আফগানিস্তান-হংকং ম্যাচ দিয়ে আজ শুরু হচ্ছে এশিয়া কাপ। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠেয় টুর্নামেন্টের ১৭তম আসরটি হতে যাচ্ছে টি-টোয়েন্টি সংস্করণের। এবারের মহাদেশ সেরার লড়াইয়ে নামছে আট দল। প্রায় তিন সপ্তাহব্যাপী এ টুর্নামেন্টের পর্দা নামবে আগামী ২৮ সেপেম্বরের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ দিয়ে।
সেদিন কার হাতে শিরোপা উঠবে, টুর্নামেন্ট শুরুর আগ থেকেই এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানান হিসাব-নিকাশ। বিভিন্ন দলের শক্তি-দুর্বলতা টেনে একেকজন শিরোপার দৌড়ে একেক দলকে এগিয়ে রাখছেন।
শক্তি-সামর্থ্যের বিচারে সম্ভাবনা বেশি কার? টি-টোয়েন্টিতে মুহূর্তের ভেলকিতেই তো ম্যাচের দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে। সেই ভেলকি দেখাতে পারেন কারা? টুর্নামেন্টের আলো কেড়ে নিতে পারেন কারা? এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
ভারত:
এবারের এশিয়া কাপে সবচেয়ে বড় ফেবারিটের তকমা এ টুর্নামেন্টে ৮ বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতের গায়ে। বিশেষ করে দলটার দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক ব্যাটিং লাইন আপের কারণে এগিয়ে রাখতে হচ্ছে ভারতকে। সুরিয়াকুমার ইয়াদভ, আভিষেক শার্মা, তিলক ভার্মাদের মতো বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান আছেন দলটির টপ অর্ডারে।
ভারতের বোলিং লাইন আপও ভারসাম্যপূর্ণ। জাসপ্রিত বুমরা পেস আক্রমণে নেতৃত্ব দেবেন। কুলদীপ ইয়াদব ও ভারুণ চক্রবর্তী স্পিনে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পারেন। তবে দুর্বলতা হচ্ছে, বুমরা ছাড়া পেস আক্রমণে যারা আছেন, আমিরাতের কন্ডিশনে কতটুকু সুবিধা আদায় করতে পারেন, সেটাই দেখার।
ভারতের আরেকটি মাথাব্যথার কারণ হতে পারে চোট বা ফিটনেস ইস্যু। অধিনায়ক সুরিয়াকুমার ইয়াদভ সম্প্রতি চোট কাটিয়ে ফিরলেও মাঠে নিজের সেরা ফর্ম টেনে আনতে পারবেন কিনা, সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে! এছাড়া বুমরার ওয়ার্কলোডের বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে দলটিকে।
পাকিস্তান:
পাকিস্তান এমন একটা দল, যাদের নামের পাশে সেরা ফেবারিটের তকমা না থাকলেও তাদের একেবারে তালিকার বাইরেও রাখা যায় না। দলটা কখন কী করে বসে, সেটা আগে থেকে অনুমান করার উপায় নেই!
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি টপ অর্ডার ও বৈচিত্র্যময় বোলিং লাইনআপ। চোট কাটিয়ে দলে ফিরেছেন ফখর জামান। এছাড়া সায়েম আইয়ুব, শাহিবজাদা ফারহানের মতো ব্যাটসম্যানরা শুরুতেই ঝড় তুলতে পারেন। বোলিংয়ে শাহিন আফ্রিদি-হারিস গতি আর সুইংয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পারেন। আমিরাতে সদ্য সমাপ্ত ত্রিদেশীয় সিরিজে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছেন দুই স্পিনার আববার আহমেদ ও সুফিয়ান মুকিম।
এরপরও পাকিস্তানকে ভোগাতে পারে অভিজ্ঞ বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের অনুপস্থিতি। মিডল অর্ডারে ভরসা দেওয়ার মতো তেমন নাম নেই। হাসান নেওয়াজ-মোহাম্মদ নেওয়াজরা মাঝে মধ্যে জ্বলে উঠলেও ফর্মের ধারাবাহিকতা নেই।
শুধু এ দুজন নন, পুরো পাকিস্তান দলকেই ভোগাতে পারে ধারাবাহিকতার অভাব। সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও যেটা দেখা গেছে। এটি কতটা সামাল দিতে পারে, তার ওপর নির্ভর করবে এশিয়া কাপে পাকিস্তানের দৌড় কত লম্বা হবে।
শ্রীলঙ্কা:
ভারতের পর এশিয়া কাপে দ্বিতীয় সফল দল শ্রীলঙ্কা (৬)। গতবারের রানার্সআপদের সাম্প্রতিক ফর্ম কিছুটা খারাপ গেলেও এশিয়া কাপে সম্ভাবনার দৌড়ে রাখতেই হবে লঙ্কানদের। বিশেষ করে হাসারাঙ্গা ও তিকশানার মতো স্পিনারদের দ্রুত উইকেট তুলে নেওয়ার ক্ষমতা প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হতে পারে।
শ্রীলঙ্কার আরেকটি শক্তির জায়গা মিডলঅর্ডার। চারিত আলাসাঙ্কা, কুশল মেন্ডিস, কুশল পেরেরা, পাতুম নিশাঙ্কার মতো ব্যাটসম্যানরা দলে ভারসাম্য তৈরি করেছেন। চাপের মুখে তাদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে লঙ্কানদের জন্য। এছাড়া দাসুন শানাকার মতো অলরাউন্ডার শ্রীলঙ্কা স্কোয়াডের শক্তি বাড়িয়েছে।
তবে টপঅর্ডারে নিশাঙ্কা-মেন্ডিস ব্যর্থ হলে মিডল অর্ডারের ওপর যে চাপ পড়বে, সেই চাপ ভোগাতে পারে লঙ্কানদের। এছাড়া পেস আক্রমণে তেমন গভীরতা নেই। হাসারাঙ্গার ফিটনেস নিয়েও সমস্যা আছে। হাসারাঙ্গা-শানাকার ওপর অতিনির্ভরতাও ২০২২ এর চ্যাম্পিয়নদের অন্যতম দুর্বল দিক।
শ্রীলঙ্কাকে বড় পরীক্ষায় দিতে হবে গ্রুপপর্বেই। লঙ্কানদের সঙ্গে একই গ্রুপে আছে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান।
আফগানিস্তান:
আফগানিস্তান এখন নিজেদের ‘এশিয়ার দ্বিতীয়’ সেরা দল দাবি করে! অবশ্য এ সংস্করণে দলটির সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় তাদের আর শুধু ‘ডার্ক হস’ বলার কোনো সুযোগ নেই। বরং শিরোর অন্যতম দাবিদারই বলা যেতে পারে। সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলা দলটির সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা স্পিন আক্রমণ।
রাশিদ খান, মুজিব উর রহমান, মোহাম্মদ নবী- আবুধাবির কন্ডিশনে ম্যাচে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন এ স্পিন ত্রয়ী। এছাড়া পেস আক্রমণে আছেন ফজল হক ফারুকির মতো বোলার। ব্যাটিংয়ে টপ অর্ডারে ইব্রাহিম জাদরান, সেদিকুল্লাহ আতাল, রহমানউল্লাহ গুরবাজের মতো মারকুটে ব্যাটসম্যান আছেন।
দলটিকে ভোগাতে পারে মিডল অর্ডার। ভরসা করার মতো তেমন কেউ নেই। সাম্প্রতিক ত্রিদেশীয় সিরিজে হঠাৎ ব্যাটিং ধসে পড়েছে দলটি। এছাড়া পেস আক্রমণে ফারুকি ছাড়া হুমকি হওয়ার মতো তেমন কোনো নাম নেই।
বাংলাদেশ:
টানা তিন টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের সুবাস নিয়ে এশিয়া কাপ খেলতে গেছে বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টে এর আগে তিনবার ফাইনাল খেললেও কখনো শিরোপার স্বাদ পায়নি দলটি। সেই স্বপ্ন পূরণের মিশনে বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা তাদের বোলিং লাইন আপ।
পেস আক্রমণে তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান, শরীফুল ইসলামের মতো পরীক্ষিতরা আছেন। নাসুম-শেখ মেহেদী-রিশাদদের স্পিন বৈচিত্র্য প্রতিপক্ষকে আটকে দিতে পারে।
বাংলাদেশকে ভোগাতে পারে ব্যাটিং লাইন আপ। টপ-মিডল অর্ডারে ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগছে দলটি। এছাড়া ব্যাটসম্যানদের স্ট্রাইকরেটও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাকের আলী অনিক যেভাবে ফিনিশিং দিচ্ছেন, বাংলাদেশ দলের এক্স ফ্যাক্টর হতে পারেন তিনি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত:
সম্ভাবনার বিচারে আরব আমিরাতকে শিরোপার দৌড়ে খুব বেশি এগিয়ে রাখার সুযোগ নেই। তবে টুর্নামেন্ট যেহেতু আমিরাতেই হচ্ছে, চেনা কন্ডিশনের সুবিধা নিয়ে দলটি বড় অঘটন ঘটালে চমকে যাওয়ার কিছু থাকবে না। নিজেদের সাপেক্ষে শক্তিশালী দলটাই ঘোষণা করেছে আমিরাত।
তবে ‘বড়’ দলগুলোর বিপক্ষে খুব বেশি ম্যাচ খেলেনি আমিরাত। সেটাও ভোগাতে পারে দলটিকে। এছাড়া গ্রুপ পর্বে ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে একই গ্রুপে থাকায় দলটির গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। এরপরও যদি গ্রুপপর্ব পেরোয়, সেটা অঘটন হিসেবেই উল্লেখ করা হবে।
ওমান:
ভারত-পাকিস্তান-আমিরাতের সঙ্গে একই গ্রুপের অন্য দল ওমান। টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ে ২০ নম্বরে থাকা দলটি গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারলে, সেটাই হয়তো দেশটির সেরা সাফল্য হিসেবে গণ্য হতে পারে! উপমহাদেশের কন্ডিশনের সঙ্গে বোঝাপড়া, খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা দলটির বড় শক্তির জায়গা। তবে বড় দলগুলোর বিপক্ষে পর্যাপ্ত ম্যাচের অভাব ফুটে উঠতে পারে টুর্নামেন্টে। এছাড়া স্কোয়াডে চারজনের এখনো অভিষেক হয়নি, সেটাও ভোগাতে পারে ওমানকে।
হংকং:
টি-টোয়েন্টির র্যাঙ্কিং বিচারে এবারের টুর্নামেন্টে সবচেয়ে দুর্বল দল হংকং। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ-আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একই গ্রুপে থাকা দলটি অবশ্য নিজেদের দুর্বল ভাবছে না। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে রীতিমতো বাংলাদেশকে হারানোর হুমকি দিয়েছেন দলটির অলরাউন্ডার নিজাকাত খান।
এর আগে ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে হারিয়েছিল দলটি। সেই স্মৃতি টেনে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচ খেলতে নামবে হংকং। দলটির সবচেয়ে বড় ভরসার নাম দুই ওপেনার। অংশুমান রাঠ ও জিশান আলি দুর্দান্ত ফর্মে আছেন। দুজনই এ বছর টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি করেছেন।
তবে বড় দলগুলোর বিপক্ষে এখনো ম্যাচ খেলেনি দলটি। স্কোয়াডেও অভিজ্ঞ ও তরুণদের বয়সের ফারাক চোখে লাগার মতো। বড় টুর্নামেন্টের চাপ কতটুকু সামলাতে পারে, সেটার ওপর নির্ভর করবে হংকংয়ের সাফল্য।



