এক পায়ে দাঁড়িয়েও ম্যাচ জেতানো যায়। আজ মিরপুরে সেই অসাধ্যই করে দেখালেন স্পিনার আলিস আল ইসলাম। জয়ের জন্য শেষ বলে ৪ রানের প্রয়োজন ছিল চিটাগং কিংসের। তবে একটু আগেই পায়ে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া আলিস শেষ বল খেলার জন্য খুড়িয়ে খুড়িয়ে মাঠে প্রবেশ করলেন। এবং খুলনা টাইগার্সের মুশফিক হাসানকে কাভার দিয়ে মেরে ২ উইকেটের জয়ে দলকে ফাইনালে নিয়ে গেলেন।
১৬৪ রানের লক্ষ্যে নেমে ১২ ওভার শেষে ১০৫ রান তোলা চিটাগংয়ের ফাইনালে ওঠা সময়ের ব্যাপার মনে হয়েছিল। ৪৮ বলে ৫৯ রানের প্রয়োজন, হাতে ছিল ৮ উইকেট। তবে ফাইনালে যাওয়ার সহজ এই সমীকরণ আচমকা ছন্দ পতনে কঠিন করে ফেলেন চিটাগংয়ের ব্যাটসম্যানরা। খুলনা টাইগার্সের পেসারদের সামনে ২৫ রানের ব্যবধানে ৫ উইকেট হারিয়ে প্রায় ছিটকে গিয়েছিল চিটাগং। কিন্তু আরাফাত সানি, আলিস আল ইসলাম ও শরীফুল ইসলামের এলোপাথারি ব্যাট ছুড়ে মারাই ৬ বলে ১৫ রানের সমীকরণ মিলিয়ে দিয়েছে চিটাগংকে।
তারা করতে নেমে ছন্দে থাকা ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই মাত্র ৪ রান করে ফেরেন। হাসান মাহমুদের শর্ট অফ লেন্থে থাকা বল পুল করতে যান ইমন তবে গতির কারণে ঠিকমতো টাইমিং করতে পারেননি, মিড অনে থাকা মোহাম্মদ নওয়াজ সহজ সেই ক্যাচ নিতেও ভুল করেননি।
দলীয় ১৬ রানে চিটাগং প্রথম উইকেট হারালেও আরেক ওপেনার খাজা নাফি আজ ছিলেন ছন্দে। প্রথম কোয়ালিফায়ারে ২ বল খেলে আউট হয়ে যাওয়া নাফি খুলনার বোলারদের ওপর চড়াও হন। জেসন হোল্ডার-নাসুম আহমেদদের চার-ছয় মেরে প্রথম চার ওভারে চিটাগংয়ের স্কোরবোর্ডে ৩৫ রান তোলেন নাফি।
হাসান মাহমুদ ফের পঞ্চম ওভারে চিটাগংয়ের ডেরায় আঘাত হানেন। পুরো বিপিএলে সাড়ে তিন শ রানের ওপর রান করা গ্রাহাম ক্লার্ককে আজ মাত্র চার রানে ফেরান হাসান।
ডানহাতি পেসারের ইন সুইং ডেলিভারি ডিফেন্স করতে গিয়ে বোল্ড হয়ে যান ক্লার্ক। পাওয়ার প্লে শেষে আর কোনো উইকেট হারিয়ে ২ উইকেটে ৪৬ রান করে চিটাগং।
মাঝ ওভারে হোসেন তালাতকে সঙ্গে নিয়ে তৃতীয় উইকেটে ম্যাচের হাল ধরেন খাজা নাফি। দুই পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান মিলে খুলনার স্পিনারদের বেশি সুবিধা নিতে দেননি। উল্টো হোসেন তালাত ও নাফির প্রতিআক্রমণে চাপে পড়ে যায় খুলনা। ১০ ওভার শেষে ৮০ রান তুলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় চিটাগং।
ইনিংসের ১২তম ওভারেই এক শ রানও পূরণ করে ফেলে মোহাম্মদ মিঠুনের দল। জয়ের জন্য তখন চিটাগংয়ের প্রয়োজন ৪৮ বলে মাত্র ৫৯ রান, হাতে ছিল ৮ উইকেট। চিটাগংয়ের জয় যখন সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল, তখনই খুলনাকে ম্যাচে ফেরান স্পিনার নাসুম আহমেদ।
১৩তম ওভারে ২৫ বলে ৪০ রান করা হোসেন তালাত নাসুমকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিয়ে বসেন। হোসেন তালাত ফিরে যাওয়ার পর চিটাগংয়ের ইনিংসে ধস নামে। খুলনার বোলারদের ধারাবাহিক বোলিংয়ে কয়েক ওভারের ব্যবধানে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে কিংসের ব্যাটিং লাইনআপ।
১০৫ রানে ২ উইকেটে থেকে ১১৭ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বসে চিটাগং। তালাত ফিরে যাওয়ার পর ‘দেশি ডি ভিলিয়ার্স’ খ্যাত শামিম পাটওয়ারি ক্রিজে টিকেছেন মাত্র ৭ বল। নাসুম আহমেদের বলে সুইপ খেলতে গিয়ে ৩০ গজের ভেতরই ক্যাচ দিয়ে ফেরেন শামিম।
বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান ফিরে যাওয়ার পরের ওভারে ফিফটি করা ওপেনার খাজা নাফিও প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন। মুশফিক হাসানের ১৬তম ওভারে ৫৭ রান করে নাফি বোল্ড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছিল চিটাগংয়ের ফাইনালে যাওয়ার আশা শেষ।
অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন ক্রিজে থাকায় কিছুটা আশা ছিল। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে হাসান মাহমুদের ১৭তম ওভারে ৮ বলে ৭ রান করে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন মিঠুন। ১৩০ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে বলতে গেলেই ছিটকে যায় চিটাগং।
তবে ১৮তম ওভারে আলিস আল ইসলাম জেসন হোল্ডারকে একটি চার ও একটি ছয় মেরে ম্যাচে ফেরার আভাস দেন। পরের ওভারে মাত্র ৬ রান এনলে সমীকরণ কঠিন হয়ে যায়। শেষ ওভারে দরকার ছিল ১৫ রান।
প্রথম বলেই চার মারেন সানী। পরের বলে দুই। তৃতীয় বলে দৌড়ে রান নইয়ে দ্বিতীয় রানের জন্য ঘুরতে গিয়ে আলিস পড়ে গিয়ে ব্যথা পান। শরীফুল নেমে প্রথম বলেই ফাইন লেগ দিয়ে চার মারলে কিংসের দরকার হয় ২ বলে চার রান। কিন্তু পরের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন শরীফুল। খোঁড়াতে খোঁড়াতে নামেন আলিস। পেসার মুশফিক হাসান অফ স্টাম্পের বাইরে লেংথ বল কড়ায় গায়ের জোরে ব্যাট চালিয়ে দেন, আর তাতেই জয়।
এর আগে ব্যাট করতে নেমে ফাইনালে উঠার ম্যাচে ইনিংসের শুরুতেই ছন্দপতন হয় খুলনা টাইগার্সের। ৪২ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে দ্রুত অলআউট হওয়ার শঙ্কা জাগে খুলনার। কিন্তু ক্যারিবিয়ান হার্ডহিটার শিমরন হেটমায়ার যেন আজ ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। হেটমায়ারের ৬ চার, ৪ ছক্কায় ৩৩ বলে ৬৩ রানের ইনিংসে ডুবতে থাকা খুলনা টাইগার্স লড়াইয়ের পুজি পেয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ ওভারে ৬ উইকেটে ১৬৩ রানের সংগ্রহ পায়।
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে ফাইনালে শিরোপার লড়াইয়ে নামবে চিটাগং।



