শুরুতেই কবিগুরুর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। বিশ্বকবি গানটি যখন লিখেছিলেন, তখন এ বঙ্গে আলোর সন্ধানেই খোঁজ-খবর বেশি হতো। এখন দিন বদলেছে। মানুষের চাহিদাও বদলে গেছে। ফলে আলোও বদলে গেছে আলুতে। বাধ্য হয়েই বদলে গেছে শব্দচয়নও। আশা করি, রবিভক্তরা মার্জনা করবেন।
আলু যে আলোর জায়গা কেড়ে নিচ্ছে, তা বুঝতে খুব বেশি কষ্টের প্রয়োজন নেই। চারদিকেই এখন আলু নিয়ে আলোচনা। টিভির ফুটেজ থেকে শুরু করে পত্রিকার পাতা– সবখানেই বড় জায়গা খেয়ে ফেলছে আলু। সরকারও শেষমেষ আলুর দাম বেঁধে দিতে বাধ্য হয়েছে। বলে দেওয়া হয়েছে, খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি আলুর দাম হবে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা (হিমাগার পর্যায়ে ২৬ থেকে ২৭)। এর বেশি দামে যাতে বিক্রি না হয়, সেজন্য অভিযানও চলছে বেশ। অবশ্য বাজারে গিয়ে দেখা গেল, আলুর দাম চড়া-ই। এর চেয়ে হয়তো আলোর দাম কম (টুনি বাল্বের দাম নিশ্চয়ই কম)!
তো, এই যুক্তিতেই আসলে আলোর জায়গায় আলু চলে আসছে।
আমাদের কাছে এমনিতেই আলুর মূল্য একটু বেশি বেশিই। হিসাব করলে দেখা যাবে, ভাতের পরই আমরা বাঙালিরা হয়তো আলুই বেশি খাই। কারণ আলুর আছে অনন্য গুণ। সেটি হলো, যেকোনো কিছুতে উপাদান কম পড়লেই আমরা আলু দিয়ে তা পূরণ করে দিতে পারি। আলুর সাথে আছে আমাদের একটু অন্য ধরনের আত্মার বন্ধন। ধরুন, আলু ছাড়া মুরগির মাংসের ঝোল কি আপনি কল্পনা করতে পারবেন? কাচ্চিতে ঢাউস সাইজের আলু না পেলে আপনার মন কি বিষাদে ভারাক্রান্ত হবে না? এমনকি করলা ভাজতে গেলেও তিতকুটে ভাব কিছুটা কমাতে আপনি কি আলুর শরণাপন্ন হবেন না? এসব কিছুই না থাকলে আপনি কি আলুকে চটকে ভর্তা বানিয়ে ভাতকে উপাদেয় করে পেটে ঢোকানোর ব্যবস্থা করবেন না?
এবার বলুন, আলু ছাড়া কি আপনাদের জীবন চলবে? প্লিজ, মুখ খুলুন!
এমন একটা পরিস্থিতিতেই এখন আলুর মাথায় উঠেছে রাজার মুকুট। এ নিয়ে অবশ্য পেঁয়াজ আর ডিমের স্বাভাবিকভাবেই মন খারাপ হতে বাধ্য। সরকার এ দুটিরও দাম নির্ধারণ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। নতুন বেঁধে দেওয়া দাম অনুযায়ী, প্রতিটি ফার্মের ডিম ১২ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজের দাম হবে কেজিতে ৬৪ থেকে ৬৫ টাকা। ডিম কিন্তু এখন রোয়াব দেখিয়ে বলতেই পারে– ‘হালি বা ডজনের দামে এসো একবার! বুঝবে ঠ্যালা… কিছুদিন আগেই দেখেছ দাম কাকে বলে!’
এমনটা করতে পারে পেঁয়াজও। বলতেই পারে, ‘আলু, বেশি বাড় বেড়ো না। আমি কিন্তু বাড়লে আর কমি না!’ তা বলবে না-ই বা কেন? পেঁয়াজের এমন অহংকার করাই সাজে। কবিগুরুর ভাষাতেই বলতে হয়, দাম বাড়লে ‘ও যে মানে না মানা…’।
আলুর নিজস্ব অভিমত এখানে অবশ্যই ‘পুরান চাল ভাতে বাড়ে’ টাইপ। আলুর দাম একসময় কম থাকলেও, এর ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই বহুল। ফলে খেলার মাঠে আলু আসলে পুরোনো খেলোয়াড়, স্রেফ কেউ পাত্তা দিত না– এই আর কি। তবে এবার মাটি ফুঁড়ে উঠে এসে নিজের উপস্থিতি ভালোভাবেই জানান দিয়েছে আলু। ফলে ডিম, পেঁয়াজের হিংসে তো হতেই পারে!
আলুর অনেক পুষ্টিগুণও আছে। ভিটামিন সি থাকে। থাকে কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার, পটাশিয়াম আরও কত কি। সমস্যা একটাই। আলুকে বেশি আপন করে নিলে নিজেদেরই আলু বনে যেতে হয়। তখন আপনার অবস্থাও হয়ে যেতে পারে একদম আলুর মতো। অর্থাৎ, আলুর মতোই আপনি সবার কাজে লাগতে থাকবেন। সবাই আপনাকে আলুর মতো কখনো ভর্তা করবে, কখনো চাক চাক করে কাটবে। কখনো আবার গোটা হিসেবে কাচ্চির চালে ঢুকিয়ে দেবে সিদ্ধ হওয়ার জন্য। কখনো আবার কাটবে কুচি কুচি করে। সুতরাং আপনার ব্যবহার হবে তখন গণহারে।
আসলে গণের ব্যবহারই এই পৃথিবীতে গণহারে হয়। আলুর মতো এই গ্রহের অনেক মানুষও একইভাবে ব্যবহৃত হয়। তাদের সংখ্যা যদিও বেশি, তবে তাতে কারও খুব একটা যায় আসে না। কারণ সংখ্যায় বেশি হলেও দাম যে বেশির ভাগ সময় কমই থাকে। তাই আলুদের দাম বেড়ে যাওয়া অনেকটাই এই বিশ্বে সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষণ! পেঁয়াজের বাড়বে, তেলের বাড়বে, ডিমের বাড়বে– কিন্তু আলুর বাড়বে না, তা হবে না, তা হবে না!
আর আলু কি যেনতেন জিনিস? আলু কিন্তু আমেরিকান সিটিজেন।
ধারণা করা হয় যে, আমেরিকার স্থানীয় ফসল ছিল আলু। ঐতিহাসিকেরা বলেন, কলম্বাস-পূর্ব সময়ে আমেরিকার আদি অধিবাসীরা এর চাষাবাদে দক্ষ হয়ে ওঠেন। এর পর পর্তুগিজ নাবিকেরা আলু নিয়ে আসেন এই উপমহাদেশে। অর্থাৎ, বেশ খানিকটা বিশ্বভ্রমণ করেই আলু আমাদের এলাকায় এসে ক্রমে আমাদের মন জয় করে নিয়েছে। প্রেমের টানে এখানে এসেছিল কিনা, তা অবশ্য স্পষ্ট না!
যার টানেই আসুক, আলু কিন্তু এ দেশের আলো-হাওয়ায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে দারুণভাবে। একেবারে ভারতীয় বাংলা বা হিন্দি সিরিয়ালের বারংবার আঘাত সয়েও সকলের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করা কোমল গৃহবধূটির মতো। এখন আলু আলোচনায় আছে বটে। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন, পেঁয়াজ বা মরিচের মতো ঝাঁজ কিন্তু দেখাচ্ছে না!
যদিও যেকোনো কিছুর দাম বাড়েই কমে যাওয়ার জন্য। এক না একসময় কমেই। আলুরও নিশ্চয়ই একদিন কমে যাবে। ততদিন না হয় আলুরা একটু ভিভিআইপি মর্যাদা পাক। ক্ষতি কী, বলুন? আর তারপরও যদি আলুর এমন ওপরে উঠে আসা কারও সহ্য না হয়, তবে সিঙাড়ায় আলু না খেয়ে দেখান তো। দেখি, আলু-হেটার্সদের কোমরে কত জোর!



