২০২২ সালে কাতার জয় করার পর অনেকেই ভেবেছিলেন লিওনেল মেসির গল্প হয়তো সেখানেই শেষ। কিন্তু ফুটবল ঈশ্বর চিত্রনাট্য লিখেছেন অন্যভাবে। ৩৯ বছর বয়সে মেসি আবার প্রস্তুত হচ্ছেন আরেকটি বিশ্বকাপের জন্য। কিন্তু এবার কোটি টাকার প্রশ্ন হলো—মেসি কি পারবেন সেই পুরোনো ঝলক দেখাতে? নাকি বয়স আর ইনজুরি এবার তাঁর পথ আটকে দেবে? আজকে আমরা আলোচনা করব মেসিকে নিয়ে কোচ স্কালোনির পরিকল্পনা এবং তিনি মাঠে ঠিক কতটা কার্যকর হতে পারবেন?
বয়সের বাস্তবতা
প্রথমে আমাদের বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। টুর্নামেন্ট চলার সময় মেসির বয়স ছুঁয়ে যাবে ৩৯ বছর। ফুটবল ইতিহাসে এই বয়সে কোনো ফরোয়ার্ডের পক্ষে বিশ্বকাপের মতো তীব্র গতির টুর্নামেন্টে টানা ৯০ মিনিট খেলা অসম্ভব বললেই চলে। মেসি নিজেই সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তাঁর শরীর এখন আগের মতো সাড়া দেয় না। বিশেষ করে তাঁর সাম্প্রতিক হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি আর্জেন্টিনাকে বেশ চিন্তায় ফেলেছে। সুতরাং কাতার বিশ্বকাপে আমরা যে মেসিকে প্রতি ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে দৌড়াতে দেখেছি, এবারের বিশ্বকাপে সেই মেসিকে দেখার আশা করাটা ভুল হবে।
গতি কমেছে, ভিশন নয়
তাহলে মেসি কি এবার ব্যর্থ হবেন? একদমই না। মেসির খেলার স্টাইল গত কয়েক বছরে অনেকটাই বদলে গেছে। তিনি এখন আর সেই গতিময় উইঙ্গার নন, যিনি একাই চার-পাঁচজন ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে পার হয়ে যাবেন। মেসি এখন একজন খাঁটি প্লে-মেকার বা ‘নাম্বার টেন’। পরিসংখ্যান ও ট্যাকটিক্যাল অ্যানালিসিস বলছে, গতি কমলেও মেসির ফুটবল ব্রেন বা মাঠের ভিশন কিন্তু কমেনি। তিনি এখনও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে মাত্র একটা পাসের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের পুরো ডিফেন্স ভেঙে চুরমার করে দিতে পারেন। এছাড়া সেট-পিস বা ফ্রি-কিকের বেলায় মেসি এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা। পেনাল্টি বক্সের আশেপাশে ফ্রি-কিক মানেই গোল প্রায় নিশ্চিত।
স্কালোনির পরিকল্পনা
মেসি একা নন, তাঁর চারপাশে একটা শক্তিশালী দল তৈরি করেছেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। আর্জেন্টিনা দল এখন আর শতভাগ মেসির ওপর নির্ভরশীল নয়। মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো তরুণ ও এনার্জেটিক খেলোয়াড়রা আছেন। তাঁরা মাঠে মেসির হয়ে বাড়তি দৌড়ানোর দায়িত্বটা নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। কৌশলগত দিক থেকে দেখলে, স্কালোনি মেসিকে ডিফেন্সিভ ডিউটি থেকে পুরোপুরি মুক্তি দিয়েছেন। মেসি শুধু আক্রমণেই নিজের শক্তি ধরে রাখবেন। ফলে পুরো ম্যাচ না খেললেও, ম্যাচের ৩০ বা ৪০ মিনিটে মেসি তাঁর আসল ঝলক দেখানোর পর্যাপ্ত সুযোগ পাবেন।
সুপার-সাব নাকি স্টার্টার?
এবারের বিশ্বকাপে মেসির ভূমিকা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞের মতে, মেসিকে হয়তো সব ম্যাচে শুরুর একাদশে দেখা যাবে না। বিশেষ করে গ্রুপ পর্বের জর্ডানের মতো ম্যাচগুলোতে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া হতে পারে। তবে নক-আউট পর্বে তিনি যদি 'সুপার-সাব' হিসেবেও ম্যাচের শেষ ৩০ মিনিটে মাঠে নামেন, সেটাই হবে প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ। মাঠে শুধু মেসির উপস্থিতিই বাকি ১০ জন খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস দ্বিগুণ করে দেয়। প্রতিপক্ষ দলও মেসিকে মার্ক করতে গিয়ে নিজেদের ডিফেন্স আলগা করে ফেলে।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ বিশ্বকাপে আমরা হয়তো গোলমেশিন মেসিকে দেখব না, কিন্তু আমরা দেখব একজন মাস্টারমাইন্ড মেসিকে; যিনি নিজের শেষ বিশ্বকাপে দলকে গাইড করে নিয়ে যাবেন।



