কতদিন কত জায়গায় ব্যানারে বা বিবৃতিতে ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ শব্দত্রয় শুনে বা পড়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছেন। কতবার এই বাণী শুনে দু‑বাহু মেলে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও ধরতে পারেননি। অথচ কাছে যেতেই চোখ জোড়া ওই ভারী বুটজোড়ায় পড়তেই কেমন মিইয়ে গেছেন। পিছিয়ে এসেছেন। আর এই পিছিয়ে আসা বাড়িয়েছে দীর্ঘশ্বাস কেবল। এবার এর নিদান হাজির হয়েছে। খোদ ডিএমপি কমিশনার ইঙ্গিতে সেই নিদানের খোঁজ দিয়েছেন।
সে ঘটনায় যাওয়ার আগে একটু পিছিয়ে আসা যাক। কারণ, ইদানীং সবকিছুরই তো আবার কনটেক্সট থাকে। না বললে আবার চিলচিৎকার উঠবে–কনটেক্সট কী, কনটেক্সট কী বলে।
সম্প্রতি বললেও আসলে ভুল হবে, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর থেকে মোটাদাগে দেশের আইন‑শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পুলিশ, তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা আইন‑শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা স্বীকার করেছেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস থেকে রাজধানীতে ছিনতাইকারীরা আরও যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গত পাঁচ মাসে ঢাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ গেছে ৭ জনের। গত চার মাসে ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে ৮৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, ফার্মগেট, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, খিলগাঁও, হাতিরঝিল, শাহজাহানপুর, হাজারীবাগ, চকবাজার, শাহ আলী, এমনকি গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই বেড়েছে। মূলত সন্ধ্যার পর ছিনতাই বেড়ে যায়।
পরিস্থিতি যখন এমন, তখন ছিনতাই প্রতিরোধে রাজধানীবাসীকে নিজের মোবাইল ও ব্যাগ নিজ দায়িত্বে নিরাপদ রাখার মাধ্যমে পুলিশকে ‘সহায়তা’ করার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। বুধবার ঢাকা ক্লাবে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) বার্ষিক সাধারণ সভায় ডিএমপি কমিশনার এই কথা বলেন।
সাজ্জাত আলী বলেন, ‘আমরা আপনাদেরকে সাহায্য করব। কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত ব্যাগ এবং মানিব্যাগ, পার্স, মোবাইল নিজে একটু নিরাপদে রাখার চেষ্টা করবেন। তাহলে এ কাজটির মাধ্যমে আপনি আমাদের সহযোগিতা করতে পারবেন।’
ছিনতাইয়ের ৮০ শতাংশই ‘মোবাইল ছিনতাই’ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাসে বা প্রাইভেটকারে যখন কেউ কথা বলেন, তখন তার মোবাইল নিয়ে দৌড় দেয়। তাদেরকে হাতেনাতে ধরা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আমার অফিসারদের কাছে বড় অস্ত্র থাকে, বুট পরা, ইউনিফর্ম পরা থাকে। ছিনতাইকারী থাকে খালি পায়ে বা একটা কেডস পরা। তার সাথে দৌড়ে পারাটা অনেক কঠিন।’
আইন‑শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে অনেক কথা-তত্ত্ব এলেও ছিনতাইকারী ধরতে পুলিশের বুট ‘বাধা’ দেয়, এমন বক্তব্য ভুল না করলে এই প্রথম। ডিএমপি কমিশনার পুলিশের ‘অসহায়ত্বের’ জায়গা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, নাকি ছিনতাইকারীরা বেশি ‘স্মার্ট’, সেটা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তা অনেকটা অনিশ্চিত। পাশাপাশি প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, দেশের আইন‑শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটিয়ে বা উন্নতি করতে ব্যর্থ হওয়ার পরও দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন ‘দায়সারা’ বক্তব্য আসলেই কী বার্তা দেয়।
যেহেতু ডিএমপি কমিশনার ছিনতাইকারী ধরতে পুলিশের ‘বুট’-কে বাধা হিসেবে দেখছেন, সেহেতু নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশের বুট বাতিল দাবি করে আন্দোলন গড়ে তোলার মোক্ষম সময় এখনই। পুলিশের বুট বাতিল করলে শুধু যে পুলিশের শরীর থেকে ওজন কমবে তা কিন্তু নয়, এর পারিপার্শ্বিক নানা সুবিধা-অসুবিধা আছে।
অতিরিক্ত ওজন থেকে রেহাই
ডিএমপি কমিশনার পুলিশের অসহায়ত্বের অন্য বড় অস্ত্র, বুট আর ইউনিফর্মের কথা উল্লেখ করেছেন। নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরেই বড় অস্ত্র আর ইউনিফর্ম আসলেই পুলিশের লাগবে। অনেকটা অপ্রয়োজনীয় এই বুট। বুট যদি পুলিশের পা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে পুলিশ সদস্যরা। সেক্ষেত্রে তাঁদের ছিনতাইকারীদের মতো কেডস বা স্যান্ডেল দেওয়া যেতে পারে। তাহলে তারা (পুলিশ) দৌড়ে ছিনতাইকারী ধরতে পারবে।
প্রস্তুত হতে ঝামেলা কম
ব্যারাকে থাকা পুলিশ সদস্যদের হুট করেই নানা কাজে যেতে প্রস্তুত হতে হয়। তখন বেশ সময় নেয় এই বুট। মোজা পরতে হয়, বুট পায়ে জড়াতে হয়, ফিতা বাঁধতে হয়, এরপর নিজের প্যান্ট সেই বুটের মধ্যে গুঁজে প্রস্তুত হতে হয়। ঝক্কি কিন্তু কম না। এই বুট না থাকলে এই ঝক্কিও কিন্তু থাকবে না।
কাউকে লাথি মারার প্রবৃত্তি কমবে
পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মানুষের সঙ্গে ‘খারাপ’ ব্যবহার করার অভিযোগ অনেক পুরোনো। বেশ কিছু আলোচিত ঘটনায় দেখা গেছে, জনমানুষকে লাথি মেরে বেশ ‘শান্তি’ পায় পুলিশ। পুলিশের লাঠিপেটা ও লাথি—এমন সার্চে গুগলে অহরহ সংবাদ পাওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে বুট বাতিল করলে অন্তত মানুষের লাথি খাওয়ার ‘সৌভাগ্য’ কিছুটা কমবে। এতে পুলিশের সঙ্গে মানুষের বন্ধুত্বের যে ‘বাণী’ আওড়ানো হয়, তা এক ধাপ এগিয়েও যেতে পারে।
খরচ কমবে
পুলিশের বুট বাতিল হলে খরচ কমবে। তা হোক সরকারি বা বেসরকারি। বাজার ঘুরলে পুলিশের বুটজুতা রকমফেরে দাম দুই থেকে আড়াই হাজার। সেই হিসাবে দু লাখের বেশি পুলিশ সদস্যের বুটজুতা কেনা থেকে বিরত থেকে সরকার বিপুল অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে।
ভাবুন একবার, পুলিশ তার পোশাকেই আছে; কিন্তু বুটের বদলে পায়ে ‘কেডস বা স্যান্ডেল’। দেখতে আসলে কেমন লাগছে, তাতে কিছু যায় আসে না। পুলিশ ‘হালকা’ হয়ে অপরাধী ধরছে, এই তো আমরা চাই। আমরা চাই, মানুষের মনের মধ্যে যে ‘ছিনতাই‑ভীতি’ তৈরি হয়েছে, তা থেকে দ্রুত মুক্তি আসুক। পুলিশ হয়ে উঠুক জনগণের প্রকৃত বন্ধু।



