঁরা।
বিজ্ঞানী ওয়াগনার ভেনড্রাম জানিয়েছেন যে, বীজগুলোকে ইন ভিট্রো পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করানো হবে এবং মহাকাশে থাকার কারণে তাদের মধ্যে জেনেটিক কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা, তা নিয়ে গবেষণা করা হবে।
তিনি আরও বলেছেন, ‘উদ্ভিদ ও বীজগুলোর মধ্যে যে পরিবর্তন হয়েছে তা দেখে আমরা বুঝতে পারবো যে গাছগুলো কি এখনও আগের মতোই আছে? তারা কি নভোচারীদের জন্য এখনও একই মানের পুষ্টি সরবরাহ করবে?’
সার্বিকভাবে এগুসি বীজগুলোর অঙ্কুরোদগম থেকে শুরু করে এগুলোর ডিএনএ’তে কোনোরুপ পরিবর্তন হয়ে থাকলে সেগুলো চিহ্নিত করবেন গবেষকরা। তাঁরা বোঝার চেষ্টা করবেন ভবিষ্যতে মহাকাশে এগুসি মেলনের বীজ উৎপাদন করা যাবে কি-না এবং কোনো একদিন মহাকাশের মানব অধিবাসীদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় এগুসি বীজের স্যুপ স্থান পাবে কি-না।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, ফিজিক্স ডট অরগ্



