টি-টোয়েন্টিতে চার-ছক্কা মারতে হয়। মারতে হলে ব্যাট চালাতে হয়। কিন্তু ব্যাট চালানোর আগে যে বল অনুযায়ী ব্যাটের দিক মাঝেমাঝে বদলাতে হয়, সেটা সম্ভবত জাকের আলী কিংবা তাওহীদ হৃদয়দের আলাদা করে বলে দেওয়া হয়নি! না হলে রানের দরকার পড়লেই ধানক্ষেতের ক্রিকেটের মতো লেগ সাইডে মারতে চাওয়ার আর কী অর্থ হতে পারে!
বোলার যে লাইনেই বল করুক – তা তৃতীয় ছাড়িয়ে চতুর্থ-পঞ্চম এমনকি ষষ্ঠ স্টাম্পের লাইনে হলেও, পেছনের পায়ে ভর দিয়ে ‘ব্যাটে যদি লাগে, বল যাবে লেগে’ কৌশলে ব্যাটিং করতে গিয়েই কি আজ ম্যাচটা হাত থেকে ফেলে দিলেন হৃদয়-জাকের? ম্যাচ দেখে তা-ই মনে হওয়ার কথা বেশিরভাগ দর্শকের।
সিরিজের দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিংয়ের সময়ে শেষ ৯ ওভারে বাংলাদেশের বোলারদের দুর্দান্ত কামব্যাক, তাতে ১৫০ রানের লক্ষ্য পাওয়া, ফিল্ডিংয়ে উইন্ডিজের একের পর এক ক্যাচ ছেড়ে দেওয়া… এত কিছু পক্ষে যাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামে আজ ম্যাচটা ১৪ রানে হেরে গেছে বাংলাদেশ। সিরিজ হারও নিশ্চিত হলো এতে।
এমন হারের পেছনে দায়টা জাকের আলী, তাওহীদ হৃদয়দের ওপরই বেশি যাবে। লিটন দাসের ১৭ বলে ২৩ রানের ক্যামিও আর এর আগে-পরে তানজিদ তামিমের ৪৮ বলে ৬৩ রানের ইনিংসে বাংলাদেশ শুরুতে দারুণ ভিতই পেয়েছিল। ১২ ওভারে বাংলাদেশের রান ছিল ২ উইকেটে ৮৫। ওভারপ্রতি ৭-এর মতো রান তুলে ১২ ওভার কাটিয়ে হাতে ৮ উইকেট রেখে ওভারপ্রতি ৮-এর মতো করে রান…খুব বেশি কঠিন হওয়া তো উচিত ছিল না।
কিন্তু এই সমীকরণই কঠিন হয়ে গেল। চারে নামা তাওহীদ হৃদয় ১৪ বলে করেছেন ১২ রান, পাঁচে নামা জাকের আলী ১৮ বলে ১৭। দুজনই একের পর এক বল নষ্ট করেছেন ‘যদি লাগে, যাবে লেগে’ কৌশলে খেলতে গিয়ে। উইন্ডিজ বোলাররা স্লোয়ার, ইয়র্কার, বাউন্সার, কাটার – নানা ভ্যারিয়েশনে তাঁদের পরীক্ষা নিয়েছেন। কিন্তু বল যেমনই হোক, জাকের ও হৃদয়ের ব্যাটিং দেখে মনে হলো, যেকোনো বলকে ডিপ মিড উইকেট, ডিপ স্কয়ার লেগে পাঠানোতেই ব্যাটিংয়ের স্বার্থকতা নিহিত!
কিন্তু তাঁদের চেষ্টাটা স্বার্থক হলো না। অনেক বল নষ্ট করার পর যখন আস্কিং রানরেট বেড়ে গেছে, ততক্ষণে আবার মারতে গিয়েই আউট হয়ে গেছেন তাঁরা। চাপে পড়ে মারতে গিয়ে আউট হয়েছেন তানজিদ তামিমও। এরপর আর কী!
শুরুতে এমন টেস্ট ব্যাটিং করেছেন সাইফ হাসান, ১১ বলে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৫ রান। চতুর্থ ওভারের পঞ্চম বলে তিনি বিদায় নেওয়ার সময়ে দলের রান মাত্র ১৩। তবে নেমেই কয়েকটি চার মেরে লিটন দাসের ঝোড়ো শুরুর পর রানের চাকা গতি পেতে শুরু করে। অন্য প্রান্তে তানজিদ তামিমও হাত খুলতে শুরু করেন তখন। পাওয়ার প্লে-র ৬ ওভার শেষে বাংলাদেশের রান হলো ৩৭। কিন্তু অষ্টম ওভারে আকিল হোসেনের হঠাৎ নিচু হয়ে যাওয়া বলে বোল্ড হয়ে লিটনের ইনিংস শেষ হলো। বাংলাদেশের রান তখন ৪৮।
তামিম তবু একপ্রান্ত ধরে রেখেছেন। একপ্রান্তে হৃদয়ের রান করার মরিয়া চেষ্টায় ব্যর্থতার উল্টো পিঠে যা কিছু রান এনে দিয়েছেন। একবার জীবন পাওয়া হৃদয় ১৩তম ওভারের প্রথম বলে আউট হওয়ায় তৃতীয় উইকেটে ২৮ বলে ৩৭ রানের জুটি ভাঙল, তাতে হৃদয়ের অবদান ১৪ বলে ১২। লিটন আউট হওয়ার সময়ে তামিমের রান ছিল ১৮ বলে ১৯, হৃদয় আউট হওয়ার সময়ে সেটি দাঁড়ায় ৩২ বলে ৪৪-এ।
হৃদয় আউট হতেই ক্রিজে এলেন জাকের। তখনো সমীকরণ বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট সহজ – হাতে ৭ উইকেট, ৪৭ বলে দরকার ৬৫ রান। কিন্তু জাকের একদিকে একের পর এক বল স্ট্রাইকে থাকলেন, তার বিনিময়ে বাংলাদেশ রানও পেল না। ১৫তম ওভার শেষে বাংলাদেশের রান যখন ৩ উইকেটে ১০০, তামিম সবে ফিফটি পেরিয়েছেন (৩৯ বলে ৫১), উল্টো প্রান্তে টপ-এজে সৌভাগ্যপ্রসূত একটা চার পাওয়ার পরও জাকেরের রান ১০ বলে ৭। মাঝে বাংলাদেশের সমীকরণ থেকে বল কমেছে ১৭টি, রান কমেছে ১৫টি।
১৭তম ওভার শেষেও চিত্রটা একই, কিংবা আরেকটু খারাপ। বাংলাদেশের রান তখন ৩ উইকেটে ১১৭। জাকেরের রান ১৪ বলে ১১, তামিমের ৪৭ বলে ৬১। কিন্তু ১৮তম ওভারে প্রথম বলে তামিম আউট হয়ে গেলেন, মাঝে চোখে ধাঁধা লাগানো একটা কাট শটে চার মারার পর শেষ বলে জাকেরও আউট। বাংলাদেশের রান তখন ৫ উইকেটে ১২৪। সমীকরণ, ১২ বলে ২৬!
সম্ভব তখনো ছিল। কিন্তু শামিম বোল্ড হয়ে গেলেন হোল্ডারের ইয়র্কারে, রিশাদ ক্যাচ দিলেন লং অফে। আর সম্ভব হবে কীভাবে!



