ওপরের ছবিটি দেখুন। কী দেখা যাচ্ছে? হ্যাঁ, হ্যাঁ, অনেক কিছুই আছে। মানে ছবির বিষয় হিসেবে বেশ কিছু উপাদানই পাবেন। কিন্তু আসল বিষয়টি কী? উত্তর খুঁজতে যদি মাথা চুলকাতে হয়, তাহলেই বুঝতে হবে আপনি লিজেন্ড নন!
এবার ছবির চুলচেরা বিশ্লেষণ করা যাক। কারণ সবাই তো আর লিজেন্ড নয়। লেখকও সেই গোত্রভুক্ত নন। সুতরাং একটু চেষ্টা-চরিত্র চলুক বরং। লিজেন্ডরা আসলে কীভাবে ভাবনা-চিন্তা করেন, সেটি তাহলে অন্তত আঁচ করা সম্ভব হবে।
প্রথমেই বোঝা যাচ্ছে যে, এটি একটি চার চাকার গাড়ি। দুটো বড় বড় চাকা চোখের সামনেই দৃশ্যমান। বাকি দুটো চাকা পেছনে আছে। চাকাগুলোতে অনেক নাট-বল্টু আছে। আছে রাবার। আর আছে হাওয়া। এ থেকে ছবির কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
নানা রকমের ভাবের সম্প্রসারণ করাই যায়। একটা যেমন, ছবির কবি আসলে দুই চাকা দিয়ে মানবজীবনকে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছেন। একবার ভেবে দেখুন, মানুষের জীবন কি চাকার মতো শুধুই বয়ে চলা নয়? আমরা যেমন সারা দিনের হাঁটাহাঁটি বা চলাচল শেষে বাসায় তথা গ্যারেজে ফিরি, গাড়িও কিন্তু তেমনি। চাকা যেমন হাওয়ায় ভর করে চলে, আমাদেরও তেমনি হাওয়া দিয়েই চালাতে হয়। আমরা বাড়িওয়ালাকে হাওয়া দিই ঠিকমতো ভাড়া শোধ করব বলে। সবজি বিক্রেতা বা মুদি দোকানিকেও হাওয়া দিই জিনিসপত্রের দামে কিছুটা ছাড়ের জন্য। রিকশা বা সিএনজিওয়ালাকেও হাওয়া দিই। কারণ ওনারা মাঝে মাঝে এমন অঙ্কের ভাড়া চেয়ে বসেন, তখন মনে হয় বাংলা সিনেমার মতো ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল ছাড়া হয়তো উদ্ধার পাওয়া সম্ভব হবে না।
জীবনে সবচেয়ে বেশি হাওয়া আমরা দিই আসলে রুটি-রুজির দোকানে। ওদিকে হাওয়া না দিলেই তো চাকা হয়ে যায় পাংচার। তখন আর চলা যায় না। টায়ারের ফুটো দিয়ে পাম্প করে করে তখন জীবনে হাওয়া ভরতে হয়। লাগাতে হয় পট্টি। কী কষ্ট, কী কষ্ট! যার হয়, সেই আসলে বোঝে। আর চাকায় (বা জীবনে) হাওয়া না থাকলে খুঁড়িয়ে তো চলতেই হয়।
কী, বেশি দার্শনিক দার্শনিক ভাব মনে হচ্ছে? তবে চলুন হাওয়ার প্রসঙ্গ বাদ দিই। তেলের ট্যাংকের বিষয়ে আলোকপাত করা যাক বরং। হাওয়ার মতো তেল ছাড়াও দুনিয়া অচল। এটি ছাড়া গাড়ি যেমন চলে না, তেমনি মানুষের জীবনও চলে না। তেল কোথায় না লাগে বলুন? প্রাত্যহিক জীবনের নানা ক্ষেত্রে একটু কায়দা করে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের তেল দিতে হয় নাকে-মুখে। আবার ভাজা-পোড়া খেতেও তেল খরচ হয়। ওই তেলের দাম যদিও একটু বেশি, মর্জিমতো ওঠা-নামা করে। এর দামে উল্টো-পাল্টা হলেই আবার বডির তেল বেরিয়ে যায়। সে যাক গে, আসল কথা হলো এ দেশের মানুষের জীবনে তেলের প্রয়োজনীয়তা ও ভূমিকা অপরিসীম। আমাদের তেল দিতে হয়, আবার খেতেও হয়। কম খেলেও সমস্যা নেই। কিন্তু দেওয়ার সময় যদি তেল কম পড়ে যায়, তবে আর রক্ষে নেই। আমরা অবশ্য অনেক যুগের চেষ্টায় তৈলমর্দনে বেশ এগিয়ে গেছি। খানিকটা অপচয়কারীও বলা যায়। তেল কাউকে দিতে হলে, তাকে তেলে না চুবিয়ে আমরা যে ছাড়ি না!
এত কিছুর পর এখন শুধু রাস্তাটিই বাকি থাকল ছবিতে। পিচ ঢালা রাস্তাও আমাদের জীবনেরই অংশ। এখানেও দর্শন কপচানো যায় বটে। তবে আপনারা বোধহয় তা আর সহ্য করতে পারবেন না। মোদ্দা কথা হলো, আমাদের জীবনে রাজনীতি আর রাস্তা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। ভয় কাটাতেও আমরা রাস্তায় নেমে যাই। ওই যেমন শোনা যায় আর কি, ‘… ভাই, তোমার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার বাংলা সিনেমার গানেও আশ্রয় নেওয়া যায়। গুনগুন করে গাওয়া যায়, ‘পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি, তার সাথে এই মনটারে বেঁধে নিয়েছি…’। অর্থাৎ, আমাদের ভয়, মনের আনন্দ– সবই একেবারে রাস্তাকেন্দ্রিক। তা রাস্তাকে কি অস্বীকার করতে পারবেন লিজেন্ডরা?
তারপরও আপনাদের কারও কারও ভুরু কুঁচকে আছে নিশ্চয়ই। অ্যাই, আপনারা কি তেলের ট্যাংকের ওপর থাকা লেখাটা নিয়ে কিছু বলতে চাইছেন? প্লিজ, না। আমি ও নিয়ে ভাবতেই চাই না। ওই তিন শব্দ নিয়ে কথা বলতে গেলেই চোখ ভিজে আসে, সারা শরীর কেঁপে কান্না আসে। ডুকরে ওঠে মন। বারবার শুধু হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করা একটি প্রশ্ন উঠে আসে– আর কত?
যাক, বাদ দিন। এভাবে বুঝে যদি লিজেন্ড হতে হয়, তবে আর তা হওয়া হবে না এই হতভাগার। তার চেয়ে বরং খুঁজনেওয়ালাদের দলেই থাকা যাক। লিজেন্ডরাই বুঝুক। তারা বুঝে বুঝে দেশ, জাতি ও সমাজের বোঝা হয়ে যাক! বাংলা গানের কথায় কথায় (ঈষৎ পরিবর্তিত) বলে যাই, ‘লিজেন্ড’ (তোমরা) সবাই থাকো সুখে, আগুন জ্বলুক আমার বুকে…’!



